Image description
আলফাজ আনাম
 
আজকে জাতীয় সংসদে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে যে আলোচনা হলো তাতে এই ব্যাংক নিয়ে সরকারের অবস্থান সুস্পষ্ট হয়েছে। একই সাথে এই ব্যাংকের ভবিষ্যত মোটামুটি নির্ধারিত হয়ে গেছে। গতকাল আমি বলেছিলাম বিএনপি ইসলামী ব্যাংককে আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে না দেখে জামাতের রাজনীতির অংশ হিসাবে দেখছে। আওয়ামীলীগের মতো তারা ইসলামী ব্যাংককে জামাত মুক্ত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আজকে সংসদে বিরোধী দলের নেতা শফিকুর রহমানের আনা জরুরি জনগুরুত্বপূর্ন বিষয়ে এই আলোচনায় সরকার পক্ষে দু জন মাত্র অংশ নিয়েছেন স্বারাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ এবং অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সাংবাদিক গ্যালারি ছিলো অনেকটা ফাঁকা। কিন্তু আজকে বাংলাদেশে একটি বড় ঘটনা ঘটে গেলো। যার সূদুর প্রসারী প্রভাব আমরা দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে দেখতে পাবো।
 
আজকে থেকে শুধু ইসলামী ব্যাংক না দেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের পতনের নতুন যাত্রা শুরু হলো। সংসদে সালাহ উদ্দিন আহমদ যে বক্তব্য দিয়েছেন তারা বিটুইন দ্য লাইন ব্যাখা করলে এর চিত্র পাওয়া যাবে। এরমধ্যে দুটি বিষয় এসেছে। প্রথমত তিনি বলেছেন, শেয়ার হোল্ডাররা কিভাবে মালিক হয়েছেন তা ভিন্ন বিষয়। অর্থাৎ এস আলম যেভাবে ইসলামী ব্যাংকের মালিক হয়েছে সেটি তারা বিবেচনায় নিতে নারাজ। অর্থমন্ত্রীও বলেছেন যারা প্রকৃত মালিক তাদের কাছে ব্যাংকটি ফেরত দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তাহলে আইনগত ভাবে এস আলমের দখলটিকে যদি স্বীকার করা না হয় তাহলে বলতেই হবে এস আলম এই ব্যাংকের প্রকৃত মালিক।
দ্বিতীয়ত এস আলমের সময় নিয়োগ দেয়া পটিয়ার হাজার হাজার লোকের কোনো প্রকার যোগ্যতা ও পরীক্ষা ছাড়া নিয়োগের পক্ষে সরাসরি অবস্থান নিয়েছেন। তাদের নিয়োগ শুধু বৈধ নয় আজকের এই বক্তব্যর পর এদের চাকরি ফেরত দেয়ার নৈতিক বৈধতা তিনি আজ দিয়েছেন।
 
সত্যি কথা হলো আজকে যদি এস আলম বিএনপির টিকেটে নির্বাচিত হয়ে সংসদে আসতেন তাহলে ব্যাংক দখল নিয়ে যে সাফাই গাইতেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার কথা গুলো বলেছেন। তার বক্তব্য শুনে মনে হচ্ছিলো তিনি এস আলমের প্রতিনিধি হিসাবে কথা বলছেন।
 
জামাত আজকে পার্লামেন্টে ভালো কোনো যুক্ত উপস্থাপন করতে পারেনি। তাদের শুধু বুক ভরা আবেগ। তবে একথা বলতেই হবে, নতুন নারী সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ ভালো বলেছেন। এছাড়া বিরোধী দলের উপনেতার অবসর নেয়ার সময় হয়েছে। জামাতের আমির যথারীতি জাতির অভিভাবকের দায়িত্ব নিয়েছেন। এটি জামাতের জাতীয় রোগ। তারা প্রায়ই দেশের ড্যাডি ও মাম্মি বনে যান।
তবে এস আলমের সাথে বিএনপির বা সালাহউদ্দিন আহমদের যে গভীর সংযোগের গুঞ্জন আছে আজকে যেনো তা সত্যি হিসাবে প্রমান করলেন। এস আলমের গাড়ি কেলেংকারির কারনে তার বিরুদ্ধে যে দল শাস্তিমুলক ব্যবস্থা নিয়েছিলো সে কথা পর্যন্ত জামাত তুলে ধরতে পারেনি। মাগরিবের নামাজের সময় বিএনপির একজন তরুন এমপির সাথে আলাপের সময় সালাহ উদ্দিন আহমদের বক্তব্যর সূত্র ধরে বললেন, জামাত আজকে ভদ্রতা দেখিয়ে অনেক কিছু বলেনি। আসলে বলতে পারার ক্যাপাসিটি তাদের নেই।
 
ইসলামী ব্যাংকের সাথে জামাতের যোগসূত্রের দুটি উদহারন দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এনেছেন, একটি নাবিল গ্রুপের ঋন এবং আরডিএসে অর্থ বিতরনে অনিয়ম। নাবিল গ্রুপ ঋন পেয়েছে এস আলমের সময় । সে ব্যাপারে সরকার ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু তারা কেন নিচ্ছে না সেটি এক রহস্য। জামাত দল হিসাবে কিংবা প্রথম সারির কোনো নেতা জড়িত কিনা তা তদন্ত করে প্রমান করতে পারে কিন্তু তাও করা হচ্ছে না। আরডিএসের টাকা অনিয়মের মাধ্যমে বিতরন হয়েছে এর কোনো প্রমান দেয়া হয়নি। জামাত আমির অবশ্য এই বিষয়ে আবুল বারাকাতের উদহারন এনেছে। গতকাল আমি বলেছি বিএনপির ভেতরে থাকা বামপন্থী কৌশলবিদরা আবুল বারাকাতের তত্ব ভিন্নভাবে হলেও বিশ^াস করে। আজকে সংসদে দুই মন্ত্রীর বক্তব্য শুনে আমার বিশ^াস এস আলমের সাথে বিএনপির বোঝাপড়া আছে। ভিন্ন নামে হলেও ব্যাংকে এস আলমের মালিকানা থাকবে। হয়তা এস আলম কিছু টাকা ফেরতও দিতে পারে।
এখন দেখা যাক আজকের পর ইসলামী ব্যাংকের অবস্থা কি হয় ? সম্ভবত আমানত উঠে নেয়ার প্রবনতা আরো বাড়বে। জামাত আমির তার বক্তব্য রেমিটেন্সের বিষয়টি এনেছেন। ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিটেন্স প্রবাহ কমবে। তবে তা যদি হুন্ডিতে রুপান্তর হয় তাহলে তা দেশের জন্য বিপর্যয়কর হতে পারে।
 
এই ঘটনার রাজনৈতিক প্রভাব পড়বে। জামায়াতের সাথে বিএনপির সর্ম্পক সামনের দিনগুলোতে আরো খারাপ হবে। জামাত দল হিসাবে ইস্যুভিত্তিক অবস্থান নিতে পারে না। অর্থাৎ কোনো ইস্যুতে তারা সরকারকে সমর্থন দেবে আবার কোনো ইস্যুতে দেবে না। এমন অবস্থান নিতে পারে না। এমনকি বার্গেনিং করার ক্যাপাসিটও দলটির কম। অতীতে আওয়ামীলীগ ও বিএনপির সাথে সর্ম্পকের ক্ষেত্রে তা দেখা গেছে। এর ফলে জামাতের মাঠ পর্যায়ের নেতা কর্মীরা বিএনপির ওপর ক্ষুদ্ধ হবে। এর প্রভাব আমরা আগামি দিনে দেখবো।
 
সরকারের দুই মন্ত্রী পরোক্ষভাবে হুমকি দিয়েছেন। মামলার কথাও স্মরন করে দিয়েছেন। ব্যাংকের ভেতরে যারা কর্মসূচী বাস্তবায়নের জন্য গিয়েছেন তাদের ভিডিও থাকার কথাও বলেছেন। সম্ভবত ধরপাকড় শুরু করতে পারে। তবে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে আওয়ামীলীগ যে কাজটি করেনি সেই কাজটি বিএনপি করবে, কয়েক দিনের মধ্যে মিডিয়ায় ইসলামী ব্যাংকের দুরবস্থার জন্য জামাতকে দায়ী করা হবে। তবে শেষ কথা হলো বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের যে সম্ভবনা তৈরি হয়েছিলো তার মৃত্যু ঘটতে যাচ্ছে। এটি ছিলো একটি সুদুর প্রসারী পরিকল্পনা যা এখন বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে। আর জামাতকে কোনঠাসা করতে বিএনপির এই উদ্যেগ থেকে কতটা লাভবান হবে তা সামনের দিনগুলোতে স্পষ্ঠ হবে।