Image description

রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর প্রধান আসামি সোহেল রানাকে কেরানীগঞ্জে ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কাশিমপুর মহিলা কারাগারে ফাঁসির আসামিদের ‘কনডেম সেলে’ রাখা হয়েছে।

সোমবার (৮ জুন) রাতে বিষয়টি কালবেলাকে নিশ্চিত করে কারা অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) মো. জান্নাত-উল ফরহাদ বলেন, ‘সোহেলকে কেরানীগঞ্জে ও স্বপ্নাকে কাশিমপুর মহিলা কারাগারে ফাঁসির আসামিদের সাথে সেলে রাখা হয়েছে। ফাঁসির অন্য আসামিরা যেভাবে থাকেন, তাদেরও একইভাবে রাখা হয়েছে।’

কারাগারে অন্য কয়েদিদের মাঝে এ আসামিদের রাখলে নিরাপত্তার বিষয়ে জানতে চাইলে কারা অধিদপ্তরের এ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘কারাগার নিরাপদ জায়গা। আসামিদের নিরাপদে রাখা আমাদের দায়িত্ব। সবসময় নিরাপত্তা কর্মী থাকে। কেউ যদি অন্য কয়েদির প্রতি বিরূপ আচরণ বা মারামারি করে, তখন কারা কর্তৃপক্ষ থেকে পানিশমেন্ট সেলে নেওয়া হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘ফাঁসির আসামিদের সাধারণত একা রাখা হয় না। কারণ রায়ের পর তারা মনস্তাত্ত্বিকভাবে খারাপ থাকে। আত্মহত্যার মতো ঘটনাও ঘটাতে পারে। এজন্য সবার সঙ্গে রাখা হয়। সাধারণত ফাঁসির একটি সেলের আয়তন বিবেচনায় ২ থেকে ৫ জনকে রাখা হয়।’

গত রোববার সবচেয়ে দ্রুত সময় ৬ কার্যদিবসে দেশের আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের রায় ঘোষণা করেন ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন। রায়ে আসামিদের মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি সোহেলকে ৫ লাখ ও স্বপ্নাকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। মামলাটির রায়ের কপি প্রস্তুত করা হয়েছে। আইনানুসারে ডেথ রেফারেন্স শুনানির জন্য আজই উচ্চ আদালতে পাঠানো হবে বলে কালবেলাকে নিশ্চিত করেছেন ট্রাইব্যুনালটির বেঞ্চ সহকারী পঙ্কজ পিটার গোমেজ। গতকাল সোমবার রাত পর্যন্ত মামলার রায় ও নথি পাঠানোর জন্য প্রস্তুতির কাজ চলছিল বলেও জানান তিনি। পঙ্কজ পিটার গোমেজ বলেন, ‘মামলাটির রায় ও নথি পাঠানোর জন্য প্রস্তুতি নেওয়া শেষ হয়েছে। রায় হয়েছে ৬৬ পাতার। মঙ্গলবার (আজ) এই রায়ের কপি, মামলার সিডিসহ পুরো নথি সিলগালা করে উচ্চ আদালতের ডেথ রেফারেন্স শাখায় পাঠানো হবে। রাজারবাগ পুলিশের সদস্যরা এসে এগুলো নিরাপদে নিয়ে যাবেন।'

এদিকে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আজিজুর রহমান দুলু কালবেলাকে বলেন, ‘দ্রুতই মামলার রায় ঘোষণা হয়েছে। রায়ের নথি কখন কীভাবে যাবে ট্রাইব্যুনালের বিষয়। আশা করছি দ্রুতই উচ্চ আদালতে রায়ের ডেথ রেফারেন্স শুনানি শেষ হয়ে আসামিদের সাজা কার্যকর হবে।’

বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, নিম্ন আদালতে কোনো আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলে সেই দণ্ড কার্যকর করার আগে হাইকোর্ট বিভাগের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। এ প্রক্রিয়াকে ‘ডেথ রেফারেন্স’ বলা হয়। একই সঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা খালাস চেয়ে জেল আপিল ও ফৌজদারি আপিল দায়ের করার সুযোগ পান। উচ্চ আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রায় ও মামলার নথি ডেথ রেফারেন্স শাখা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে পাঠান। এরপর যাচাই-বাছাই শেষে তা প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়। এরপর তিনি মামলাটির শুনানির জন্য হাইকোর্টের একটি ডেথ রেফারেন্স বেঞ্চ নির্ধারণ করে দিলে আনুষ্ঠানিক শুনানি শুরু হবে।

এদিকে আগামী তিন মাসের মধ্যেই রামিসা হত্যাকাণ্ডের বিচার শেষ করা সম্ভব বলে মনে করেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। রায় ঘোষণার পর রোববার সচিবালয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, যে ফাস্ট ট্রাকে (অগ্রাধিকার ভিত্তিতে) রামিসা হত্যার বিচার হলো এটা সরকার একা করেননি। আপনাদের মাথায় রাখতে হবে যে মাননীয় প্রধান বিচারপতি যদি ১৫ জুন পর্যন্ত এই বিচারকদের যে ছুটি ছিল সেই ছুটি বাতিল না করতেন তাহলে এই ফাস্ট ট্রাক করা সরকারের পক্ষে সম্ভব হতো না।

তিন মাসে বিচার শেষ করার প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে আইনমন্ত্রী বলেন, এক সপ্তাহের মধ্যে ফাইল যদি হাইকোর্টে আসে। আমরা যদি তার পরের সপ্তাহ থেকে এটাকে পেপার বুকে দিয়ে দিতে পারি। পেপার বুক যদি ১৫ দিনের মধ্যে আমরা শেষ করতে পারি, তারপর যদি বিশেষ বিবেচনা এটা শুনানি করা হয়। শুনানি যদি দুই সপ্তাহের মধ্যে করি। তারপর আপিল বিভাগে যাবে। এটা তিন মাসের মধ্যে করা সম্ভব বলে আমি মনে করি।

তবে আইনমন্ত্রী বলেন, প্রত্যেক মামলাই তো আমরা এরকম ফাস্ট ট্রাকে দিতে পারব না। এই কারণে আমরা একটা ওয়ে আউট (পথ) বের করার চেষ্টা করছি। হাউ ফাস্ট উই ক্যান ডু দ্যাট (কত দ্রুত আমরা এটা করতে পারি)।

গত ১৯ মে ঘটনার পর মামলাটি তদন্ত করে ঘটনার মাত্র ৫ দিনের মাথায় গত ২৪ মে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান ভূঁইয়া। ওইদিনই শিশু ট্রাইব্যুনালে মামলাটি বিচারের জন্য নথি বদলি করা হয়। তবে সে দিন থেকে ঈদুল আজহার ছুটি শুরু হওয়ায় গত ১ জুন মামলাটির চার্জ গঠনের দিন ধার্য করা হয়।

ঈদের পর ১ জুন মামলার চার্জ গঠন করে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। পরদিন ২ জুন মামলাটির ১৭ সাক্ষীর মধ্যে রামিসার বাবা, মা, বোন, স্বজনসহ ১৬ জনের সাক্ষ্য শেষ হয়। এরপর ৩ জুন মামলায় আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন ও ৪ জুন মামলার যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে ৭ জুন রায়ের দিন ধার্য করেন বিচারক। বিচারিক আদালতগুলোতে অবকাশকালীন ছুটি চললেও মামলাটির বিচার দ্রুত শেষ করতে ট্রাইব্যুনালের ছুটি বাতিল করা হয়।