Image description

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ইলেকট্রনিক খাতে বড় ধরনের কড়ছাড়ের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে একদিকে যেমন দেশে তৈরি বিভিন্ন গৃহস্থালিসামগ্রী ও প্রযুক্তিনির্ভর পণ্যের দাম কমতে পারে। অন্যদিকে দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা এবং বিলাসী পণ্য নিরুৎসাহিত করতে কিছু আমদানি করা পণ্যের দাম বাড়তে পারে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগামী বাজেটে কর ও ভ্যাট হ্রাসের বিভিন্ন প্রস্তাবের কারণে বেশ কিছু পণ্য ও সেবার দাম কমবে।

ইলেকট্রনিক ও গৃহস্থালি পণ্য: দেশে উৎপাদিত টেলিভিশন, এসি, ফ্রিজ ও হাউজহোল্ড পণ্যের ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হতে পারে। একই সঙ্গে দেশীয় এসব ইলেকট্রনিক পণ্যের কাঁচামাল আমদানিতেও শুল্ককর ছাড় দেওয়া হতে পারে এবং এই অব্যাহতি সুবিধা আগামী ২০৩০ সাল পর্যন্ত বজায় থাকতে পারে। এর ফলে দেশে তৈরি এসি, ফ্রিজ, টেলিভিশন, ওয়াশিং মেশিন ও অন্যান্য হাউজহোল্ড পণ্যের দাম কমতে পারে।

প্রযুক্তি পণ্য: দেশে তৈরি ল্যাপটপ, কম্পিউটার, মনিটর ও মোবাইল ফোনের দাম কমতে পারে।

বাদ্যযন্ত্র: বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র আমদানিতে বর্তমানে বিদ্যমান ৫ শতাংশ শুল্ককর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হতে পারে।

ইলেকট্রিক গাড়ি ও ই-বাইক: স্থানীয় উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে ইলেকট্রিক গাড়ি ও ই-বাইক উৎপাদনে কর রেয়াত সুবিধা দেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি ইলেকট্রিক গাড়ির রেজিস্ট্রেশনে অগ্রিম আয়কর ২ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে গাড়ির কিলোওয়াট অনুযায়ী ২৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা করা হতে পারে।

সৌর বিদ্যুৎ: সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রে খরচ কমার সম্ভাবনা রয়েছে, যা আমদানিকৃত জ্বালানি তেলের ওপর চাপ কমাবে।

ভোজ্যতেল: দেশীয় ভোজ্যতেল উৎপাদনে করছাড় সুবিধা আরও ১০ বছর অব্যাহত রাখা হতে পারে।

স্বর্ণ: স্বর্ণ বিক্রিতে বর্তমানে বিদ্যমান ৫ শতাংশ ভ্যাটের পরিবর্তে ভরিপ্রতি সুনির্দিষ্ট হারে আড়াই হাজার টাকা নির্ধারণ করা হতে পারে। এ ছাড়া এ খাতের উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ এবং টার্নওভার কর ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করা হতে পারে।

মোবাইল সিম: মোবাইল সিমের ওপর থাকা ৩০০ টাকা কর বাতিল করা হতে পারে।

চিকিৎসাসামগ্রী: কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে ৫ শতাংশ আগাম কর প্রত্যাহার করা হতে পারে, যার ফলে কিডনি ডায়ালাইসিস বাবদ খরচ প্রতিবারে প্রায় ৬০০ টাকা কমতে পারে।

লিপস্টিক: আমদানিকৃত লিপস্টিকের শুল্ক প্রতি কেজিতে ৪০ ডলার থেকে কমিয়ে ৩০ ডলার করা হতে পারে।

অন্যান্য সুবিধা: ১১৩টি পণ্যের ওপর আরোপিত ৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার হতে পারে। কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের ওপর থাকা সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট এবং ৭ শতাংশ আয়কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হতে পারে। মেট্রোরেল সেবাকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হতে পারে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতি মাসের পরিবর্তে ৩ মাস অন্তর অন্তর ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের সুযোগ দেওয়া হতে পারে (তবে ভ্যাট প্রতি মাসেই জমা দিতে হবে)। এ ছাড়া রপ্তানি বাড়াতে বন্ড সুবিধার আওতা বাড়িয়ে যেকোনো খাতের জন্য উন্মুক্ত করা হতে পারে।

যেসব পণ্যের দাম বাড়তে পারে

দেশীয় শিল্প রক্ষা ও রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যে বেশ কিছু আমদানিকৃত, বিলাসী এবং তামাকজাত পণ্যের ওপর শুল্ক-কর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হতে পারে।

আমদানিকৃত কাজু বাদাম: দেশে বাণিজ্যিকভাবে কাজু বাদাম চাষ শুরু হওয়ায় দেশীয় চাষিদের সুরক্ষায় আমদানিকৃত কাজু বাদামের শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হতে পারে।

আমদানিকৃত মাছ: উচ্চ মূল্যের বা দামি হিমায়িত মাছ আমদানিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং পাঙাস মাছের ফিলেট আমদানিতে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বসানো হতে পারে।

তামাকজাত পণ্য: সিগারেটের দাম প্যাকেট প্রতি ৫-৭ টাকা বাড়তে পারে। খুচরা বিক্রেতাদের প্রতি হাজারে ২ টাকা অগ্রিম কর দিতে হতে পারে। এ ছাড়া গুল ও জর্দার ওপরও কর বাড়তে পারে। সিগারেটের ফিল্টার তৈরির পেপার আমদানিতে ৩০০ শতাংশ ও নিকোটিনে ৩৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বসতে পারে। নিকোটিন পাউচে ৪০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক এবং অপ্রক্রিয়াজাত তামাকের উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতি তুলে নিয়ে প্রতি কেজিতে ৫০ টাকা সুনির্দিষ্ট ভ্যাট আরোপ করা হতে পারে।

মদ ও বিলাসী পণ্য: আমদানিকৃত বিদেশি মদের দাম বাড়তে পারে, যেখানে বর্তমানে মান ও ব্র্যান্ডভেদে ৬০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ককর রয়েছে। এছাড়া দেশীয় একমাত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কেরু অ্যান্ড কোং-এর উৎপাদিত মদের ওপর লিটারপ্রতি ৫০০ টাকা হারে ভ্যাট বসানো হতে পারে।

নির্মাণসামগ্রী (এমএস রড ও স্ক্র্যাপ): মাইল্ড স্টিল (এমএস) ও সমজাতীয় পণ্যের উৎপাদন পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট কর (ভ্যাট) প্রায় ১০ শতাংশ বাড়ানো হতে পারে। এতে রি-রোলেবল স্ক্র্যাপ থেকে তৈরি এমএস পণ্যের কর প্রতি টনে ১ হাজার ৭০০ টাকা থেকে ১৭০ টাকা বাড়তে পারে। মেল্টেবল স্ক্র্যাপ থেকে তৈরি বিলেট ও ইনগটের কর প্রতি টনে দেড় হাজার টাকা থেকে ১৫০ টাকা এবং বিলেট বা ইনগট থেকে তৈরি এমএস পণ্যের কর প্রতি টনে ১৬০ টাকা বাড়তে পারে। এছাড়া মেল্টেবল স্ক্র্যাপ থেকে উৎপাদিত ইনগট বা বিলেট এবং সেই ইনগট বা বিলেট থেকে তৈরি এমএস পণ্যের কর প্রতি টনে ২২০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।

আমদানিকৃত প্রযুক্তি ও অন্যান্য পণ্য: আমদানিকৃত ল্যাপটপ, কম্পিউটার, মনিটর, প্রিন্টার এবং অন্যান্য বিদেশি ইলেকট্রনিক সামগ্রীর ওপর শুল্ক বৃদ্ধির কারণে এগুলোর দাম বাড়তে পারে।

অন্যান্য বিলাসী পণ্য: নতুন ১০টি পণ্যের আমদানি পর্যায়ে ২০ শতাংশ ভ্যাট আরোপ হতে পারে। বিদেশি প্রসাধনী, বিলাসসামগ্রী ও উচ্চ মূল্যের আমদানিকৃত খাদ্য পণ্যের ওপর শুল্ককর বৃদ্ধি পাওয়ায় এগুলোর দাম বাড়তে পারে। এ ছাড়া ৩৫০০ সিসির বেশি বিলাসবহুল গাড়ির দামও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।