Image description

সর্বজনীন পেনশন স্কিমকে জনপ্রিয় করার চেষ্টার অংশ হিসেবে গ্রাহকদের জমানো অর্থের ৩০ শতাংশ পর্যন্ত এককালীন তোলার সুযোগ দিয়েছে সরকার। অবশ্য এতে পেনশন কিছুটা কমে যাবে। কিন্তু অবসরে যাওয়ার পর এককালীন মোটা অঙ্কের টাকা পেলে জরুরি প্রয়োজন মেটাতে সহায়ক হবে বলে আশা করছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

আবার বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য আনা প্রগতি স্কিমে আউটসোর্সিং সেবাকর্মীদের জন্য মাসে ৫০০ টাকা জমার সুযোগও রাখা হয়েছে।

রবিবার মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে পেনশন বিধিমালা সংশোধন করে এককালীন উত্তোলনের এই পরিবর্তনগুলো আনে।
এই এককালীন টাকা তোলা যাবে ৬০ বছর বয়সে পেনশন চালু হওয়ার পর।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ফেরদৌস আলম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘জাতীয় পেনশন স্কিমগুলোকে জনপ্রিয় করতে সরকার এ উদ্যোগ নিয়েছে। এককালীন ৩০ শতাংশ অর্থ তুলে নিলে গ্রাহকরা তার খরচ মেটানোর জন্য প্রয়োজনীয় একটি সুযোগ পাবে।’

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ৩০ শতাংশ টাকা তুলে নিলে অবশিষ্ট অর্থের ওপর ভিত্তি করে মাসিক পেনশন নির্ধারিত হবে। কেউ এই টাকা তুলে নিলে তার পেনশনও ৩০ শতাংশ কমে যাবে কি না, এই প্রশ্নে ফেরদৌস বলেন, ‘সেটি এখন বলা যাবে না। এই হিসাব এখনও করা হয়নি।’

এককালীন ছাড়াও এই স্কিম থেকে ঋণ নেওয়ার সুযোগ আছে। কমপক্ষে ২৪ মাস নিয়মিত টাকা জমা দিলে এবং জমার পরিমাণ এক লাখ টাকা হলে এই ঋণের আবেদন করা যাবে।

২০২৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকারে থাকার সময় চালু হওয়া চারটি স্কিমে ১৮ বছর বয়স থেকে টাকা জমানো যায়। ৬০ বছর বয়স হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসে সর্বনিম্ন এক হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত জমা করার সুযোগ রাখা হয়েছে।

এই স্কিমটি এমন যেখানে একজন যত বেশি বছর টাকা জমাবেন, তার পেনশনও তত বেশি হবে। যেমন ১৮ বছর বয়স থেকে কেউ যদি মাসে কেবল ১ হাজার টাকা জমান, তাহলে ৬০ বছর পূর্তির পর থেকে তার মাসিক পেনশন হবে ৩৪ হাজার ৪৬৫ টাকা। কিন্তু ৫০ বছর বয়সে গিয়ে কেউ ১৫ হাজার টাকা জমা করলে ১০ বছর পর থেকে তার পেনশন হবে ১৮ হাজার ৫৮৯ টাকা।

চালুর সময় আওয়ামী লীগ সরকার এই পেনশনকে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করলেও সেটি সাড়া জাগাতে ব্যর্থ হয়েছে। ‘জমানো টাকা নিরাপদ নয়’ বলে বিরোধীদের প্রচারের মোকাবিলা যেমন করা যায়নি, তেমনি এর সুবিধার পক্ষে সরকারের প্রচারেরও ঘাটতির কথাও বারবার বলছেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা।

অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ এই স্কিমকে জনপ্রিয় করতে নানা উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছিলেন। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরও নানা পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বা এডিবির কাছ থেকে ১০ কোটি ডলার ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছে সরকার। এই অর্থে পেনশন ব্যবস্থার প্রশাসনিক আধুনিকায়ন, আইটি অবকাঠামো শক্তিশালী করা এবং এই বিশাল তহবিল পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল তৈরি করা হবে।

সাত কোটি গ্রাহকের লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া সর্বজনীন পেনশন কার্যক্রমে এখন পর্যন্ত নিবন্ধনকারীর সংখ্যা চার লাখেরও কম। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই কর্মসূচি থাকবে কিনা, জমা টাকা ফেরত পাওয়াসহ নানা সন্দেহের কারণে গ্রাহকের সংখ্যা বাড়েনি।

সরকার র্দীর্ঘদিন ধরে সার্বজনীন পেনশনকে ব্যধ্যতামূলক করার চিন্তা করলেও এখনও কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি বলে জানান অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই কর্মকর্তা।

প্রকল্পে নিবন্ধিতদের সংখ্যা একই জায়গায় থমকে আছে। আর যারা এরই মধ্যে নিবন্ধন করছেন তাদেরও একটি বড় অংশ কিস্তির টাকা জমা দিচ্ছেন না।

এপ্রিলের শেষ সপ্তাহের তথ্য অনুযায়ী, সর্বজনীন পেনশন স্কিমে তিন লাখ ৭৭ হাজার ৫২৪ জন নিবন্ধিত হয়েছেন। তাদের সিংহভাগই প্রকল্প চালুর প্রথম এক বছরে তালিকাভুক্ত হন। ২০২৪ সালের ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত নিবন্ধিত ছিলেন তিন লাখ ৭২ হাজার ১৫৫ জন।

বিএনপি সরকারে আসার পরদিন অর্থাৎ গত ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্কিমে নিবন্ধনের সংখ্যা ছিল তিন লাখ ৭৩ হাজার ৩০৮ জন। এই পরিসংখ্যান বলছে, সালের ৮ আগস্ট থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে কেবল হাজারখানেক মানুষ পেনশন প্রকল্পে নাম তালিকাভুক্ত করেছে। বিএনপি সরকারে আসার পর সেই গতি কিছুটা বাড়লেও তা প্রত্যাশিত মাত্রার ধারে কাছেও নেই।

অথচ সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে চার কোটি পরিবারের অন্তত একজন সদস্যকে এই পেনশনের আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে এই পেনশনে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হবে। তখন সরকারি চাকরিজীবীদের জন্যও আলাদা পেনশন ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়া হবে।

তবে জনপ্রিয় না হওয়ায় সরকার এখনও এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এ বিষয়ে এক প্রশ্নে অর্থ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ফেরদৌস আলম বলেন, ব্যধ্যতামূলক করার বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্তে আসা যায়নি।

পেনশনের মতো একটি প্রকল্পকে কেন জনপ্রিয় করা যায়নি-এই প্রশ্নে অর্থনীতির গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির অ্যাডিশনাল রিসার্চ ডিরেক্টর তৌফিক ইসলাম খান বলেন, ‘পেনশন কর্মসূচি সরকারের একটি ভালো উদ্যোগ। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার এমন সময় এটি চালু করে যখন দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বেশ খারাপ। সে কারণে অনেকের মধ্যে সন্দেহ জাগে তারা টাকা ফেরত পাবে কি না। তবে, নতুন সরকার আসায় মানুষের আস্থা পেতে পারে। তবে সরকারকে আস্থা ফেরাতে কাজ করতে হবে।’

‘সার্বজনীন পেনশনকে জনপ্রিয় করতে হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশ্বাস বাড়াতে হবে যে তাদের টাকা হারাবে না’, বলেন তিনি।

কীভাবে এই আস্থা বাড়ানো যাবে-এমন প্রশ্নে তৌফিকুল বলেন, ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় পেনশন তহবিল তো নরওয়েতে। সেখানে ফান্ড ম্যানেজাররা লাভজনক বিনিয়োগ করে। জনগণও তাদের আস্থায় রাখে। আমাদের এখানেও ম্যানেজমেন্টে প্রফেশনালদের আনতে হবে।’