নেত্রকোনার আটপাড়া ও কেন্দুয়া উপজেলার দায়িত্বে থাকা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা মো. ইমরান হোসেন বসবাস করেন ঢাকার সাভারে নিজ বাড়িতে। তার বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময় অনুমতি ছাড়াই কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ইমরান হোসেনের মূল পোস্টিং নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলায়। পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে পার্শ্ববর্তী কেন্দুয়া উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মো. ইমরান হোসেনের কর্মস্থল কেন্দুয়া ও আটপাড়া উপজেলা হলেও তিনি ঢাকার সাভারে বসবাস করেন।
অভিযোগ রয়েছে, ঈদুল আজহার সরকারি ছুটি শুরুর আগেই গত ২৩ মে অফিসের কাজ শেষে তিনি সাভারে চলে যান। অথচ সরকারি ছুটি শুরু হয়েছিল ২৬ মে থেকে।
এদিকে গত ১৩ মে থেকে আটপাড়া ও কেন্দুয়া উপজেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারের ভর্তুকিমূল্যের ওএমএস (ওপেন মার্কেট সেল) কার্যক্রম চলমান রয়েছে। দুই উপজেলায় প্রতিদিন ওএমএসের মাধ্যমে প্রায় ২ টন চাল ও ২ টন আটা বিক্রি করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ওএমএসের চাল উত্তোলনের ডেলিভারি অর্ডার (ডিও) এবং ধান-চাল সংগ্রহ সংক্রান্ত বিভিন্ন নথিতে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের স্বাক্ষর প্রয়োজন হয়। অভিযোগ রয়েছে, কর্মকর্তার অনুপস্থিতির সুযোগে অনেক ক্ষেত্রে নিয়মিত তদারকি হয়নি এবং ওএমএসের চাল বিতরণ নিয়ে অনিয়মের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমনকি অনেক পয়েন্টে চাল ও আটা বিতরণ না করে আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
আটপাড়া উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের উপ খাদ্য পরিদর্শক শরীফা আক্তার প্রথমে কর্মকর্তার অনুপস্থিতির বিষয়টি অস্বীকার করলেও পরে বলেন, ‘স্যার (ইমরান হোসেন) ঈদের পরের সপ্তাহে অসুস্থতার কারণে ছুটিতে ছিলেন। তাই অফিসে আসেননি। ৬ জুন কেন্দুয়ায় চাল সংক্রান্ত একটি সমস্যা দেখা দিলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ফোন পেয়ে তিনি ওই রাতেই চলে আসেন। স্যার ঢাকায় থাকেন। এখানে এসে ডাকবাংলোতে অবস্থান করে দায়িত্ব পালন করেন। পরে বৃহস্পতিবার চলে যান এবং শনিবার রাতে আবার আসেন।’
কেন্দুয়া খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ঢাকায় বসবাস করে নিয়মিতভাবে আটপাড়া ও কেন্দুয়ার দায়িত্ব পালন করা বাস্তবে কঠিন। ফলে অনেক সময় অফিসে পাওয়া যায় না। কিছু ক্ষেত্রে চালের ডিও পরে এসে একসঙ্গে স্বাক্ষর করেন তিনি। এতে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।’
তারা আরো বলেন, ‘খাদ্য বিভাগের মতো জনসেবামূলক গুরুত্বপূর্ণ খাতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত না হলে সরকারি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।’
এসব অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. ইমরান হোসেন বলেন, ‘ঈদের আগে দায়িত্ব পালন শেষে বাড়ি গিয়েছি। ঈদের পরের সপ্তাহেও এসেছিলাম দুই-একদিন ডিউটি করে চলে গেছি। আমি অসুস্থ্য তাই একটু সমস্যা হয়েছে। আরো কিছু জানতে হলে সরাসরি বলব। তারপর ফোনের সংযোগ কেটে দেন। পরে পরিচিত লোকজনকে দিয়ে এ বিষয়ে সংবাদ না প্রকাশ করার জন্য তদবির করেন তিনি। ভালো কোথায়ও পোস্টিও দেওয়া হবে ঊর্ধ্বতনদের এমন আশ্বাসে ইমরান হোসেন এখানে কোনরকম দিনপার করছেন বলেও তদবিরকারীরা জানায়।
স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে খাদ্য বিভাগের কার্যক্রমে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে।
বিষয়টি অবহিত করলে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোয়েতাছেমুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি আপনার কাছ থেকেই প্রথম জানলাম। আমাকে ওই কর্মকর্তা কিছুই জানায়নি। খোঁজ নিয়ে সত্যতা পাওয়া গেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
উল্লেখ্য, গত ৬ জুন কেন্দুয়া উপজেলার টেঙ্গুরি এলাকায় একটি পরিত্যক্ত অটোরাইস মিলে বিপুল পরিমাণ অবৈধভাবে মজুদ চাল পওয়া যায়। পরে এ ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। এরআগে গত ১৪ মে রাতে জেলার মদন উপজেলায় ২০ টন চালবোঝাই ট্রাক জব্দ করে প্রশাসন। পরে খাদ্য অধিদপ্তরের তদন্তে গুদামে আরও প্রায় ৪৪ টন চাল অতিরিক্ত মজুদ পওয়া যায়। এসব ঘটনায় উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক দুলাল মিয়া ও গুদাম কর্মকর্তা মাহমুদুল আলমকে বরগুনা জেলায় বদলি করা হয়। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোয়েতাছেমুর রহমানের প্রশ্রয়ে এমন অনিয়ম ও দুর্নীতি চলমান রয়েছে।