বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে সাম্প্রতিক সময়ে ‘পুশ-ইন’ (অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ ঘটানো) ইস্যু নতুন করে দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনা তৈরি করেছে। ঢাকা অভিযোগ করছে, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময়ে ‘বাংলাদেশি’ পরিচয়ে জোরপূর্বক সীমান্ত পেরিয়ে লোকজনকে বাংলাদেশে ঢোকানোর চেষ্টা করছে।
স্থানীয় ও সীমান্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য মতে, গত দুই সপ্তাহ ধরে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে একাধিক ‘পুশ-ইন’ চেষ্টা চালাচ্ছে বিএসএফ, যা প্রতিহত করছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বিশেষ করে বাংলাদেশের নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, নওগাঁ, পঞ্চগড়, ঝিনাইদহ, নেত্রকোনা, মেহেরপুর এলাকার সীমান্তে এই পুশ-ইন চেষ্টা চলছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলে নানা ইস্যুতে মতবিরোধে ঢাকার সঙ্গে দিল্লির সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দেয়। গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এলে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে আগ্রহ দেখা যায় দিল্লির। নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অভিনন্দন বার্তাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ভারতীয় কর্মকর্তাদের বক্তব্য-বিবৃতিতে সেই আগ্রহ প্রকাশ পায়। কিন্তু সম্পর্কোন্নয়নে এমন আগ্রহ দেখানো ভারত কেন সম্প্রতি পুশ-ইন করতে এত মরিয়া হয়ে উঠল, সে উত্তরও খুঁজছেন কেউ কেউ।
‘পুশ-ইন’ ও ‘পুশ-ব্যাক’ আসলে কী
আন্তর্জাতিক পরিভাষায় ‘পুশ-ব্যাক’ বলতে বোঝায় কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া সীমান্ত থেকে জোরপূর্বক তার নিজ দেশে ফেরত পাঠানো। আর ‘পুশ-ইন’ হলো প্রতিবেশী দেশের ভূখণ্ডে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে জোরপূর্বক ঠেলে ঢুকিয়ে দেওয়া।
সাধারণ প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জাতীয়তা যাচাই, কনস্যুলার যোগাযোগ, ভ্রমণ নথি প্রস্তুত এবং দুই দেশের সম্মতিপূর্ণ হস্তান্তর প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। কিন্তু বিএসএফের সাম্প্রতিক ‘পুশ-ইন’র ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বলছে, এসব প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে না। বরং রাতের আঁধারে আলো নিভিয়ে বাংলাদেশি সন্দেহে নারী, শিশুসহ লোকজনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।
ভারত থেকে ‘পুশ-ইন’ বা বাংলাদেশ থেকে ‘পুশ-ব্যাক’ করার কোনো আইনি স্বীকৃতি না থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে এই পদ্ধতি সীমান্তে কার্যকর রয়েছে। তবে এখন হঠাৎ করে ভারত থেকে যে পুশ-ইনের ঘটনা ঘটছে, সেটা নজিরবিহীন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভারতে কোনো বাংলাদেশি নাগরিক থাকলে যথাযথ প্রক্রিয়ায় তাদের তালিকা যেন দেওয়া হয়। তালিকা যাচাইয়ের পর কোনো বাংলাদেশি থাকলে, তাকে গ্রহণ করবে বাংলাদেশ। তবে সেই প্রক্রিয়া না মেনে পুশ-ইনের ঘটনা অব্যাহত রেখেছে ভারত।
ভারতজুড়ে বাংলাভাষীদের নিপীড়ন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি জিততেই পুশ-ইন
ভারতের উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, কেরালা, মহারাষ্ট্র, গুজরাট, দিল্লি, ছত্তিশগড়, অন্ধ্র প্রদেশসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বাংলাভাষীদের, বিশেষ করে বাঙালি মুসলিমদের হেনস্তার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই শোনা যাচ্ছিল। কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি)-সহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে ‘ভিনদেশি’দের তাড়ানোর কার্যক্রম শুরু করলে এই হেনস্তা-হয়রানি বাড়তে থাকে। এমন নিপীড়নের ধারাবাহিকতায় কোথাও কোথাও পিটিয়ে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। এর মধ্যে কেরালায় রামনারায়ণ বাঘেল, অন্ধ্র প্রদেশে মঞ্জুর আলম, উড়িষ্যায় জুয়েল রানাসহ বিভিন্ন এলাকায় কয়েকজনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়।
রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতার এমন বাড়বাড়ন্ত চর্চায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভিন্ন রূপ নেয়। সেখানকার বিজেপির নির্বাচনী এজেন্ডায় ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের’ ফেরত পাঠানোর অঙ্গীকার দেওয়া হয়। পরে রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন কট্টরপন্থি শুভেন্দু অধিকারী। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই কথিত অনুপ্রবেশকারীদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবি করছেন। ইতোমধ্যেই ৮০০-এর বেশি বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানোর দাবি করেছেন তিনি। অবশ্য তার এই দাবিকে ভিত্তিহীন বলেছে বিজিবি।
গত সোমবার (৮ জুন রাতে) জামালপুর-কুড়িগ্রাম সীমান্ত এলাকার আটটি স্থান দিয়ে বিএসএফ ট্রাকে করে শতাধিক মানুষকে বাংলাদেশে পুশ-ইনের চেষ্টা করে। বিজিবি ও স্থানীয়দের প্রতিরোধের মুখে সেই চেষ্টা নস্যাৎ হয়েছে।
তার আগে পঞ্চগড়ের হাড়িভাসা ইউনিয়নের বড়বাড়ি প্রধানপাড়া সীমান্ত দিয়ে শিশুসহ ১০ জনকে পুশ-ইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। তবে নানা কায়দা চালিয়েও ব্যর্থ হয়ে অবশেষে চারদিনের মাথায় গত রোববার (৭ জুন) রাতে সীমান্তের জিরো লাইনে আটকে থাকা শিশুসহ ১০ জনকে ফেরত নিয়ে যায় তারা।
ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর সীমান্তেও ১১ জনকে অবৈধভাবে পুশ-ইনের চেষ্টা চালায় ভারতের সীমান্তরক্ষীরা। ৫ জুন রাত আনুমানিক সাড়ে ৩টার দিকে চালানো সেই চেষ্টাও নস্যাৎ করে বিজিবি।
এছাড়া সিলেট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, যশোর, মেহেরপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাটসহ আরও বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বিএসএফের পুশ-ইন চেষ্টার খবর মিলেছে।
কিছু কিছু ঘটনায় মানবিক পরিস্থিতিও দেখা যাচ্ছে। বিএসএফ পুশ-ইনের জন্য ঠেলে দেওয়ায় খোলা আকাশের নিচে থাকতে হচ্ছে নারী-শিশুসহ কিছু লোকজনকে। সীমান্তের বাংলাদেশিরা অনেক ক্ষেত্রে খাবার-পানীয় পৌঁছে দিলেও স্বাস্থ্যগত নানা জরুরি সমস্যায় ভুগতে হচ্ছে তাদের।
আন্তর্জাতিক আইন কী বলছে
সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সার্বভৌম অধিকার থাকলেও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং শরণার্থী আইনের কিছু মৌলিক নীতি রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো নন-রিফাউলমেন্ট (ফেরত না পাঠানোর নীতি)। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে এমন স্থানে ফেরত পাঠানো যাবে না, যেখানে তার জীবন, স্বাধীনতা বা নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এই নীতি সীমান্তে ‘পুশ-ব্যাক’-এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এমনকি আশ্রয়প্রার্থী বা শরণার্থী কিনা তা যাচাইয়ের সুযোগ না দিয়েও কাউকে ফেরত পাঠানো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, গণহারে বহিষ্কার এবং পরিচয় যাচাই ছাড়া সীমান্ত পার করে দেওয়া প্রশ্নবিদ্ধ হিসেবে বিবেচিত হয়।
ভারতের অবস্থান
সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি আছে। কিন্তু সেটি মূলত অপরাধী বা রাজনৈতিকভাবে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অবৈধ অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) বা নির্দিষ্ট চুক্তি নেই।
বিবিসি বাংলার তথ্য মতে, ভারত জাতিসংঘের শরণার্থী কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ নয়, বাংলাদেশ এতে স্বাক্ষর করেছে। তাই, বাংলাদেশ সেই কনভেনশনের নীতিমালা অনুসরণ করে। এজন্য রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন বিবেচনায় নিতে হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী নয় বলে ভারত নিয়মের মধ্যে না এসে ‘পুশ-ইন’ চেষ্টা চালাচ্ছে।
যদিও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল দিল্লিতে সম্প্রতি এক ব্রিফিংয়ে বলেন, ভারতে অবৈধভাবে অবস্থানকারী বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে দেশটির আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশের সঙ্গে জাতীয়তা যাচাই ও প্রত্যাবাসনের একটি বিদ্যমান ব্যবস্থা রয়েছে এবং যাচাই শেষে বহিষ্কার কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
ভারতের কিছু রাজ্য, বিশেষ করে আসামে, অবৈধ অভিবাসনবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যু। সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং অনুপ্রবেশ ঠেকানোর বিষয়টিও বর্তমানে নয়াদিল্লির নিরাপত্তা নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান
ভারত থেকে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম সীমান্ত দিয়ে পুশ-ইন আগেও হয়েছে। এর মধ্যে, গত বছরের ২২ এপ্রিল ভারতের কাশ্মীরের পেহেলগাঁওয়ে সন্ত্রাসী হামলা হলে সেখানে ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ আটক করার অভিযান শুরু হয়। এরপর ওই বছরের ৭ মে থেকে ২৮ মে পর্যন্ত মৌলভীবাজার, খাগড়াছড়ি, কুড়িগ্রাম, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, চাপাইনবাবগঞ্জ, পঞ্চগড়, ঝিনাইদহসহ বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে শত শত লোককে পুশ-ইন করে ভারত। তবে বিজেপি ক্ষমতায় আসায় এবার পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তে পুশ-ইন চেষ্টা চলছে নজিরবিহীনভাবে।
ভারত থেকে পুশ-ইনের ঘটনায় ঢাকার অবস্থান খুব সুস্পষ্ট। ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যদি কেউ প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশি নাগরিক হন, তবে তাকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য একটি স্বীকৃত কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। সেই প্রক্রিয়া এড়িয়ে সীমান্তে ‘পুশ-ইন’ করা গ্রহণযোগ্য নয়।
এ বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, ভারতের পুশ-ইনের চেষ্টা বিজিবি শক্তভাবে প্রতিহত করছে। নিয়ম না মেনে পুশ-ইনের চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। পুশ-ইন বন্ধে ১২ থেকে ১৩টি চিঠি দেওয়া হয়েছে ভারতকে।
তার মতে, এ ধরনের ঘটনা দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অতীতেও ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে যে, প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।
তিনি বলেন, ইলিগ্যাল (অবৈধ) যারা আছে তাদের ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া আছে। সেটা মেনেই ভারতকে কাজ করতে হবে। পুশ-ইন দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে প্রভাব ফেলবে।
সামনে কী হতে পারে?
পুশ-ইন চেষ্টার বিষয়টি এখন কেবল সীমান্ত নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, এটি আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেরও পরীক্ষার ইস্যু হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ প্রত্যাশা করছে, যে কেউ প্রকৃত বাংলাদেশি হলে তাকে যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে ফেরত পাঠানো হোক। ভারত বলছে—অবৈধ অভিবাসন মোকাবিলা তাদের আইনি দায়িত্ব। এই দুই অবস্থানের মধ্যে সমন্বয় না হলে সীমান্তে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে। দীর্ঘমেয়াদে সমাধান একটাই—জাতীয়তা যাচাইয়ের দ্রুত ব্যবস্থা, যৌথ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, তথ্য বিনিময় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড মেনে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া পরিচালনা। অন্যথায় ‘পুশ-ইন’ ও ‘পুশ-ব্যাক’ ইস্যু বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন অস্বস্তির কারণ হয়ে থাকবে।
মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদুল ইসলাম
নিরাপত্তা বিশ্লেষক
এদিকে ভারত থেকে পুশ-ইন চেষ্টার মধ্যে ৮ জুন থেকে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে ৫৭তম মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলন শুরু হয়েছে। বিজিবি জানিয়েছে, সম্মেলনে অবৈধ পুশ-ইন, সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পাবে।
একদিকে সম্পর্কোন্নয়নের ‘আগ্রহ’ প্রকাশ, অন্যদিকে পুশ-ইন চেষ্টা
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঢাকার সঙ্গে দিল্লির সম্পর্কে তিক্ততা কাটিয়ে ওঠার আভাস মেলে গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সেসময় এক্স (টুইটার) হ্যান্ডেলে দেওয়া এক বার্তায় মোদী তারেক রহমানের উদ্দেশে বলেন, “দ্বিপক্ষীয় বহুমাত্রিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে এবং যৌথ উন্নয়ন লক্ষ্যগুলো এগিয়ে নিতে আমি আপনার সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।”
এরপর ২০ ফেব্রুয়ারি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সার্বিক উন্নয়নে কাজ করবে ভারত। ঢাকার সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায় নয়াদিল্লি। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ইতিবাচক করে তোলাই ভারতের লক্ষ্য।
তিনি বলেন, সে দেশে একটা নতুন সরকার এসেছে। সম্পর্কের উন্নতিতে সব বিষয় নিয়েই নতুন সরকারের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। ভারত চায় দুই দেশের ঐতিহাসিক ও বহুমুখী সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে।
এমনকি গত ঈদুল আজহার সময়ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বার্তা দেন নরেন্দ্র মোদী। সেখানে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন ক্ষেত্রে জনমুখী পারস্পরিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে ভারত সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে আগ্রহী।’
‘পারস্পরিক সহযোগিতা’ ও ‘ঘনিষ্ঠভাবে কাজ’ করার বার্তার বিপরীতে সীমান্তে সাম্প্রতিক পুশ-ইন চেষ্টা ঢাকার সংশ্লিষ্ট মহলে বিভিন্ন প্রশ্নের উদ্রেক করেছে। এদের কেউ কেউ মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের আগে ৯০ লাখ লোককে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তখন বলা হয়েছে, এদের অধিকাংশই বাংলাদেশি। সেটিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য এবং রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য এক পক্ষ থেকে এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তাছাড়া এ রাজ্যের মুসলিমদের একটি নির্দিষ্ট দলের ‘ভোটব্যাংক’ হিসেবে দেখা হয়। পুশ-ইনের মতো ঘটনার মধ্য দিয়ে মুসলিমদের মাঝে ভয় ঢুকিয়ে ফায়দা নেওয়াও হয়ে থাকতে পারে।
ভারতের সঙ্গে তিক্ততা কমাতে হবে
ভারত থেকে পুশ-ইন ঠেকাতে বাংলাদেশ সরকার কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে, জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, পুশ-ইনের ঘটনায় দিল্লি ও কলকাতায় আমাদের কূটনীতিকদের তৎপরতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে তিক্ততা কমাতে হবে। গত দুই বছর ধরে ভারতের বিরুদ্ধে নানা উসকানিমূলক কথাবার্তা বলা হয়েছে। আবার পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের আগে ওখান থেকেও উসকানিমূলক কথাবার্তা এসেছে। দুই প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক ভালো না হলে, এসব ঘটনা ঘটতে থাকবে।
জাতিসংঘ কী করতে পারে?
বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তে পুশ-ইনের ঘটনায় জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ওএইচসিএইচআরের সীমান্তে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ পর্যবেক্ষণ করতে পারে বলে মনে করেন মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদুল ইসলাম।
তিনি বলেন, যদি অভিযোগ ওঠে যে কাউকে জোরপূর্বক সীমান্ত পার করা হয়েছে, আটক রাখা হয়েছে বা নির্যাতনের শিকার করা হয়েছে, তাহলে ওএইচসিএইচআর উদ্বেগ প্রকাশ বা তথ্য চাইতে পারে। এছাড়া জাতিসংঘ সাধারণত দ্বিপক্ষীয় বিরোধে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সরাসরি প্রবেশ করে না, যদি না উভয় দেশ তা চায়। তবে সংলাপ, তথ্য বিনিময় ও মানবিক ব্যবস্থাপনা জোরদারে কূটনৈতিক উৎসাহ দিতে পারে।
কোনো উত্তেজনা তৈরি হবে না: প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা
পুশ-ইন ইস্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে কোনো উত্তেজনা তৈরি হবে না বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, এটি মূলত ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতার বহিঃপ্রকাশ।
সম্প্রতি ভারত থেকে বাংলাদেশে ‘পুশ-ইন’ নিয়ে আলোচনা এবং এ বিষয়ে বাংলাদেশ-ভারত ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্কের ওপর কোনো চাপ তৈরি হচ্ছে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ভারতের পুশ-ইন, বাংলাদেশে যেটা করার চেষ্টা করছে, আমরা নিশ্চয়ই পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন ফলো করেছি। সেখানে নির্বাচন একটা ইস্যু ছিল। এটা তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যাপার, যেটার খানিকটা চাপ আমাদের ওপর আসছে।
তিনি বলেন, আমি এভাবে মনে করি না যে বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো টেনশন তৈরির জন্য ভারতীয় সরকার এটা করছে। পশ্চিমবঙ্গে যে নতুন সরকার দায়িত্বে এসেছে, নির্বাচিত হয়ে, তাদের নির্বাচনের এক ধরনের প্রতিশ্রুতি ছিল। তাদের একটা রাজনীতি আছে। সেটারই এক ধরনের বহিঃপ্রকাশ এটা।