Image description

প্রতিরোধযোগ্য রোগ হাম, সেই রোগে এখনো প্রতিদিন আক্রান্ত হচ্ছে হাজার শিশু। সরকারি হিসাবেই ৮৭ দিনে মৃতের সংখ্যা ৬৩১, বেসরকারি হিসাবে তা কয়েক গুণ। অথচ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ১৭ দিনে রাখেনি হামবিষয়ক কোনো কর্মসূচি। যদিও ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় ছিল বেশ কয়েকটি আয়োজন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু এ বছর এখনো নেয়নি ভয়াবহ রূপ, তবে নিতে পারে। এ নিয়ে নানা কর্মসূচি ইতিবাচক। অন্যদিকে হামের ভয়াবহতা মার্চ থেকে শুরু হয়ে চলছে এখনো। হাম সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে যেখানে বেশি বেশি আলোচনা দরকার, সেখানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মসূচিতে হাম না থাকাটা ভাবনার।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হাম থেকে সাধারণ মানুষের নজর সরাতে এমন কর্মসূচি সাজাতে পারে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেলিন চৌধুরী। এই চিকিৎসক বলছিলেন, ‘মন্ত্রণালয় হামকে ভুলে যেতে চায় অথবা জনগণকে ভুলিয়ে দিতে চায়, যা সঠিক নয়। টিকার ক্যাম্পেইন হওয়ার পরও অনুমিত হারে হামের রোগী কমছে না, থামেনি মৃত্যুও। মন্ত্রণালয়ের উচিত ডেঙ্গু প্রতিরোধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি হামকেও গুরুত্ব দিয়ে সমন্বিত কর্মসূচি পালন করা।’

মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে অনেকটা গা-ছাড়া মনোভাব দেখতে পাচ্ছেন লেলিন চৌধুরী। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘মন্ত্রণালয়ের হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে, হামের ব্যাপারে আর কিছু করার নেই। তারা বিষয়টিকে ছেড়ে দিয়েছেন, যা হওয়ার হবে। অথচ টিকা দেওয়ার পর শিশুদের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হচ্ছে কি না— কেন ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন ফের পিছিয়ে গেল, কেন এখনো আক্রান্তের হার এত বেশি— এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা দরকার ছিল। মানুষকে নানাভাবে সচেতন করাও দরকার।’

একটি নির্ধারিত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে গণমাধ্যমকর্মীদের অবহিত করা হয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মসূচি সম্পর্কে। এই গ্রুপে সাধারণত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত খবরের পাশাপাশি যেসব অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী উপস্থিত থাকেন, সেগুলো সম্পর্কেও জানানো হয়। এর পাশাপাশি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামের প্রতিদিনকার প্রতিবেদনও সেখানে তুলে ধরা হয়।

এই গ্রুপে সর্বশেষ গত ২৪ মে হামবিষয়ক কর্মসূচি কাভারেজের বিষয়ে খবর আসে। সেটিও ছিল হাম পরিস্থিতি মোকাবিলায় চিকিৎসাসামগ্রীর অনুদান নিয়ে, যেটি দিয়েছে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি। এরপর থেকে পুরোপুরি গণমাধ্যমের ইভেন্ট কাভারেজের তালিকা থেকে বাদ পড়ে গেছে হামবিষয়ক কর্মসূচি। এর পরের কর্মসূচিগুলো ছিল মূলত ডেঙ্গুবিষয়ক।

শিশুদের জন্য ভিটিামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন আজকের (১০ জুন) মধ্যে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা পিছিয়ে গেছে। ক্যাপসুল সংগ্রহ ও সরবরাহের জটিলতায় এমনটি হয়েছে বলে জানা গেছে। নিয়ম অনুযায়ী বছরে দুবার হওয়ার কথা এই ক্যাম্পেইন। হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যেও এ ক্যাম্পেইন পিছিয়ে যাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা।

হামকে জনস্বাস্থ্যের জন্য যতটা গুরুত্ব দেওয়া দরকার, মন্ত্রণালয় ততটা দিচ্ছে না বলে মনে করছেন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন।

তিনি বলছিলেন, ‘হামে মূলত শিশুরা মারা যাচ্ছে। যে কারণে মন্ত্রণালয় হামকে জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট হিসেবে বিবেচনা করছে না। হামে আক্রান্ত শিশুরা শারীরিকভাবে নাজুক থাকে। আবার ডেঙ্গুর স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেক। কোনো শিশুর হামের পরে ডেঙ্গু হলে অথবা ডেঙ্গুর পরে হাম হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠবে।’ এমন প্রেক্ষাপটে হামকে বাদ দিয়ে নয়, বরং দুটো স্বাস্থ্য সমস্যাকেই গুরুত্ব দিয়ে কর্মপরিকল্পনা সাজানোর তাগিদ দিলেন মুশতাক হোসেন।

গত শুক্রবার রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে মারা গেছে হামের পর ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়া দেড় বছর বয়সী তাইবা আক্তার। শিশুটি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন ছিল। পরিবার জানায়, হাসপাতালে হামের চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যায় তাইবা। এরপর আবার অসুস্থ হলে ভর্তি করা হয় হাসপাতালে। তখন দেখা যায়, সে আক্রান্ত হয়েছে ডেঙ্গুতে। শিশুটি রামেক হাসপাতালে মৌসুমের প্রথম ডেঙ্গু রোগী বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে হাম নিয়ে কর্মসূচি বন্ধ রাখার বিষয়ে ভাষ্য জানতে যোগাযোগ করা হয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে। তিনি সংসদে থাকায় সম্ভব হয়নি কথা বলা। এরপর মন্ত্রণালয়ের সচিবকে মোবাইল ফোনে বার্তা ও কল করে যোগাযোগের চেষ্টা করে সাড়া মেলেনি।

তবে নাম প্রকাশ করতে চান না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এমন এক কর্মকর্তা বললেন, ‘হাম সংক্রমণ কমার দিকে। হয়তো এ কারণে প্রোগ্রাম কম হচ্ছে। আবার সামনে ডেঙ্গু বাড়তে পারে, তাই এ-বিষয়ক প্রোগ্রাম বেশি হচ্ছে।’

চলে গেল আরও তিন শিশু: হামের উপসর্গে সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে হাম ও হামের উপসর্গে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৩১ জনে। হামের উপসর্গে আক্রান্ত শিশুদের একজন ঢাকায়, একজন সিলেটে ও একজন ময়মনসিংহে মারা গেছে। এ সময়ে হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৩৪ শিশু।

গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৯৩৩ রোগী। আর হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১ হাজার ১৪ রোগী। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গে দেশে মারা গেছে ৫৩৯ শিশু। এ সময়ে হাম শনাক্তের পর মারা গেছে ৯২ শিশু।

হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে ৮১ হাজার ৮৪ শিশু। আর হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৬৬ হাজার ১৭০ শিশু। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছে ৬২ হাজার ২৯২ শিশু।