Image description

কোনো পুলিশ সদস্যের বাড়ি যে জেলায়, সেই জেলার মহানগর পুলিশে তাঁকে আর রাখা হবে না। কনস্টেবল থেকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার—এই ছয় স্তরের সদস্যদের ক্ষেত্রে এমন নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।

ইতিমধ্যে বিভিন্ন মহানগর পুলিশে কর্মরত এবং একই জেলায় বাড়ি—এমন সদস্যদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক সূত্র প্রথম আলোকে জানিয়েছে, দু–এক দিনের মধ্যেই এমন শতাধিক পুলিশ সদস্যকে অন্যত্র বদলি করা হতে পারে। তবে সাত-আট মাস পর অবসরে যাবেন—এমন সদস্যদের ক্ষেত্রে মানবিক বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে না।

জেলা পুলিশের বাইরে বর্তমানে আটটি মহানগরে পুলিশের নিজস্ব ইউনিট রয়েছে। মহানগরে পুলিশের কার্যক্রম জেলার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। আগে থেকেই নিজের জেলায় পুলিশের পদায়ন বন্ধ ছিল। এটি এ কারণেই করা হয়েছিল যেন স্থানীয় আত্মীয়তা, সামাজিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক যোগাযোগ বা আর্থিক স্বার্থ যেন দায়িত্ব পালনে প্রভাব না ফেলে। তবে মহানগর পুলিশের ক্ষেত্রে এই নীতি আগে একইভাবে প্রয়োগ করা হয়নি।

সর্বশেষ এমন নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আলোচনায় এসেছেন খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পরিদর্শক তৈমুর ইসলাম। তাঁর বিরুদ্ধে স্থানীয় ব্যক্তিরা হয়রানিমূলক মামলা ও গ্রেপ্তার, ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায়, প্রতিষ্ঠান দখলে সহযোগিতা এবং অপরাধী চক্রের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ করেছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ২০২১-২২ সাল থেকে নিজ জেলার মহানগর পুলিশের ইউনিটে পদায়ন না করার একটি চর্চা শুরু হয়েছিল। তখন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশে (সিএমপি) কর্মরত এবং একই জেলায় বাড়ি এমন কয়েকজন উপপরিদর্শক ও পরিদর্শক মাদক ব্যবসাসহ স্থানীয় বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন।

অপরাধী চক্রের সঙ্গে যোগসাজশ, স্থানীয় প্রভাব বিস্তার ও বদলি ঠেকানোর অভিযোগের পর নতুন করে তালিকা হচ্ছে।

এর পাশাপাশি অন্যান্য মহানগর এলাকা থেকেও কিছু পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রভাব বিস্তার, অপরাধী চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ, রাজনৈতিক বলয় তৈরি এবং বদলি ঠেকাতে তদবিরের অভিযোগ আসছিল। এমন পরিস্থিতিতে তাঁদেরও সংশ্লিষ্ট মহানগর পুলিশ থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় পুলিশ সদর দপ্তর।

২০২১-২২ সাল থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ছাড়া সারা দেশের মহানগর ইউনিটগুলোয় নতুন করে একই জেলায় বাড়ি—এমন সদস্যদের পদায়ন প্রায় বন্ধ ছিল। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র বলছে, নতুন চর্চা শুরু হওয়ার পরও বিভিন্ন তদবির ও বিশেষ পরিস্থিতিতে অল্প কিছু সদস্যকে একই জেলায় বাড়ি হওয়া সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট মহানগরের পদায়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি আগের পদায়নের সূত্রে অনেকে নিজ জেলার মহানগর পুলিশে রয়ে গেছেন। তাঁদের কেউ কেউ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছেন।

স্থানীয় আত্মীয়তা, সামাজিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক যোগাযোগ বা আর্থিক স্বার্থ যেন দায়িত্ব পালনে প্রভাব না ফেলে। তবে মহানগর পুলিশের ক্ষেত্রে এই নীতি আগে একইভাবে প্রয়োগ করা হয়নি।

নতুন করে আলোচনা, তালিকা ধরে বদলি হবে

পুলিশ সূত্র বলছে, সময়ের সঙ্গে দেখা যায়, এই শিথিলতার সুযোগে কেউ কেউ নিজ এলাকায় প্রভাবশালী হয়ে উঠছেন। বিশেষ করে ডিবি, থানা, ট্রাফিক ও অপরাধ দমনসংশ্লিষ্ট ইউনিটে দীর্ঘদিন থাকলে তাঁদের একটি অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক তৈরি হয়। এর মধ্যে থাকে রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতা, দখলদার, চাঁদাবাজ, মাদক ব্যবসায়ী, পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রক ও মামলাবাজ চক্র।

সর্বশেষ এমন নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আলোচনায় এসেছেন খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পরিদর্শক তৈমুর ইসলাম। তাঁর বিরুদ্ধে স্থানীয় ব্যক্তিরা হয়রানিমূলক মামলা ও গ্রেপ্তার, ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায়, প্রতিষ্ঠান দখলে সহযোগিতা এবং অপরাধী চক্রের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ করেছেন।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৩ নভেম্বর তৈমুর ইসলাম খুলনা মহানগর পুলিশে (কেএমপি) যোগ দেন। এরপর দুই দফায় বদলির আদেশ হলেও তিনি কেএমপি ছাড়েননি। খুলনার সঙ্গে এই পুলিশ কর্মকর্তার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। পুলিশের নথিতে তাঁর স্থায়ী ঠিকানা খুলনা সদরের খানজাহান আলী সড়কে। তিনি পড়েছেন খুলনার আজম খান সরকারি কমার্স কলেজে। চাকরিজীবনের বড় সময়ও তাঁর কেটেছে খুলনায়। স্থানীয় শিকড় ও চাকরির দীর্ঘ যোগাযোগ—সব মিলিয়ে তিনি পুলিশের ভেতর ও বাইরে আলাদা একটি বলয় তৈরি করেছেন বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। গতকাল সোমবার এ নিয়ে প্রথম আলোতে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। গতকালই তাঁকে কেএমপি থেকে রংপুর রেঞ্জে সংযুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয় বলে সূত্র জানিয়েছে।

এরপর পুলিশ সদস্যদের একই জেলার মহানগরে পদায়নের বিষয়টি নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে। এবার পুলিশ সদর দপ্তর এ বিষয়ে দ্রুততম সময়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। ইতিমধ্যে কনস্টেবল থেকে এসআই পর্যন্ত শতাধিক পুলিশ সদস্যের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এর বাইরে তালিকায় ১০ জনের মতো পুলিশ পরিদর্শকও আছেন। তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদাভাবে পর্যালোচনা করা হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যায়নি। এ ছাড়া পুলিশ সুপার (এসপি), মহানগরের ক্ষেত্রে পুলিশের কমিশনার, রেঞ্জের ক্ষেত্রে ডিআইজিদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।

পুলিশ সদর দপ্তরের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, এই সিদ্ধান্তের বিষয়টি এখন শুধু প্রশাসনিক বদলির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, দীর্ঘদিন নিজ এলাকায় থেকে কেউ কেউ স্থানীয় রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, অপরাধী চক্র ও থানা-পুলিশের ভেতরের একটি অংশের সঙ্গে আলাদা সম্পর্ক তৈরি করেন। এতে নিরপেক্ষ পুলিশিং ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যার প্রভাব পড়ে আইনশৃঙ্খলার ওপরও।

জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র সহকারী মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, মহানগর পুলিশের ক্ষেত্রে একই জেলার বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও যাঁরা রয়ে গেছেন, তাঁদের বিষয়ে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। শিগগিরই তাঁদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।