Image description

গলির মুখে ঢুকে বাঁ দিকে একটি ভবনে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো। ডান দিকে সারি সারি ভবন। এর মধ্যে একটি ভবনের নিচতলায় পাঁচ বছরের শিশু মো. ইব্রাহিম খলিলদের বাসা।

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী এলাকার এই শিশু ২৮ দিন ধরে নিখোঁজ। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, লাল জামা পরা শিশুটি নিজেদের ভবনে প্রবেশ করেছে। কিন্তু ভবন থেকে তার বের হয়ে যাওয়ার কোনো ফুটেজ নেই। তাই শিশুটির বাবা মো. জসিমের প্রশ্ন, ‘আমার ছেলে কি বাড়িতে ঢুকে হাওয়া হয়ে গেল?’

শিশুটি যে স্যান্ডেল জোড়া পরে বাসা থেকে বের হয়েছিল, তা পড়ে ছিল ভবনটির মূল ফটকের ভেতরের অংশে। পুলিশ এখন পর্যন্ত ঘটনার কোনো ‘ক্লু’ খুঁজে পায়নি।

শিশু মো. ইব্রাহিম খলিল
শিশু মো. ইব্রাহিম খলিলছবি: পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া

শিশুটির মা-বাবার সন্দেহ, এই বাড়ির ভেতরের কেউ তাঁদের সন্তানকে অপহরণ করেছে। তাঁদের সন্তান নিখোঁজের ঘটনাটি ‘ভাইরাল’ না হওয়ায় পুলিশ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে না বলে অভিযোগ এই মা-বাবার।

শিশু ইব্রাহিম স্থানীয় ফুচকা বিক্রেতা জসিম ও নাসরিন আক্তার ওরফে নাজমীন দম্পতির তৃতীয় সন্তান। গতকাল সোমবার দুপুরে শিশুটির বাসায় গিয়ে কথা হয় তার মা-বাবাসহ প্রতিবেশীদের সঙ্গে। আর মুঠোফোনে বাড়িওয়ালার এক সন্তান ও পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়।

স্যান্ডেল পড়ে ছিল

ইব্রাহিমের পরিবার ভবনটির নিচতলার দুটি কক্ষে ভাড়া থাকে। নিচতলার আরেকটি কক্ষসহ দোতলা পর্যন্ত থাকেন ভাড়াটেরা। তিন ও চারতলাসহ ছাদের একটি অংশে বাড়িওয়ালার সন্তানেরা পরিবার নিয়ে থাকেন।

ইব্রাহিমের বাবা জসিম এই প্রতিবেদককে বলেন, তাঁর স্ত্রী নাসরিন ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা। স্ত্রীর শরীর বেশি ভালো নয়। গত ১৩ মে ঘটনার দিন তাঁর স্ত্রী শুয়ে ছিলেন। তাঁদের অপর দুই সন্তান মাদ্রাসায় গিয়েছিল। পাশের ভবনে ইব্রাহিমের এক খেলার সঙ্গীর বাসা। ইব্রাহিম তার মায়ের কাছ থেকে দুটো বিস্কুট নিয়ে বলেছিল, একটি তার খেলার সঙ্গীকে দেবে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সন্ধ্যা ৭টা ৪১ মিনিটে লাল জামা পরা ইব্রাহিম নিজেদের ভবনের মূল ফটক দিয়ে ভেতরে ঢোকে। তার পেছনে পেছনে ঢোকেন বাড়িওয়ালার ছেলে ওমর শরিফ।

সেদিন রাত ১১টায় বাসায় আসেন বলে জানান জসিম। তিনি বলেন, বাসায় এসে তিনি জানতে পারেন, ইব্রাহিম তখনো আসেনি। অথচ ভবনের ফটকের ভেতরে তার স্যান্ডেল জোড়া অগোছালো অবস্থায় পড়ে ছিল। বাড়িওয়ালার সন্তানদের বাসায় ইব্রাহিম প্রায়ই যেত। সেখানে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। আশপাশের বন্ধুর বাসা, খালার বাসায় খোঁজ করে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে ভোর পর্যন্ত এলাকায় মাইকিং করা হয়। পরদিন পল্লবী থানায় গিয়ে ছেলে নিখোঁজ জানিয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তিনি। গলির মুখে সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়েছে এলাকার বাড়িমালিক সমিতি। সেখানে গিয়ে ফুটেজ দেখতে চাইলে তাঁকে বলা হয়, মনিটর নষ্ট। তাঁকে পেনড্রাইভে করে ফুটেজ নিতে বলা হয়। তিনি পেনড্রাইভ কিনে ফুটেজ সংগ্রহ করেন। ফুটেজ দেখে নিশ্চিত হন, সেদিন তাঁর ছেলে ভবনের ফটক দিয়ে ঢুকেছিল। ছেলের বের হয়ে যাওয়ার কোনো ফুটেজ নেই।

ফুটেজে একটি শিশুর কণ্ঠে ‘বাবা বাবা’ চিৎকার শুনেছেন বলে জানান জসিম। এই কণ্ঠ তাঁর ছেলের বলে মনে হয়েছে।

ইব্রাহিমের মা নাসরিন বলেন, বাড়িওয়ালার পরিবারের লোকজনকে তাঁরা সন্দেহ করছেন। কারণ, এই ভবনে একমাত্র বাড়িওয়ালার বাসাতেই যেত ইব্রাহিম। তাঁরা বাড়িওয়ালার বাসায় গিয়ে খোঁজ করেছেন। তখন বাড়িওয়ালার এক সন্তান মারমুখী আচরণ করেন। তাঁর ভগ্নিপতির মাথা ফাটিয়ে দেন। তাঁর ছোট ভাইকে আঘাত করেন।

‘ভাইরাল হয়নি বলে পুলিশ তৎপর নয়’

ছেলের ছবি দেখিয়ে অঝোরে কাঁদছিলেন ইব্রাহিমের মা–বাবা। তাঁরা বারবার বলছিলেন, তাঁদের কলিজার টুকরা কোথায় গেল।

বাবা জসিম আক্ষেপ করে বলেন, এই বাড়িতে তাঁরা ৮ থেকে ১০ বছর ধরে ভাড়া থাকছেন। এই বাসাতেই ইব্রাহিমের জন্ম। তাঁর পৈতৃক বাড়ি ঝালকাঠির সদর উপজেলায়। তিনি দরিদ্র। তাঁর ছেলের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি ভাইরাল হয়নি। তাই তাকে খুঁজে বের করতে পুলিশ তৎপর নয়। তিনি সব ফুটেজ পুলিশকে দিয়েছেন। কিন্তু পুলিশ তেমন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। পরে র‍্যাব–৪–এ গিয়ে অভিযোগ করেছেন তিনি। পুলিশ ও র‍্যাবের সদস্যরা বাড়িওয়ালার বাসাসহ আশপাশে তল্লাশি চালিয়েছে। কিন্তু ছেলের খোঁজ পাওয়া যায়নি।

বাড়িওয়ালার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতে তিনতলায় গিয়ে দরজায় তালা ঝুলতে দেখা যায়। চারতলার সিঁড়ির কাছে কলাপসিবল গেট। সেখানের কলিংবেল চাপ দিলে বাড়িওয়ালার এক সন্তান বেরিয়ে আসেন। তিনি প্রতিবন্ধী। তিনি জানান, বাড়িতে কেউ নেই। পরে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে বাড়িওয়ালার আরেক সন্তান ওমর শরিফ প্রথম আলোকে বলেন, তিনি ইব্রাহিমকে বাসায় ঢুকতে দেখেছিলেন। এরপর শোনেন, ইব্রাহিমকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

পরিবারের অভিযোগ–সন্দেহের বিষয়ে ওমর শরিফ বলেন, ‘ইব্রাহিম আমার সন্তানের বয়সী। ওরা প্রায়ই একসঙ্গে খেলত। ইব্রাহিম বাসায় আসত, খেত। ইব্রাহিমের কোনো ক্ষতি কেন আমরা করব? আমার নিজেরও খারাপ লাগছে। ছেলেটা বাড়িতে ঢোকার পর উধাও হয়ে গেল।’

শিশু মো. ইব্রাহিম খলিলের বাবা মো. জসিম ও মা নাসরিন আক্তার
শিশু মো. ইব্রাহিম খলিলের বাবা মো. জসিম ও মা নাসরিন আক্তারছবি: প্রথম আলো

‘বলার মতো অগ্রগতি নেই’

ইব্রাহিম নিখোঁজের জিডিটি ২ জুন মামলায় রূপান্তর হয়। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে অপহরণের অভিযোগে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলাটি হয়েছে। মামলার বাদী ইব্রাহিমের বাবা জসিম।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহা. মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, এখনো বলার মতো অগ্রগতি হয়নি। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তাঁরা তল্লাশি করেছেন। সিসিটিভির ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখছেন। বিদ্যুৎ চলে গেলে সিসিটিভি ক্যামেরায় দৃশ্য রেকর্ড হবে না। ফলে শিশুটি বাড়ি থেকে বের হয়েছিল কি না বা কেউ বের করে নিয়ে গেছে কি না, সেটা এখনো নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।

ফুটেজে একটি শিশুর কান্নার আওয়াজ প্রসঙ্গে এসআই মিজানুর রহমান বলেন, সিসিটিভি ফুটেজে কান্নার এত স্পষ্ট আওয়াজ শোনা যাবে কি না, তা যাচাই করে দেখছেন।

ছেলে নিখোঁজের তথ্য নিখোঁজ শিশু উদ্ধার বিষয়ে সর্তকবার্তা প্রচার করা প্রযুক্তিনির্ভর প্ল্যাটফর্ম ‘মুন অ্যালার্ট’–এ দিয়েছেন বাবা জসিম। মুন অ্যালার্ট–এর প্রধান সমন্বয়কারী সাদাত রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ইব্রাহিমকে খুঁজতে বিশেষ প্রশিক্ষিত কুকুর দরকার। এই কুকুর গন্ধ শুঁকে বলে দিতে পারবে, শিশুটি কোন দিকে গেছে। এ ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সহায়তা করতে পারে।