Image description
২৪ ঘণ্টায় আরও ১৬ শিশুর মৃত্যু

দেশে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না। প্রতিদিনই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এরই মধ্যে রোগটিতে ৫২২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ঈদুল আজহার কারণে ঢাকাসহ সারা দেশের কোটি মানুষ ঈদযাত্রা শুরু করেছে। ঈদযাত্রা হামের সংক্রমণ আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে—এমন আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, দেশে হাম নিয়ন্ত্রণে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালিত হলেও এখনো হার্ড ইমিউনিটি গড়ে ওঠেনি। এ ছাড়া যারা এর আগে টিকা পেয়েছে, তাদের ক্ষেত্রেও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ৫০ শতাংশের মতো। ফলে যে ৫০ শতাংশ রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার বাইরে থেকে গেছে, তারাও হামে আক্রান্ত হচ্ছে।

এ ছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের আয়রন, ফলিক অ্যাসিড প্রদান না করা এবং পরপর দুই বছর ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন না করায় শিশুরা অপুষ্টিজনিত দুর্বলতায় ভুগছে, যা সামগ্রিকভাবে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।

এক চিকিৎসা গবেষক বলেন, হামের টিকার ইমিউন রেসপন্স ৫০ শতাংশের মতো। তিনি বলেন, আমরা চিকিৎসকদের কয়েকজন সন্তানের ইমিউনিটি পরীক্ষা করে এ তথ্য পেয়েছি। যদিও এটা কোনো গবেষণা নয়। কিন্তু যাদের পরীক্ষা করা হয়েছে, তাদের বয়স পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যে এবং তারা সবাই নির্দিষ্ট (৯ মাস থেকে ১৫ মাস) বয়সে টিকা পেয়েছে। পরীক্ষা করে দেখা গেছে টিকাপ্রাপ্তদের ৫০ শতাংশের মধ্যে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠেনি। তিনি বলেন, একটি গবেষণার মাধ্যমে এটা দেখা যেতে পারে, যদি গবেষণায় এমন তথ্য উঠে আসে, তাহলে হার্ড ইমিউনিটি তৈরির ক্ষেত্রে বুস্টার ডোজ প্রয়োগ করতে হবে।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিনের ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান (সহকারী অধ্যাপক) ডা. আরিফা আকরাম বলেন, দেশে হামের হার্ড ইমিউনিটি এখনো তৈরি হয়নি। তাই আক্রান্ত ও মৃত্যু কমছে না। এ অবস্থায় নিয়ন্ত্রণে আসতে অনেক সময় প্রয়োজন। তা ছাড়া ঈদের ছুটিতে অসংখ্য মানুষ ঢাকা ছাড়বে এবং এক থেকে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ঢাকায় ফিরবে। ফলে ঈদের পরে হামের সংক্রমণ আরও বাড়বে। এজন্য মৃত্যু ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ সুদীর্ঘ হতে পারে।

এদিকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনও হাম সংক্রমণ এড়াতে ঈদের সময় শিশুদের নিয়ে সতর্কভাবে চলাচলের পরামর্শ দিয়েছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বাস ও ট্রেনযাত্রা এবং আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমরা আপনাদের অনুরোধ করছি, ঈদের সময় শিশুদের যেন সব জায়গায় নিয়ে না যাওয়া হয়। বিশেষ করে যেসব শিশুর হামে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে, তাদের আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বা অতিরিক্ত ভিড় রয়েছে—এমন জায়গায় না নেওয়াই ভালো। তিনি বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের কাছ থেকে সুস্থ শিশুদের দূরে রাখতে হবে। একইভাবে আক্রান্ত রোগীদেরও অন্যদের সঙ্গে মিশতে দেওয়া উচিত না। এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে।

হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় গত ২০ এপ্রিল সোমবার দেশজুড়ে শুরু হয় জরুরি টিকাদান কর্মসূচি। কর্মসূচির আওতায় ছয় থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করে সরকার। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশের ১৮ জেলার ৩০ উপজেলা ও চারটি সিটি করপোরেশনসহ সব এলাকা মিলিয়ে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে এ কার্যক্রমের আওতায় টিকা দেওয়া শুরু হয়। জরুরি টিকাদান কর্মসূচি সিটি করপোরেশন এলাকায় চলে ২০ মে পর্যন্ত এবং অন্যান্য জায়গায় চলে ১২ মে পর্যন্ত। এর আগে ৫ এপ্রিল দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলায় হাম-রুবেলার টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। দ্বিতীয় দফায় ১২ এপ্রিল ঢাকা উত্তর-দক্ষিণসহ গুরুত্বপূর্ণ চারটি সিটি করপোরেশনে (ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ, বরিশাল ও ময়মনসিংহ) একযোগে এ কার্যক্রম শুরু করে সরকার।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেহেতু সারা দেশে একসঙ্গে টিকাদান কার্যক্রম শুরু করা হয়নি, তাই সারা দেশে একই সময়ে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হবে—এমনটা আশা করা যায়। কেননা টিকা গ্রহণের পর শিশুর শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে প্রায় এক মাস সময় লাগে। টিকাদান কার্যক্রম শুরু চলে প্রায় দেড় মাস ধরে। তাই সারা দেশে হার্ড ইমিউনিটি গড়ে উঠতেও এমন সময় প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ যারা বা যেসব এলাকায় ২০ মে টিকা পেয়েছে, সেখানে ইমিউন রেসপন্স পেতে ২০ জুন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, অবাধ ঈদযাত্রা হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে যাদের ছোট শিশু রয়েছে, তাদের ঈদযাত্রা পরিহার করাই উত্তম। কারণ ঢাকা থেকে যেখানে যাবেন, সেখানে গিয়ে শিশু যদি হামে আক্রান্ত হয়, তাহলে উপযুক্ত চিকিৎসা পাওয়া কঠিন হতে পারে। এমনকি প্রয়োজনীয় সময়ে যথপোযুক্ত চিকিৎসা নাও পাওয়া যেতে পারে। অধ্যাপক বে-নজির বলেন, হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু এখনো কমছে না, এটা দুশ্চিন্তার বিষয়। কারণ টিকাদানের চার সপ্তাহের মধ্যে শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠার কথা। এভাবেই দেশে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হবে। যেহেতু সংক্রমণ ও মৃত্যু করছে না, এটা ইঙ্গিত করে যে, টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা ৯৫ শতাংশ অর্জিত হয়নি।

হামের উপসর্গে ১৬ শিশুর মৃত্যু: দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ১৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে নতুন করে ১২৮ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। গতকাল রোববার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র থেকে পাঠানো হাম সংক্রান্ত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সারা দেশে ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম আক্রান্ত হয়ে ৮৬ জনের হয়েছে। এ ছাড়া সন্দেহজনক হাম রোগের লক্ষণ নিয়ে ৪৪২ জন মৃত্যু বরণ করেছে। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত রোগটিতে ৫২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হামের লক্ষণ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ১৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছে ঢাকায়, এবং ৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে রাজশাহী বিভাগে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১২৮ জন হাম আক্রান্ত হয়েছেন; এ সময়ে ১ হাজার ৩০৬ জন হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন; যাদের মধ্যে ১ হাজার ১৬৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ ছাড়া এ সময়ের মধ্যে হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি ৪৪৭ জন ভর্তি হয়েছেন ঢাকার হাসপাতালগুলোতে। আর সবচেয়ে কম ১০ জন ভর্তি হয়েছেন রংপুরে। এ নিয়ে দেশে মোট সন্দেহজনক রোগীয় সংখ্যা ৬৩ হাজার ৮১৩ এবং নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ৮ হাজার ৬২২ জন।