Image description

পাহাড়ি লাল মাটির বুক চিরে যেখানে মাইলের পর মাইল আনারসের সবুজ বাগান জেগে থাকে, সেই টাঙ্গাইলের মধুপুরকে বলা হয় আনারসের রাজধানী। এখানকার রসালো ও সুস্বাদু আনারসের খ্যাতি দেশজুড়ে। কিন্তু ফলন শেষে মাঠেই পচে নষ্ট হতো টন কে টন আনারসের পাতা ও গাছ, যা ছিল কৃষকদের কাছে এক প্রকার বাড়তি বোঝা।

তবে এবার সেই ফেলনা পাতা আর বর্জ্যই বদলে দিচ্ছে দেশের ডেইরি খাতের চেনা সমীকরণ। মধুপুরের প্রত্যন্ত চুনিয়া ফৈটামারি গ্রামের এক দূরদর্শী তরুণ আসাদুজ্জামান আসাদ সেই বর্জ্যকেই রূপ দিয়েছেন উচ্চ পুষ্টিমানের সাশ্রয়ী গো-খাদ্য ‘সাইলেজে’। তার এই অভিনব উদ্যোগ খামারিদের মুখে যেমন হাসি ফুটিয়েছে, তেমনি তাকে এনে দিয়েছে দারুণ এক সফলতার গল্প।

সবুজে ঘেরা চুনিয়া ফৈটামারি গ্রামে আসাদের খামারে ঢুকলেই কানে আসবে মেশিনের অবিরাম শব্দ। একদিকে স্তূপ করে রাখা আনারসের পাতা মেশিনে ঢুকছে, অন্যদিকে তরল প্রোটিন ও দানাদার পুষ্টির মিশ্রণে প্রক্রিয়াজাত হয়ে তা রূপ নিচ্ছে সুগন্ধি সাইলেজে। কর্মব্যস্ত কর্মচারীরা সেই গো-খাদ্য পরম যত্নে ভরছেন প্লাস্টিকের বস্তায়।

অথচ আসাদের জন্য এই সফলতার পথটা মোটেও সহজ ছিল না। শুরুর দিনগুলোর কথা মনে করে তিনি বলেন, ‘প্রথমদিকে যখন আনারসের ফেলে দেওয়া পাতা আর গাছ দিয়ে গবাদি পশুর খাদ্য তৈরির কথা ভাবি, তখন মানুষ আমাকে পাগল বলে হাসাহাসি করত। কিন্তু আমি মানুষের কথায় কান না দিয়ে নিজের ভাগ্যের ওপর ভরসা রেখে কাজ চালিয়ে গেছি।’

আসাদের এই স্বপ্নের পালে হাওয়া লাগে ২০২৪ সালে। পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এর আর্থিক সহায়তা ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এসএসএস-এর কারিগরি প্রশিক্ষণে তিনি সাইলেজ তৈরির আধুনিক কলাকৌশল রপ্ত করেন। এসএসএস থেকে পাওয়া ৯ লাখ টাকার অনুদানে কিনে ফেলেন একটি সাইলেজ তৈরির মেশিন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।

বর্তমানে আসাদের এই কারখানায় প্রতিদিন উৎপাদিত হচ্ছে ৬ টন সাইলেজ। তার অধীনে নিয়মিত কাজ করছেন ৮ জন শ্রমিক, যাদের দৈনিক ৬০০ টাকা হারে মজুরি দেওয়া হয়। সব খরচ, শ্রমিকদের বেতন এবং কাঁচামাল কেনার খরচ বাদ দিয়ে আসাদ এখন প্রতি মাসে নিট লাভ করছেন দেড় লাখ টাকা। আর তাকে দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে এলাকার হুমায়ুন কবির ও আব্দুল আলিমসহ আরও অনেক বেকার যুবক এখন স্বাবলম্বী হওয়ার পথ খুঁজে পেয়েছেন।

জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের তথ্য ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আনারসের পাতায় তৈরি এই সাইলেজ গবাদি পশুর জন্য এক অনন্য পুষ্টির উৎস। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হেলাল উদ্দিন জানান, এই সাইলেজে প্রচুর পরিমাণে সেলুলোজ ও প্রোটিন রয়েছে, যা গবাদিপশুর পরিপাকতন্ত্রকে স্বাভাবিক রাখে ও প্রজনন ক্ষমতা উন্নত করে। গাজন (ফার্মেন্টেশন) প্রক্রিয়ার ফলে পাতার শর্করা ল্যাকটিক অ্যাসিডে রূপান্তরিত হয়, যা গরুর হজমশক্তি বাড়ায়। বিশেষ করে দুগ্ধবতী গাভীকে এই সাইলেজ খাওয়ালে দৈনিক দুধ উৎপাদন প্রায় ২ থেকে ৩ লিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়, গরুর শারীরিক বৃদ্ধিও হয় দ্রুত।

এই গো-খাদ্যের সবচেয়ে বড় চমক এর আকাশপাতাল দামের পার্থক্য। বাজারে যেখানে ভুট্টার সাইলেজ প্রতি কেজি ১৫ থেকে ১৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, সেখানে আসাদ কৃষকদের কাছ থেকে পাতা কিনে তা প্রক্রিয়াজাত করে খামারিদের কাছে বিক্রি করছেন মাত্র ৫ থেকে ৬ টাকা কেজিতে। প্লাস্টিকের বস্তায় মুখবন্ধ অবস্থায় এই খাদ্য অনায়াসে ৬ মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়।

কম দাম এবং গুণগত মান চমৎকার হওয়ায় দেশের বড় বড় খামারিরা এখন ঝুঁকছেন আসাদের এই সাইলেজের দিকে। ভুয়াপুরের খামারি শিহাব উদ্দিন প্রতি সপ্তাহে ১০ টন, মধুপুরের রেজাউল করিম ৬ টন এবং নাজমুল সাদাত নোমান ১২ টন করে সাইলেজ নিয়মিত নিচ্ছেন আসাদের কাছ থেকে। শুধু টাঙ্গাইলই নয়, এই আনারস পাতার সাইলেজ এখন ট্রাকবোঝাই হয়ে চলে যাচ্ছে ঢাকার সাভার, রংপুর, সিরাজগঞ্জ ও দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্ন আধুনিক ডেইরি ফার্মে।

ভুয়াপুর থেকে সাইলেজ কিনতে আসা খামারি শিহাব উদ্দিন বলেন, ‘এই কম দামি ও মানসম্মত সাইলেজ নিয়মিত খাওয়ানোর পর থেকে আমার খামারের খাদ্যের পেছনে ব্যয় অনেক কমে গেছে। এই প্রযুক্তি যদি দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তবে খামারিরা অনেক কম খরচে গরু লালন-পালন করতে পারবেন এবং বাজারে গরুর মাংসের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে চলে আসবে।’

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এসএসএস-এর ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক সন্তোষ চন্দ্র পাল জানান, মধুপুরের পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে তারা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। প্রতি বছর মাঠে যে হাজার হাজার টন আনারসের পাতা নষ্ট হতো, সেটিকে কাজে লাগিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতি সচল করতে তারা ‘স্মার্ট এইচভিসি’ প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। এই প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে ১ হাজার ৮০০ জন সদস্যকে ক্ষুদ্র অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, যার মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন আত্মকর্মসংস্থান।

মাঠের বর্জ্যকে প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করা এই পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী সাইলেজ যেন বাংলাদেশের দুগ্ধ ও পশুপালন খাতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগও বিষয়টিকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে দেখছে। প্রান্তিক খামারিদের মাঝে এই সাশ্রয়ী খাদ্য ছড়িয়ে দিতে এবং এর ব্যবহার বাড়াতে ইতোমধ্যে জেলার প্রতিটি উপজেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের বিশেষ দিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। 

 

মধুপুরের আনারসের পাতার এই সফল রূপান্তর প্রমাণ করে, সঠিক উদ্যোগ আর আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া পেলে যেকোনো ফেলে দেওয়া বর্জ্যকেও সম্পদে পরিণত করা সম্ভব।