নিষিদ্ধ ঘোষিত উগ্রবাদী সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আব্দুর রহমানের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার ২০ বছর পর আবারও চালু হয়েছে আলোচিত সেই ‘চরশী হাবিরুন্নেসা হাফিজিয়া মাদ্রাসা। অভিযোগ রয়েছে, একসময় এই মাদ্রাসা থেকেই জেএমবির তাত্ত্বিক ও সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।
২০০৫ সালে দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে দেশজুড়ে সিরিজ বোমা বিস্ফোরণের পর বন্ধ হয়ে যায় মাদ্রাসাটি। কিন্তু আওয়ামী সরকারের পতনের পর ২০২৫ সালে মাদ্রাসাটি ফের নতুন করে চালু করেছেন শায়খ আব্দুর রহমানের ছোট ভাই মাওলানা ওবায়দুর রহমান।
জামালপুর সদর উপজেলার তিতপল্লা ইউনিয়নের চরশী খলিফাপাড়া গ্রামে শায়খ আব্দুর রহমানের বাবা মৃত মাওলানা আব্দুল্লাহ ইবনে ফজল (ফজল মুন্সী) ১৯৭৫ সালে মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন।
প্রায় দুই দশক পর মাদ্রাসাটি ফের চালু হওয়ায় নতুন করে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। জামালপুর শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে চরশী খলিফাপাড়ায় ওই মাদ্রাসায় গিয়ে দেখা যায়, প্রায় এক একর জমির ওপর পুরোনো একটি মসজিদের পেছনে তিনটি নতুন হাফ-বিল্ডিং ভবন নির্মিত হয়েছে। বর্তমানে সেখানে প্লে থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত নুরানি ও বাংলা পদ্ধতিতে প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থীর পাঠদান চলছে।
মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক মো. জাকারিয়া হোসেন বলেন, ২০০০ সালের দিকে এই মাদ্রাসা খুবই রহস্যময় ছিল। এখানকার শিক্ষক বা শিক্ষার্থী কেউই স্থানীয় ছিলেন না, সবাই আসতেন বাইরে থেকে। তখন মাদ্রাসার ভেতরে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আমরা শুনেছি তখন এখানে ক্যাডেট সেকশনে পড়ানো হতো।
তবে বর্তমানের চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন দাবি করে তিনি বলেন, এখন দরজা সব সময় খোলা। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই স্থানীয়। আগে খুললেই পুলিশ আসত, দেড় বছর ধরে আমরা শান্তিতে চালাচ্ছি।
মাদ্রাসার পরিচালক মাওলানা ওবায়দুল রহমানের স্ত্রী সাবিনা খাতুন বলেন, তার স্বামী দীর্ঘ ১৩ বছর কারাভোগের পর মুক্ত হয়ে পৈতৃক এই প্রতিষ্ঠানটি পুনর্গঠনের কাজ করছেন। জমি নিয়ে স্থানীয় একটি পক্ষের সঙ্গে বিরোধের জেরে অতীত ইতিহাস টেনে জলঘোলা করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে দাবি তার।
মাদ্রাসার পরিচালক ওবায়দুর রহমান বলেন, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আমি মাদ্রাসাটি সংস্কার করি এবং ২০২৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করি। বড় করে একটি ওয়াজ মাহফিলও করেছি।
মাদ্রাসাটি চালুর বিষয়ে সরকারি বা প্রশাসনিক অনুমতি নেওয়া হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ২০০৫ সালের দিকে আমাদের পরিবারের সংকটের কারণে পরিচালক না থাকায় এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়েছিল। কোনো কর্তৃপক্ষ এটি সিলগালা বা বন্ধ করেনি। তাই পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে আমরা কারও আলাদা অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন মনে করিনি।
এ বিষয়ে জামালপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুস সাকিব এশিয়া পোস্টকে বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে রয়েছে। পুলিশ সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চলাফেরা ও গতিবিধির ওপর নজরদারি রাখা হচ্ছে।
শায়খ আব্দুর রহমানের পরিবার এখন কোথায়
জামালপুর শহরের একটি উন্নত এলাকায় মাত্র পাঁচ শতাংশ জমির ওপর একতলা বাড়িতে একসময় বসবাস ছিল পরিবারটির। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে একটি আধুনিক তিনতলা ভবন নির্মাণ হয়েছে। ভবনের আটটি ইউনিটের মধ্যে দ্বিতীয় তলায় মেয়েকে নিয়ে থাকেন শায়খ আব্দুর রহমানের স্ত্রী নূরজাহান বেগম। ছেলেরা কর্মসূত্রে ঢাকায় থাকায় বাকি ইউনিটগুলো ভাড়া দেওয়া হয়েছে।
শায়খ আব্দুর রহমানের পরিবারের বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় কোনো রাজনৈতিক নেতা প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তাদের দাবি, বিষয়টি সম্পর্কে তাদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য নেই।
শায়খ আব্দুর রহমানের স্ত্রী এশিয়া পোস্টকে বলেন, আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। ওদের আব্বু ১৭ থেকে ১৮ বছর আগে মারা গেছন। এসব অনেক পুরোনো কথা। আমাদের কোনো সমস্যা নেই।
নূরজাহান বেগম (আয়েশা রহমান রূপা) আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এবং জামালপুর-৩ আসনের টানা সাতবারের সাবেক এমপি মির্জা আজমের আপন ছোট বোন।