Image description

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে বেশ কয়েকবার ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। সর্বশেষ রোববার (৭ জুন) রাতে প্রতিবেশী দেশ ভুটানে উৎপন্ন ৫.৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে ঢাকা, সিলেট, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল। এমন প্রতিটি ভূকম্পনের পরই দেশজুড়ে মানুষের মাঝে আতঙ্ক তৈরি হয়।

বাংলাদেশে যেকোনো সময় ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে এমন কথাও বলেন অনেক বিশেষজ্ঞ। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন, দেশে বড় মাত্রার ভূমিকম্পের আশঙ্কার সঙ্গে গত রাতের মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান এমন এক জায়গায়, যার আশেপাশেই রয়েছে হিমালয় পর্বতমালা। সেখানে নিয়মিতই বিভিন্ন মাত্রার ভূমিকম্প হয়, যার কম্পন আমরা বাংলাদেশে বসে অনুভব করি। তবে এগুলোর উৎপত্তিস্থল আমাদের দেশের ভেতরে নয়।

ভূমিকম্পের সুনির্দিষ্ট কোনো পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়। ভূতত্ত্ববিদ বা গবেষকরা বিভিন্ন লক্ষণ ও ফল্ট লাইন বিশ্লেষণ করে কেবল সম্ভাবনার কথা বলেন। কেউ বলেন ৭ মাত্রা, কেউ সাড়ে ৭, আবার কারও মতে তা মাত্রাও হতে পারে। এগুলো সবই মতবাদ ও বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনা। এটিকে নির্দিষ্ট কোনো দিন-ক্ষণ বা মাত্রায় বেঁধে ফেলার সুযোগ নেই। ভুটান বা আমাদের চারপাশের অন্যান্য এলাকায় হওয়া সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলোর সাথে এই বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

তবে দেশের ভেতরে যে কোনো ঝুঁকি নেই, তা নয়। কিছুদিন আগে দেশের ভেতরেও বেশ কয়েকবার ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে, যার উৎপত্তিস্থল ছিল মধুপুর ফল্টে। অনেক আগে মানিকগঞ্জ ও আসাম সংলগ্ন এলাকায় বড় ভূমিকম্পের ইতিহাস রয়েছে। আমাদের দেশের জন্য সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম 'ডাউকি ফল্ট'। ভারতের সিলেট সীমান্ত থেকে শুরু করে দেশের দক্ষিণের দিকে বিস্তৃত এই ফল্ট লাইনে বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা সব সময়ই থাকে। যদিও সাম্প্রতিককালে এই ডাউকি ফল্ট বরাবর দেশের ভেতরে বড় কোনো ভূমিকম্পের রেকর্ড নেই, তবে ভূতাত্ত্বিক এই ঝুঁকিকে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই।

ভূমিকম্প নিয়ে আমাদের সবচেয়ে বড় আশঙ্কার জায়গা হলো অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা। কম্প্রিহেনসিভ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম (সিডিএমপি) ও জাইকার এক যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছিল ভয়াবহ এক তথ্য— ঢাকায় যদি ৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়, তবে প্রায় ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে। এই পরিসংখ্যান থেকেই আমাদের অবকাঠামো খাতের নাজুক অবস্থার একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।

বড় মেগা স্ট্রাকচারগুলো নির্মাণের সময় সর্বোচ্চ মাত্রার ভূমিকম্পের বিষয়টি মাথায় রেখে নকশা করা হলেও, ব্যক্তিগত বা আবাসিক ভবনগুলোর ক্ষেত্রে এই নিয়ম মানা হয় না বললেই চলে। ভূমিকম্প সহনশীল নকশা করতে গেলে নির্মাণ ব্যয় বেড়ে যায়, এই অজুহাতে অনেকেই বিষয়টি এড়িয়ে যান। এছাড়া পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যাও রাজধানীতে অগণিত।

ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকায় ভূমিকম্পের চেয়েও বড় বিপদ হলো রাস্তাঘাটের সংকীর্ণতা এবং খোলা জায়গার অভাব। ভবন ধসে পড়লে মানুষকে উদ্ধার করার জন্য উদ্ধারকর্মীরা কীভাবে প্রবেশ করবেন বা মানুষ কোথায় গিয়ে খোলা জায়গায় আশ্রয় নেবে, তার কোনো সঠিক কন্টিনজেন্সি প্ল্যান বা জরুরি পরিকল্পনা আমাদের নেই।

এর পাশাপাশি রয়েছে 'লিকুইফ্যাকশন' বা মাটির তরলীকরণের ঝুঁকি। ঢাকার লালমাটির এলাকাগুলো (যেমন- মধুপুর ট্র্যাক্ট) লিকুইফ্যাকশনের ঝুঁকি থেকে কিছুটা মুক্ত হলেও, বর্তমানে ঢাকার চারপাশে জলাভূমি ও নিচু এলাকা ভরাট করে যেভাবে যত্রতত্র বহুতল ভবন গড়ে উঠছে, তা চরম ঝুঁকিপূর্ণ। এই ভরাট করা মাটিতে হওয়া ভবনগুলোর নকশা যদি ভূমিকম্প সহনশীল না হয়, তবে মাঝারি মাত্রার কম্পনেই সেগুলো মাটির নিচে দেবে যাওয়ার বা হেলে পড়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।

ভূমিকম্প যেহেতু ঠেকানো সম্ভব নয় এবং এর কোনো পূর্বাভাসও দেওয়া যায় না, তাই আমাদের একমাত্র হাতিয়ার হলো 'পূর্বপ্রস্তুতি'। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই জায়গাতেই আমাদের সবচেয়ে বড় ঘাটতি।

ভূমিকম্প অনুভূত হলেই আমাদের দেশের মানুষ হুড়োহুড়ি করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার চেষ্টা করেন, যা মারাত্মক ভুল। অনেক সময় দেখা যায়, মানুষ আতঙ্কে বহুতল ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে আহত বা নিহত হচ্ছেন। মূলত ভূমিকম্পের কারণে যত না ক্ষতি হয়, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হয় মানুষের প্যানিক বা আতঙ্কের কারণে। ভূমিকম্পের সময় নিয়ম হলো— আপনি যেখানে আছেন, সেখানেই কোনো শক্ত আসবাবপত্রের নিচে বা পাশে নিজেকে আড়াল করা। কম্পন থেমে গেলে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তবেই নিরাপদে খোলা জায়গায় বেরিয়ে আসা উচিত।

এই মুহূর্তে জাতীয় ও ব্যক্তিগত— উভয় পর্যায়ে ব্যাপক প্রস্তুতি ও সচেতনতা প্রয়োজন।

প্রথমত, ব্যক্তিগত ও সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় থেকে শুরু করে স্কাউট ও স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে নিয়মিত 'ভূমিকম্প মহড়া' বা ড্রিল করতে হবে। ভূমিকম্পের সময় কী করতে হবে এবং কী করা যাবে না— তা মানুষের মগজে গেঁথে দিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, অবকাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোকে চিহ্নিত করে 'রেট্রোফিটিং' (পুরাতন ভবনকে প্রকৌশলগতভাবে শক্তিশালী করা) করতে হবে। আর যে ভবনগুলো রেট্রোফিটিং করার অযোগ্য, সেগুলোকে ভেঙে ফেলার মতো সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

তৃতীয়ত, জাতীয় পর্যায়ে উদ্ধারকাজের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সেনাবাহিনী, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের যে জরুরি পরিকল্পনাগুলো আছে, সেগুলোর সাথে সাধারণ কমিউনিটিকে যুক্ত করতে হবে। কারণ দুর্যোগের মুহূর্তে সবার আগে এগিয়ে আসে স্থানীয় মানুষ।

ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগকে আমরা হয়তো আটকাতে পারবো না, কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা, দৃঢ় অবকাঠামো এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আমরা এর ক্ষয়ক্ষতিকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে পারি। গুজব আর আতঙ্কের পেছনে না ছুটে, এখন সময় এসেছে বাস্তবমুখী পূর্বপ্রস্তুতি নেওয়ার।

ড. কাজী মতিন উদ্দীন আহমেদ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক