বাংলাদেশে প্রতিবছরই বাড়ছে ক্যান্সারে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিভিন্ন গবেষণা বলছে, দেশে এখন ক্যান্সার একটি বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। প্রাপ্তবয়স্কদের পাশাপাশি শিশুরাও এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পরিবেশ দূষণ, তামাক ব্যবহার, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাপনের পরিবর্তনের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে এক লাখ ১৬ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। একই সময়ে নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছেন এক লাখ ৬৭ হাজারেরও বেশি। চিকিৎসকদের ধারণা, অনেক রোগী চিকিৎসা ব্যবস্থার বাইরে থাকায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
ডব্লিউএইচওর হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ক্যান্সারে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় তিন লাখ ৪৬ হাজার। ২০১৮ সালের তুলনায় এ সংখ্যা প্রায় ১১ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর হারও বেড়েছে প্রায় আট শতাংশ।
জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের তথ্যমতে , ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটিতে চিকিৎসা নিয়েছেন প্রায় ৪২ হাজার ৫০০ ক্যান্সার রোগী। তাদের মধ্যে ৩১ হাজার ছিলেন নতুন রোগী।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ৩৮ ধরনের ক্যান্সার শনাক্ত হচ্ছে। গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়, মোট ক্যান্সার রোগীর প্রায় ২ দশমিক ৪ শতাংশই শিশু। পুরুষদের মধ্যে ফুসফুস, খাদ্যনালি, মুখ ও ঠোঁটের ক্যান্সারের প্রকোপ বেশি, আর নারীদের মধ্যে বেশি দেখা যাচ্ছে স্তন, জরায়ুমুখ ও ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার।
খাদ্যনালির ক্যান্সারে আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি
বাংলাদেশে ক্যান্সারের বিভিন্ন ধরনের মধ্যে খাদ্যনালির ক্যান্সার সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। প্রতিবছর নতুন করে ২৫ হাজারেরও বেশি মানুষ খাদ্যনালির ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন, যা দেশের মোট নতুন ক্যান্সার রোগীর প্রায় ১৫ দশমিক ১ শতাংশ। এ রোগে নারীদের তুলনায় পুরুষদের আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি।শুধু আক্রান্তের সংখ্যাই নয়, মৃত্যুর হারেও খাদ্যনালির ক্যান্সার উদ্বেগজনক অবস্থানে রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০২২ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে এ ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৪২ হাজারের বেশি।
ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর ক্যান্সারজনিত যে এক লাখ ১৬ হাজারের বেশি মৃত্যু ঘটে, তার মধ্যে ২৪ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয় খাদ্যনালির ক্যান্সারের কারণে। মোট ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর প্রায় ২০ দশমিক ৯ শতাংশই এ রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত।
মুখ ও ঠোঁটের ক্যান্সারেও উদ্বেগ
বাংলাদেশে আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় সর্বাধিক দেখা যায় মুখ ও ঠোঁটের ক্যান্সার। প্রতিবছর নতুন করে ১৬ হাজারেরও বেশি মানুষ মুখ ও ঠোঁটের ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন। নতুন আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ১১ হাজার পুরুষ এবং প্রায় পাঁচ হাজার নারী। মৃত্যুর হারও কম নয়। প্রতিবছর প্রায় সাড়ে নয় হাজার মানুষ এ রোগে প্রাণ হারান, যা ক্যান্সারজনিত মোট মৃত্যুর প্রায় ৮ দশমিক ১ শতাংশ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে এ ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৪০ হাজারের বেশি।
এদিকে, ২০২৬ সালে প্রকাশিত জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটিতে চিকিৎসা নিতে আসা ক্যান্সার রোগীদের মধ্যে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশই ছিলেন মুখ ও ঠোঁটের ক্যান্সারে আক্রান্ত।ৎ
ফুসফুসের ক্যান্সারে মৃত্যুঝুঁকি বেশি
ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর দিক থেকে খাদ্যনালির ক্যান্সারের পরেই অবস্থান করছে ফুসফুসের ক্যান্সার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর ১২ হাজারের বেশি মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
সংস্থাটির হিসাব বলছে, বর্তমানে দেশে ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ১৭ হাজার। প্রতি বছর নতুন করে আরও প্রায় ১৩ হাজার মানুষ এ ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন। নতুন আক্রান্তদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশই পুরুষ, যার সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার।
জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে তাদের কাছে চিকিৎসা নিতে আসা মোট ক্যান্সার রোগীর ১৮ শতাংশই ছিলেন ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত। হাসপাতালের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংখ্যার হিসেবে এ রোগীর সংখ্যা সাড়ে পাঁচ হাজারেরও বেশি।
স্তন ক্যান্সারে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন নারীরা
বাংলাদেশে নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় স্তন ক্যান্সার। বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্যান্সারে আক্রান্ত নারীদের মধ্যে ৩৬ দশমিক ৪ শতাংশই স্তন ক্যান্সারে ভুগছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ৩৫ হাজারের বেশি নারী এ ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত। প্রতি বছর নতুন করে প্রায় ১৩ হাজার নারী স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন।
শুধু আক্রান্তের সংখ্যাই নয়, মৃত্যুর হারও উদ্বেগজনক। প্রতিবছর এ রোগে ছয় হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
এদিকে, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, নারী ক্যান্সার রোগীদের প্রায় ১৯ শতাংশ প্রজননতন্ত্র-সংশ্লিষ্ট ক্যান্সারে আক্রান্ত। বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত স্ক্রিনিং কার্যক্রম জোরদার করা গেলে এ ধরনের ক্যান্সার শনাক্ত ও চিকিৎসা সহজ হবে।
জরায়ুমুখের ক্যান্সারে বড় ঝুঁকিতে নারীরা
বাংলাদেশে নারীদের মধ্যে স্তন ক্যান্সারের পর মৃত্যুহারের দিক থেকে অন্যতম বড় কারণ হলো জরায়ুমুখের ক্যান্সার। বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারী ক্যান্সার রোগীদের মধ্যে প্রায় ১৯ শতাংশ প্রজননতন্ত্র-সম্পর্কিত ক্যান্সারে আক্রান্ত। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি, অর্থাৎ ১১ শতাংশ নারী জরায়ুমুখের ক্যান্সারে ভুগছেন। পাশাপাশি প্রায় ৫ শতাংশ ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার এবং ৩ শতাংশ জরায়ু ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে সাড়ে ২৬ হাজারের বেশি নারী জরায়ুমুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত। প্রতি বছর নতুন করে প্রায় সাড়ে নয় হাজার নারী এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
একই সময়ে এ রোগে মৃত্যুও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। প্রতিবছর ৫ হাজার ৮০০-এরও বেশি নারী জরায়ুমুখের ক্যান্সারের কারণে প্রাণ হারান।
বাংলাদেশে ক্যান্সার বৃদ্ধির নেপথ্যে যেসব কারণ
বাংলাদেশে ক্যান্সার নিয়ে এখনো জাতীয় পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ কোনো তথ্যভাণ্ডার বা রেজিস্ট্রি গড়ে ওঠেনি। বর্তমানে যেসব তথ্য পাওয়া যায়, তার বেশিরভাগই বিভিন্ন হাসপাতাল ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল।
চিকিৎসকদের মতে, ক্যান্সারে আক্রান্ত অনেক মানুষই চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে আসেন না। ফলে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি বা আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যানের তুলনায় আরও বেশি হতে পারে।
জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোস্তফা আজিজ সুমন বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘অনেক রোগীই চিকিৎসা ব্যবস্থার বাইরে থাকেন, তাই বাস্তবে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বড় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বায়ুদূষণের সঙ্গে ফুসফুসের ক্যান্সারের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের দেশের বাতাস যেভাবে দূষিত, তাতে সুস্থ থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশ্বে সাধারণত স্তন ক্যান্সার বেশি দেখা যায় বয়স্ক নারীদের মধ্যে। কিন্তু আমাদের দেশে ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সী নারীদের মধ্যেই এই রোগ বেশি ধরা পড়ছে।’
টিকাদানের বিষয়ে ডা. সুমন বলেন, ‘টিকাদান কার্যক্রম শুরু হলেও এখনো কাভারেজ কম। এটি বাড়ানোর পাশাপাশি সচেতনতা বাড়ানো গেলে ক্যান্সারে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার উভয়ই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে ক্যান্সার আক্রান্তের সংখ্যা বছর বছর বাড়ছে। এর পেছনে পরিবেশ দূষণকে অন্যতম বড় কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যানবাহনের কালো ধোঁয়া, শিল্পকারখানার নির্গমন এবং পরিবেশগত দূষণ ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে নারীরা তুলনামূলক কম বয়সেই স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন।
এ ছাড়া খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে জানান চিকিৎসকরা। তাদের মতে, ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ, ধূমপান এবং তামাকজাত পণ্য ব্যবহার ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। তবে সচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং টিকাদান কর্মসূচি সম্প্রসারণের মাধ্যমে স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যান্সারের ঝুঁকি কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা।