রাজধানীর মোহাম্মদপুরের রামচন্দ্রপুর খালে একসময় ১২ মাসই নৌকা-ট্রলার চলত। প্রশস্ত খালটি এখন দখল-দূষণে প্রায় ভরাট হয়ে গেছে। বছিলার লাউতলা খাল থেকে শুরু হয়ে মোহাম্মদিয়া হাউজিং হয়ে শেখেরটেকের পেছন দিয়ে প্রবাহিত হয়ে তুরাগ নদে গিয়ে পড়েছে রামচন্দ্রপুর খাল। ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে বা সিএস খতিয়ান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, খালটির প্রায় অর্ধেকই এখন দখলদারের কবলে। নথিপত্র ঘেঁটে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সিএস ম্যাপ অনুযায়ী খালটির মোট দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৬৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৪২ দশমিক ৪৪ শতাংশ এলাকা ২০২২ সালের মধ্যেই দখল হয়ে যায়, যার পরিমাণ ৫ দশমিক ৯৫১ হেক্টর। খালপাড়ে গড়ে তোলা স্থাপনা খালটিকে আরও সংকুচিত করে ফেলেছে।
স্থানীয়রা জানান, সিএস ম্যাপ অনুযায়ী দৈর্ঘ্যের হিসাবে খালটির প্রায় অর্ধেক হারিয়ে গেছে বা বেদখল হয়ে পড়েছে। মোহাম্মদিয়া হাউজিং, মোহাম্মদিয়া সোসাইটি লিমিটেড, বছিলা হাউজিংয়ের পাশ দিয়ে খালটি ১০০ ফুটের বেশি প্রশস্ত ছিল। মোহাম্মদিয়া হাউজিং ও সোসাইটির মধ্য দিয়ে যে রাস্তাটি বেড়িবাঁধ পর্যন্ত গেছে, এ রাস্তার কিছু অংশ খালের ওপর করা। আগে এ রাস্তা ছিল না। খালটি দখল করে সরকারি ও ব্যক্তি মালিকানাধীন বাসাবাড়ি, খেলার মাঠ, অফিস, বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করা হয়েছে। দখলের ৫৬ শতাংশই ব্যক্তি মালিকানাধীন বাসাবাড়ি ও স্থাপনা। ৩৬ শতাংশ সরকারি ও বেসরকারি রাস্তা। ২ শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে কৃষিকাজের জন্য। ৩ শতাংশ খোলা জায়গা এবং আরও ৩ শতাংশ জলাভূমি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। রামচন্দ্রপুর খালের দখলদারদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তালিকা এখনো তৈরি করেননি সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
রাজধানীজুড়ে এক সময় ছিল বিস্তীর্ণ খাল, নালা ও জলাভূমি। শহরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হওয়া এসব খালই ছিল বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের প্রধান পথ এবং নগরীর প্রাকৃতিক জলাধার। কিন্তু কয়েক দশকের অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ, অবৈধ দখল ও ভরাটের কারণে সেই খালের বড় অংশ এখন অস্তিত্ব সংকটে। গবেষণা বলছে, একসময় ঢাকায় ৩৪৪ কিলোমিটার খাল থাকলেও এখন তার মধ্যে ১২৪ কিলোমিটারই হারিয়ে গেছে, যা শতাংশের হিসাবে প্রায় ৬৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ। খালের জায়গায় কোথাও গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন, কোথাও বাজার বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আবার কোথাও সরকারি স্থাপনাও দাঁড়িয়ে গেছে। ফলে রাজধানীর প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং সামান্য থেকে মাঝারি বৃষ্টিতেই শহরের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে।
নগরীর ২৬টি খাল আগে ছিল ঢাকা ওয়াসার অধীনে। যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে খালগুলোর জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে পুনরুদ্ধার করতে পাঁচ বছর আগে দায়িত্ব নেয় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। তবে এখনো একটি খালও উদ্ধার করতে পারেনি সংস্থা দুটি। ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনের অংশ হিসেবে ঢাকা ওয়াসা ২৬টি খাল (প্রায় ৮০ কিলোমিটার) এবং প্রায় ৩৮৫ কিলোমিটার বড় আকারের নালা ও চারটি পাম্প স্টেশন পরিচালনা করত। দুই সিটি করপোরেশন দেখভাল করে প্রায় ২ হাজার ২১১ কিলোমিটার নালা। ২০২০ সালে ওয়াসার অধীনে থাকা সব নালা ও খাল দুই সিটি করপোরেশনের হাতে যায়। এরপর দ্রুত খালের সীমানা চিহ্নিত করার ঘোষণা দেন তৎকালীন মেয়ররা। এ ছাড়া খালের দুই পাড়ের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, পুনঃখনন করে পানি ধারণের ক্ষমতা বৃদ্ধি, পাড় বাঁধাই করে সবুজায়ন, ওয়াকওয়ে (হাঁটার পথ) ও সাইকেল লেন তৈরি করার কথা বলেন তারা। যদিও এর কোনোটিই হয়নি।
দুই সিটি করপোরেশনের নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, আনুষ্ঠানিকভাবে ওয়াসা ২৬টি খাল হস্তান্তরের পর আরও বেশ কয়েকটি দুই সিটিকে বুঝিয়ে দেয় ওয়াসা। এর মধ্যে ডিএসসিসির তালিকাভুক্ত খালগুলো হলো জিরানী, বাসাবো, কদমতলা, খিলগাঁও বাগিচা, মান্ডা, কাজলাপাড়, শ্যামপুর, তিতাস, উত্তর কুতুবখালী, মৃধাবাড়ী, মাতুয়াইল, ডিএনডি এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক খাল। ডিএনসিসির তালিকাভুক্ত খালগুলো হলো কাটাসুর, রামচন্দ্রপুর, কল্যাণপুর, রূপনগর, মিরপুর দিয়াবাড়ি, ইব্রাহিমপুর, বাউনিয়া, বাইশটেকী, সাংবাদিক কলোনি, আবদুল্লাহপুর, দ্বিগুণ, বেগুনবাড়ী, শাহজাদপুর, সুতিভোলা, কসাইবাড়ী, মহাখালী, ডুমনি, উত্তরা দিয়াবাড়ী, বোয়ালিয়া, গোবিন্দপুর ও নরাইল খাল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার খালগুলো শুধু হাতবদল হয়েছে। প্রকৃত অর্থে কোনো কাজই হয়নি। মালিকানা পাওয়ার পর প্রথম কাজ ছিল সীমানা নির্ধারণ করে পুনরুদ্ধার করা। দুই সিটি করপোরেশন পরিপূর্ণভাবে একটি খালও পুনরুদ্ধার করতে পারেনি। ওয়াসার কাছ থেকে সিটি করপোরেশন খাল, নর্দমা আর বক্স-কালভার্ট বুঝে নেওয়ার পর খাল পরিষ্কার ও বিশেষ অভিযানের নামে খরচ হয়েছে হাজার কোটি টাকা।
এমন পরিস্থিতিতে খাল পুনরুদ্ধার ও খননের উদ্যোগকে নতুন করে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। ঢাকার জিয়া সরণি ও শ্যামপুর খাল উন্নয়নে দুটি মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে জিয়া সরণি খাল উন্নয়নে ৩০০ কোটি টাকা ও শ্যামপুর খাল উন্নয়নে ৯০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সিএস পর্চা ও ম্যাপ অনুযায়ী জিয়া সরণি খালের জায়গা দখলমুক্ত করা হবে। অবৈধ দখলদারদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে এবং বিদ্যমান আইনে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। জুলাই মাস থেকে স্থায়ী গাইডওয়াল নির্মাণ, সৌন্দর্যবর্ধন এবং দুই পাশে ওয়াকওয়ে নির্মাণের কাজ শুরু হবে।
দক্ষিণ সিটিতে ২৫ খাল: ঢাকা দক্ষিণ সিটির হিসাব অনুযায়ী তাদের সীমানায় খাল আছে ২৫টি। খালগুলো হলো কালুনগর খাল, জিরানী খাল, মান্ডা খাল, শ্যামপুর খাল, কাজলা খাল, মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল্ডের পশ্চিমাংশের খাল, দক্ষিণ কুতুবখালী খাল, উত্তর কুতুবখালী খাল, বর্ণমালা খাল, ডগাইর খাল, সুকর্শি খাল, গলাকাটা ব্রিজ স্টাফ কোয়ার্টার খাল, পাড়া ডগাইর খাল, কোনাপাড়া খাল, তিতাস খাল, মাতুয়াইল কবরস্থান সংলগ্ন খাল, খিলগাঁও-বাসাবো খাল, মৃধাবাড়ি খাল, জিয়া সরণি খাল, নাগদারপাড় খাল ও নড়াই খাল। এ ছাড়া চারটি খাল এখন বক্স কালভার্টে রূপ নিয়েছে। সেগুলো হলো ধোলাইখাল বক্স কালভার্ট, সেগুনবাগিচা বক্স কালভার্ট, পান্থপথ বক্স কালভার্ট ও পরীবাগ বক্স কালভার্ট।
উত্তর সিটিতে ৩২ খাল: ঢাকা উত্তর সিটি বলছে, তাদের এলাকায় খালের সংখ্যা ৩২টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খাল মিরপুরে—১৪টি। এই খালগুলো হলো রূপনগর, বাউনিয়া, দ্বিগুণ, বাইশটেকী, সাংবাদিক কলোনি, মুসলিম বাজার, প্যারিস, ইব্রাহিমপুর, কল্যাণপুর মূল খাল এবং ক, খ (গোদাগাড়ী), ঘ (বগার-মা), ঙ ও চ খাল। বাকি খালগুলোর মধ্যে রয়েছে মোহাম্মদপুরের রামচন্দ্রপুর, কাটাসুর, লাউতলা উত্তর ও লাউতলা দক্ষিণ খাল। উত্তরা এলাকায় রয়েছে আবদুল্লাহপুর খাল (খিদির খাল), দিয়াবাড়ি ও কসাইবাড়ি খাল।
এ ছাড়া বাড্ডায় শাহজাদপুর খাল, সুতিভোলা-১ (আফতাবনগর-বসুন্ধরা ১০০ ফুট) ও ২ (সাঁতারকুল-রামপুরা) খাল। তেজগাঁও-মহাখালী এলাকায় বেগুনবাড়ি ও মহাখালী খাল রয়েছে। আর উত্তর সিটিতে ২০১৭ সালে নতুন যুক্ত হওয়া ওয়ার্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে ডুমনি-পঞ্চাতি, বোয়ালিয়া, গোবিন্দপুর, নরাই, মেরুলখোলা ও হোতাপাড়া খাল।
ডিএনসিসির আওতাধীন এলাকার খালগুলোর মধ্যে মিরপুর এলাকায় যেসব খাল রয়েছে সেগুলোয় দখল বেশি। এ ছাড়া মহাখালীতে কিছু খাল রয়েছে যেগুলো বেদখল হয়ে গেছে। মিরপুর রূপনগর খাল পুরোটাই বেদখলে। এ ছাড়া কল্যাণপুর, ক, খ, গ, ঘ, ঙ পাঁচটি খালই কম-বেশি অবৈধ দখলে।
সরেজমিন দেখা যায়, মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ-সংলগ্ন কল্যাণপুর খালের দুই ধারে অনেক বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে। মেয়র আতিকুল ইসলাম একবার উদ্ধারে গিয়ে শেষ পর্যন্ত সরে যান। কল্যাণপুরে জলাধার ভরাট করে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন তাদের গবেষণা কেন্দ্র নির্মাণ করেছে। এ নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর ও রাজউক একাধিকার নোটিশ দিয়েও বন্ধ করতে পারেনি। মোহাম্মদপুর এলাকার রামচন্দ্রপুর মৌজার রামচন্দ্রপুর খালের একাংশ দখল করে ইউল্যাব ইউনির্ভাসিটি করা হয়েছে। এ ছাড়া মিরপুর ভাসানটেক এলাকার একটা খাল পুরোপুরি দখল করে টিনশেড ঘর নির্মাণ করে ভাড়া দিচ্ছেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা। যখন যে দল ক্ষমতায় আসে সেই দলের নেতাকর্মী ভাড়া আদায় করেন।
মিরপুরের প্যারিস খালপাড়ের ষাটোর্ধ্ব হাফিজুর রহমান বলেন, ‘১৯৮০ সালে যখন ঢাকায় আসি, তখন এ অঞ্চলে কোনো ভবন ছিল না। খালটিতে বর্ষায় নৌকা চলত। এখন যা অবস্থা, খাল আর ড্রেন পার্থক্য করার উপায় নেই।’
পান্থপথ এলাকার ৭০ বছর বয়সী বাসিন্দা আবদুস সাত্তার বলেন, ‘দুই দশক আগে একটা খাল ছিল। আমি এখানে মাছ ধরতাম ও গোসল করতাম। হাতিরঝিলের পানি এই পান্থপথ খাল দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ধানমন্ডি লেক হয়ে বুড়িগঙ্গা নদীতে যেত।’
হতাশা প্রকাশ করে আবদুস সাত্তার বলেন, ‘এ রাস্তাটি করার জন্য খালের ওপরে একটি বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছিল। খালটি যদি এখনো প্রবাহিত থাকত, তাহলে আমরা তাতে নৌকা চালাতে পারতাম। আমি ইউরোপ আমেরিকার অনেক দেশে ঘুরেছি। কিন্তু কখনো দেখিনি যে, রাস্তাঘাট নির্মাণের জন্য প্রকৃতিকে এভাবে ধ্বংস করা হয়। এমনটা শুধু বাংলাদেশেই হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে কয়েক বছর পরপর খালের মালিকানা পরিবর্তন হয়। কিন্তু তা আর ফিরে আসে না। এভাবে চলতে থাকলে ঢাকায় একটি খাল খুঁজে পেতে আমাদের দূরবীনের প্রয়োজন হবে।’
বাসাবো এলাকার ডিএসসিসির মান্ডা খাল ঘুরে দেখা যায়, মান্ডা ব্রিজ থেকে শুরু করে কদমতলী ব্রিজ পর্যন্ত খালটি বর্জ্যে ভরা। নন্দীপাড়া থেকে ত্রিমোহনী ব্রিজ পর্যন্ত জিরানী খালটিরও একই অবস্থা। খিলগাঁও বাসাবো খালটি যেন ভাগাড়। যাত্রাবাড়ীর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশের খাল আর কুতুবখালী খাল আশপাশের বাজারের ময়লায় ভর্তি। শনির আখড়া থেকে জুরাইনের ভেতরে শ্যামপুর খালটির জিয়া সরণি ব্রিজের আগে কয়েকশ মিটার বর্জ্যের দখলে। ধোলাইখালেরও একই অবস্থা।
ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘এখনো আমাদের কার্যক্রম খাল পরিষ্কারের মাঝেই সীমাবদ্ধ। আমরা কোনো খালই পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করতে পারিনি। আমরা এরই মধ্যে চারটি খাল নিয়ে কাজ শুরু করেছি। এর বাইরে ধারাবাহিকভাবে অন্য খালগুলো নিয়েও কাজ করব। তাহলে আস্তে আস্তে আমাদের বর্তমান পরিস্থিতি উন্নতির দিকে যাবে আশা করছি।’
ডিএনসিসির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, অবৈধভাবে যারা খালের জায়গা দখল করে স্থাপনা বানিয়েছেন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যদি অপসারণ না করেন, তাহলে আইনিভাবে এলাকাবাসীদের সঙ্গে নিয়ে আমরা সেটা উচ্ছেদ করব। কোনো ব্যক্তি যদি অবৈধভাবে সরকারি বা সংস্থার জমির ওপর স্থাপনা নির্মাণ করে, তাহলে সেটির দায় তাকেই নিতে হবে।
প্রশাসক বলেন, খাল উদ্ধারের বিকল্প নেই। এলাকাবাসীকে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দিতে হলে খাল উদ্ধার ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল রাখা জরুরি। মিরপুরের প্যারিস খাল গত দুই মাসে সাতবার পরিষ্কার করা হয়েছে। এরপরও খালটি নোংরা হয়ে গেছে। খালপাড়ে যারা বর্জ্য ফেলে, তাদের জরিমানার আওতায় আনার আলোচনা চলছে।
নগরায়ণে হারিয়ে গেছে ১৫টি খাল: নগরায়ণে ঢাকার অন্তত ১৫টি খাল এখন বক্স কালভার্ট ও রাস্তায় রূপান্তরিত হয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, সরকারি নির্দেশনাতেই এসব পরিবর্তন করা হয়েছে। কিন্তু খালগুলো পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। এরকম একটি জলপথ ছিল পান্থপথ খাল। যেটি ধানমন্ডি লেককে হাতিরঝিল লেকের সঙ্গে সংযুক্ত করত। এখন পান্থপথ রোডের নিচে খালটি চাপা পড়ে গেছে। এটি দিয়ে একসময় বৃষ্টির পানি বেগুনবাড়ি খালে প্রবাহিত হতো।
আরেকটি জলাশয় ছিল পরীবাগ খাল। যেটি শাহবাগ থেকে মগবাজার হয়ে প্রবাহিত হতো। এখন এটি সোনারগাঁও সড়কের কারণে হারিয়ে গেছে। একসময়ের প্রধান জলাধার হিসেবে বিবেচিত আরামবাগ ও গোপীবাগ খালও ভরাট হয়ে গেছে। একইভাবে রাজাবাজার ও নন্দীপাড়া-ত্রিমোহিনী খাল বক্স কালভার্টে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
বিশেষ করে একটি দীর্ঘ খাল, যা মৎস্য ভবন এলাকা থেকে প্রবাহিত হয়ে বিখ্যাত এলাকার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করত। এটিও কালের পরিক্রমায় সড়কে রূপান্তরিত হয়েছে। কাজলার পাড় খাল একসময় স্থানীয়দের জন্য অত্যাবশ্যকীয় এক জলপথ ছিল। এখন এটি কাজলা-কুতুবখালী সড়কে পরিণত হয়েছে।
ধোলাইখাল ও দয়াগঞ্জ খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় ধোলাইখাল-দয়াগঞ্জ-মিরহাজিরবাগ এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। এমনকি কাঁঠালবাগান ও ধলপুর খালও একই পরিণতি পেয়েছে। এ জায়গাগুলো এখন জমি ও অবকাঠামো তৈরি করে দখল করা হয়েছে। রায়েরবাজার, সেগুনবাগিচা, গোবিন্দপুর, কাঁঠালবাগান, নারিন্দা খালসহ আরও অনেক খাল একই পরিণতির মুখোমুখি হয়েছে।
খাল পুনরুদ্ধারে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রয়োজন: বর্তমানে ঢাকার বুকে টিকে আছে মাত্র ৬৫টি খাল, তাও নানা সমস্যায় জর্জরিত। অনেকগুলো হয়ে পড়েছে সংকুচিত, নেই পানির প্রবাহ, প্রায় বিলুপ্ত সেগুলোর জীববৈচিত্র্যও। খাল পুনরুদ্ধারে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) তাদের প্রণীত ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) ২০২২-৩৫-এ এক বিস্তৃত রূপরেখা দিয়েছে। ড্যাপের প্রাক্কলিত হিসাব অনুযায়ী, জীববৈচিত্র্যসহ প্রতিটি খাল পুনরুদ্ধারে লাগবে এক থেকে দেড় হাজার কোটি টাকা। তবে যেসব খালে ভূমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন নেই, সেখানে ব্যয় কম হবে। সব মিলিয়ে ঢাকার খালগুলো পুনরুদ্ধার করতে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজধানীর খাল পুনরুদ্ধার পরিকল্পনাকে বাস্তবভিত্তিক করতে এরই মধ্যে একটি সমীক্ষা সম্পন্ন করেছেন ড্যাপের প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এ সমীক্ষায় রাজধানীর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ খাল—কল্যাণপুর, রায়েরবাজার ও রামচন্দ্রপুরকে মডেল হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। সমীক্ষা অনুযায়ী, এ তিনটি খালকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন হবে অন্তত এক থেকে দেড় হাজার কোটি টাকা করে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, শুধু খনন বা পরিষ্কার কার্যক্রমের মাধ্যমে ঢাকার খালগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ ও জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
ড্যাপের প্রাক্কলন অনুযায়ী, রায়েরবাজার খালে ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ প্রয়োজন ৯৬৭ কোটি ১২ লাখ ১৮ হাজার টাকা। এ ছাড়া খালের ওপর থাকা ভবন পুনরুদ্ধারে ১৩৪ কোটি ৬৮ লাখ ৮ হাজার, খাল খনন ও পাড় বাঁধাইয়ের ক্ষেত্রে ১৩১ কোটি ৯৩ লাখ ৩০ হাজার, নৌঘাট নির্মাণে ৩৪ লাখ ৯ হাজার, এম্ফিথিয়েটার ১২৫ লাখ, ওয়াকওয়ে ৪৫ কোটি ৭৫ লাখ ২৬ হাজার এবং সবুজায়নে ২৮ কোটি ৮০ লাখ ৪ হাজার টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। সব মিলিয়ে খালটি পুনরুদ্ধারে মোট ১ হাজার ১৪৮ কোটি ১৪ লাখ ৮৯ হাজার টাকা প্রয়োজন। একইভাবে কল্যাণপুর খাল পুনরুদ্ধারে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা প্রাক্কলন করা হয়েছে।
খাল পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনার বিষয়ে রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘ঢাকার খালগুলোর মালিক আগে ছিল ওয়াসা, এখন সিটি করপোরেশন। সব সংস্থার সমন্বয়ে খাল পুনরুদ্ধারের ব্যাপারে এরই মধ্যে কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। যে কোনো মূল্যে এ খালগুলো উদ্ধার করা হবে। এ ব্যাপারে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ নিয়ে আমাদের মিটিংও হয়েছে। তিনি খাল পুনরুদ্ধারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন।’
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ: ঢাকার খালগুলো থেকে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের পর খালের সীমানা পিলার স্থাপন এবং হাঁটার পথ তৈরি করার পরামর্শ দিয়েছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। তারা মনে করেন, খাল উদ্ধার করে থেমে থাকলে চলবে না। খাল পাড়ে গাছ লাগানো এবং স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করে কমিটি করে দায়িত্ব দেওয়া, খালের ভেতরে যেন কেউ ময়লা না ফেলে, তা নিশ্চিত করতে হবে। বাড়িগুলোর সম্মুখভাগ খালের দিকে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন অনেকে। বাড়ির পেছনে খাল থাকলে সেটাকে ডাস্টবিন মনে করে ময়লা ফেলেন অনেকে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান কালবেলাকে বলেন, ঢাকার মতো বৃষ্টিপ্রবণ এলাকায় মোট আয়তনের ১৫ ভাগ খাল থাকার কথা। তা ছাড়া ফ্লাড অ্যাকশন প্ল্যানেও ১২ ভাগ জলাভূমি থাকার কথা বলা আছে। কিন্তু বাস্তবে এখন ৫ ভাগও নেই।
তিনি বলেন, খাল খনন কর্মসূচির আগে সরকারের পরিকল্পনা থাকা দরকার খাল নেটওয়ার্ক কতটুকু উদ্ধার করা সম্ভব? কিছু খালের ওপর স্থায়ী স্থাপনা হয়ে গেছে সেগুলো হয়তো আর ফেরানো সম্ভব নয়। কিন্তু এ খালগুলো কারা দখল করেছে, কীভাবে করেছে, তার একটা শ্বেতপত্র প্রকাশ করা দরকার। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের অনেক কর্মকর্তাও দখলদারত্বের সহযোগী, অনেকেই দুর্নীতিবাজ। তাদের বিরুদ্ধেও বড় কোনো আওয়াজ সরকারের তরফ থেকে এখন পর্যন্ত শোনা যায়নি। এ জন্য খাল দখল রোধ আইনটি আরও কঠোর করা দরকার। খাল শুধু উদ্ধার করলে হবে না, প্রাকৃতিক ভিত্তিতে খালের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতে হবে। সেখানে স্থাপনা না বানিয়ে গাছ লাগিয়ে কীভাবে মানুষের ব্যবহার উপযোগী করা যায়, সেভাবে পরিকল্পনা নিতে হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি, নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ কালবেলোকে বলেন, ‘আশির দশক থেকে খালগুলো হারাতে শুরু করে। যখন ঢাকা শহরে উঁচু এলাকাগুলোয় নগরায়ণ শেষ হয়ে গেল, তখন আশপাশে যত নিম্নভূমি আছে, সেগুলোয় নগরায়ণ শুরু করল অপরিকল্পিতভাবে। এরপর নিম্নভূমি, নিচু জলাশয় আর খালগুলো দখল হতে শুরু করল। এরপর সেগুলোও নগরায়ণ হতে শুরু করল। একটা সময় ঢাকা শহরে নিচু এলাকা দিয়ে খালগুলো প্রবাহিত হতো। আর যখন হাউজিংগুলো তৈরি হওয়া শুরু করল ব্যক্তিগত পর্যায়ে এবং হাউজিং কোম্পানির অধীনে, তখন ধীরে ধীরে খালগুলো হারিয়ে যেতে শুরু করে। বলা যায়, গত চার দশকে এ অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে খালগুলো হারিয়ে গেছে।’
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘এখন খালের চরিত্র পরিবর্তন হয়েছে কয়েকভাবে। এক হচ্ছে কিছু ছোট খাল আছে, যা একেবারে হারিয়ে গেছে। যেগুলো ব্রাঞ্চ ছিল, শাখা-প্রশাখা ছিল। আবার কিছু খাল আছে যেগুলো বক্স কালভার্ট করা হয়েছে। যেমন—সেগুনবাড়ি খাল অথবা ধোলাইখাল। কিছু খাল আছে যেগুলো পুরোপুরি সংকুচিত হয়ে গেছে বলা যায়। যেখানে ৪০ ফিট ছিল, এখন আছে ১০ ফিট বা ১৫ ফিট। আবার কিছু খাল হয়ে গেছে এমন যে, ময়লা, কাদা, মাটি এগুলো জমে এগুলো সমতল হয়ে গেছে। এভাবে নানাভাবে খালের শাখা-প্রশাখাগুলো হারিয়ে গেছে।’
অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বলেন, কখনো কখনো সিটি করপোরেশন বা সংশ্লিষ্টরা উদ্যোগ নেয়, কিন্তু উদ্যোগগুলো টেকসই হয় না। খাল পরিষ্কার করে, কিন্তু এক মাস দেড় মাস পর আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে। অর্থাৎ, এখানে যে কঠিন বর্জ্যগুলো আছে, ময়লা আছে এবং অন্য যে বর্জ্যগুলো আছে, এগুলো এসে মানুষ এখানে ফেলে। এখন পানির প্রবাহ ঠিক রাখতে হলে অবশ্যই খালকে পরিষ্কার রাখতে হবে। আর সিটি করপোরেশনের বর্জ্য সংগ্রহ করার দক্ষতা বাড়াতে হবে। খালগুলো সংরক্ষণ করতে হবে। তখনই এটা টেকসই হবে, না হলে টেকসই হবে না।