কুরবানির ঈদ ঘিরে উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় পশুর মোকাম রাজশাহী সিটি হাট থেকে প্রতিরাতে দেশজুড়ে ছুটছে প্রায় ৫শ পশুবাহী ট্রাক। কিন্তু এই যাত্রাপথে মহাসড়কগুলো চাঁদাবাজির অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। রাজশাহী থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত প্রায় পাঁচশ কিলোমিটার মহাসড়কের অন্তত ২০টি পয়েন্টে তোলা হয় চাঁদা। হাইওয়ে ও থানা পুলিশের কতিপয় সদস্য এবং রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীর নামে বেপরোয়া চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন চালকরা। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে চলছে শারীরিক লাঞ্ছনা এবং কাগজপত্র পরীক্ষার নামে পুলিশি হয়রানি। এছাড়া গভীর রাতে ধারালো অস্ত্রের মুখে সর্বস্ব ছিনতাইয়ের মতো লোমহর্ষক ঘটনাও ঘটছে। ঘাটে ঘাটে চাঁদা দিতে গিয়ে প্রতিটি ট্রাকে গুনতে হচ্ছে ৭ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা।
একই চিত্র সাতক্ষীরা ও রাঙামাটিতেও। সেখানে ‘লাইন খরচ’, ‘শ্রমিক খরচ’ ও টোলের নামে ঘাটে ঘাটে টাকা আদায় করা হচ্ছে। পথে পথে এই চাঁদাবাজি ও ছিনতাইয়ের কারণে আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন গরুর মালিক ও চালকরা। পাশাপাশি পরিবহণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে গরুর দামেও; যার চূড়ান্ত খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ ক্রেতাদের।
রাজশাহী থেকে স্টাফ রিপোর্টার তানজিমুল হক জানান, উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলার মধ্যে পশু কেনাবেচার সবচেয়ে বড় মোকাম রাজশাহী সিটি হাট। প্রতিদিন এই হাটে ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার গরু, ছাগল ও মহিষ বিক্রি হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বড় পাইকাররা হাটটিতে আসেন। তারা রাত ১১টার পর থেকে পশুবাহী ট্রাকগুলো নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশে রওয়ানা হন। প্রতিরাতে প্রায় ৫শ ট্রাক এই হাট থেকে পশু নিয়ে বের হয়। সিটি হাট থেকে ট্রাকগুলো রাজশাহী মহানগরীর উপকণ্ঠ বেলপুকুরে পৌঁছলে কতিপয় পুলিশ সদস্য ট্রাক আটকান, নেন ৫শ টাকা চাঁদা। আর এখানে দলীয় নেতাকর্মী পরিচয়ে চালকদের কাছ থেকে নেওয়া হয় ৩শ টাকা।
এরপর মাত্র তিন কিলোমিটার অতিক্রম করলেই পুঠিয়ার পবা হাইওয়ে থানার কতিপয় পুলিশ সদস্য ট্রাক আটকান। এখানেও ৫শ টাকা চাঁদা দিতে হয়। এখানে দলীয় নেতাকর্মী পরিচয়ে ২শ টাকা আদায় করে স্থানীয় বখাটেরা। এরপর নাটোরের বনপাড়ায় একই পরিমাণ চাঁদা নেন হাইওয়ে পুলিশ ও নেতাকর্মীরা। বনপাড়া পার হয়ে সিরাজগঞ্জ যমুনা সেতুর পূর্বে এলে আটকায় টহল ও হাইওয়ে পুলিশ। সেখানে পৃথকভাবে ৫শ টাকা করে চাঁদা দিতে হয়।
পশুবাহী ট্রাকের চালকরা বলেন, এখানে হাইওয়ে পুলিশ সবচেয়ে বেশি হয়রানি করে। চাঁদা নেওয়ার পাশাপাশি গাড়ির কাগজপত্র দেখতে চায়। ব্লুবুক, ট্যাক্স, টোকেন, ফিটনেস, রোড পারমিটসহ আনুষঙ্গিক কাগজপত্রে সামান্য অসংগতি পেলেই ট্রাক দাঁড় করিয়ে রাখে। এরপর মামলা দেওয়ার ভয় দেখায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। ভোগান্তি আর হয়রানির পর একপর্যায়ে দফারফা করতে হয়। এখানে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা আদায় করেন হাইওয়ে পুলিশের কর্তারা। একই জায়গায় দলীয় পরিচয়েও ৩শ টাকা চাঁদা নেওয়া হয়।
চাঁদাবাজির অভিযোগ থাকলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানিয়ে উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী, নাটোর, সিরাজগঞ্জসহ কয়েকটি জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বগুড়া হাইওয়ে পুলিশের প্রধান পুলিশ সুপার (এসপি) আবু তোরাব মোহাম্মদ শামসুল আলম যুগান্তরকে বলেন, আমরা এ ধরনের অভিযোগ পাইনি। তবে এ ব্যাপারে গোপনে নজরদারি করা হচ্ছে। কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তদন্ত করা হবে। তদন্তে সত্যতা পেলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। সর্বোচ্চ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।
যমুনা ব্রিজ পার হয়ে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা ও সখিপুরে যানজটের সুযোগ নিয়ে হাইওয়ে পুলিশ ৫শ টাকা করে আদায় করে। এ দুই স্থানেও দলীয় পরিচয়ে ২শ টাকা নেওয়া হয়। এছাড়াও গোড়াই এলাকায়ও একইভাবে চাঁদাবাজির শিকার হন ট্রাকচালকরা। অন্যদিকে গাজীপুর চৌরাস্তায় একই পরিমাণ চাঁদা নেন হাইওয়ে পুলিশের সদস্যরা। এরপর পশুবাহী ট্রাকগুলো রাজধানীর গাবতলী প্রবেশ করলে শুরু হয় আরও বেপরোয়া চাঁদাবাজি।
এ ব্যাপারে হাইওয়ে পুলিশ উত্তর ডিভিশনের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আব্দুল্লাহ হিল বাকি বলেন, মহাসড়কে পশুবাহী ট্রাকে যে কোনো ধরনের চাঁদাবাজি রোধে আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছি। কারও বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গাবতলী ছাড়াও শনির আখড়া, মদনপুর, গাউছিয়া ও আড়াইহাজার এলাকায় হাইওয়ে পুলিশ জোরপূর্বক ট্রাক থামায়। এরপর এসব স্থানে ট্রাকপ্রতি অন্তত ৫শ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হয়। এরপর কুমিল্লা, ফেনী ও চট্টগ্রামের অন্তত সাতটি স্থানে সমপরিমাণ চাঁদা আদায় করেন হাইওয়ে পুলিশের কতিপয় সদস্য।
ট্রাকচালকদের অভিযোগ, গভীর রাতে হাইওয়ে পুলিশ সদস্যরা দ্রুতগতিতে চলমান ট্রাকগুলোকে সিগন্যাল দেন। তারা হাত দিয়ে ইশারা করে ট্রাকের সামনে দাঁড়িয়ে যান। এর ফলে গতিতে থাকা ট্রাকগুলো নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়। বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে।
এদিকে গভীর রাতে ঢাকা-বাইপাস, যাত্রাবাড়ী, মহাখালী, গুলিস্তানসহ অন্য ফ্লাইওভারগুলোয় ছিনতাইকারীরা ট্রাকের গতি কিছুটা কম থাকলে জোরপূর্বক ট্রাকে উঠে চালকদের গলায় ধারালো ব্লেড অথবা ক্ষুর ঠেকিয়ে টাকা, মোবাইল ফোনসহ সর্বস্ব ছিনিয়ে নেয়।
আরেক ট্রাকচালক জানান, গত রোজার ঈদের কয়েকদিন আগে পাবনার ঈশ্বরদী থেকে গরুবাহী একটি ট্রাক নিয়ে রাজশাহীর আব্দুর রহমান নামের একজন চালক নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশে রওয়ানা দেন। ঘোড়াশাল এলাকায় পৌঁছালে একটি মাইক্রোবাস দিয়ে গরুবাহী ট্রাকটিকে ব্যারিকেড দেয় ছিনতাইকারীরা। এরপর চালককে ক্ষুর দিয়ে আঘাত করা হয়। হাঁসুয়ার উলটো পিঠ দিয়েও আঘাত করে আহত করা হয়। পরে ট্রাকসহ ছোট-বড় মিলে ২৬টি গরু ছিনিয়ে নেয়। অবশ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরে চালক, ট্রাক ও গরুগুলো উদ্ধার করে।
রাজশাহীর একজন ট্রাক মালিক জানান, কুরবানির ঈদ সামনে রেখে এখন পশুবাহী ট্রাকের চাহিদা কিছুটা বেশি। রাজশাহী থেকে ঢাকা ৪০ হাজার টাকা এবং চট্টগ্রাম পর্যন্ত ৫৫ হাজার টাকা ভাড়া পাই। কিন্তু পথেই দিতে হয় ৭-১০ হাজার টাকা চাঁদা। তাছাড়া তেলের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য ব্যয় রয়েছে। চাঁদাবাজি না থাকলে আমাদের ভোগান্তি আর হয়রানির শিকার হতে হতো না। ব্যবসায়ও লাভ বেশি হতো।
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি মো. মুজাহিদুল ইসলাম জানান, জেলার বিভিন্ন প্রবেশপথ, মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে গরুর ট্রাক থামিয়ে ‘লাইন খরচ’, ‘শ্রমিক খরচ’, ‘ম্যানেজ’ কিংবা ‘চেকিং’-এর নামে প্রকাশ্যে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন খামারি, গরু ব্যবসায়ী ও পরিবহণ শ্রমিকরা। শ্রমিক ইউনিয়ন ও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা এর সঙ্গে জড়িত।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ভোমরা স্থলবন্দর এলাকা, সাতক্ষীরা-যশোর মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্ট, তালা, কলারোয়া ও শ্যামনগর সড়কের কয়েকটি স্থানে সংঘবদ্ধভাবে ট্রাক থামানো হচ্ছে। বিশেষ করে গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত চাঁদাবাজির মাত্রা বেশি থাকে।
একাধিক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, একটি গরুর ট্রাক সাতক্ষীরা থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছাড়ার পর পথে বিভিন্ন স্থানে থামিয়ে কয়েকশ থেকে কয়েক হাজার টাকা আদায় করা হয়। টাকা না দিলে ট্রাক আটকে রাখা, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা কাগজপত্র নিয়ে হয়রানি করা হয়।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার গরু ব্যবসায়ী হাফিজুল ইসলাম বলেন, প্রতি ট্রাকে ১৫-২০ লাখ টাকার গরু থাকে। পথে ঝামেলায় পড়লে বড় ক্ষতি হয়ে যায়। তাই বাধ্য হয়েই টাকা দিতে হয়।
কলারোয়া পশুর হাট থেকে গরু নিয়ে ঢাকায় যাওয়া ট্রাকচালক তরিকুল বলেন, ঈদের আগে গরুর গাড়ি দেখলেই আলাদা নজর দেওয়া হয়। কেউ শ্রমিক পরিচয়ে আসে, কেউ স্থানীয় প্রভাবশালী লোকের নাম বলে। পুরো পথে ৩-৫ হাজার টাকা চলে যায়।
জেলার একাধিক খামারি জানান, চাঁদাবাজির কারণে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত গরুর বাজারমূল্যও বেড়ে যায়। এতে ক্ষতির মুখে পড়েন সাধারণ ক্রেতারাই। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পরিবহণসংশ্লিষ্ট নেতারা। সাতক্ষীরা জেলা সড়ক পরিবহণ শ্রমিক নেতা আজহারুল ইসলাম বলেন, সংগঠনের নামে কেউ চাঁদাবাজি করলে সেটি ব্যক্তিগত দায়। শ্রমিক ইউনিয়ন কোনো অবৈধ টাকা আদায় সমর্থন করে না।
সাতক্ষীরার ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক মসিউর রহমান বলেন, পশুবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজির অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। কোথাও অবৈধ অর্থ আদায়ের প্রমাণ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, হাটিকুমরুল গোলচত্বর এলাকায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ট্রাকে চাঁদাবাজির অভিযোগে হাইওয়ে থানার এসআই তোফাজ্জল হোসেনসহ পাঁচ কনস্টেবলকে রোববার বগুড়া রেঞ্জে ক্লোজ করা হয়েছে। সিরাজগঞ্জ হাইওয়ে থানা পুলিশ জানায়, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হাটিকুমরুল গোল চত্বরে গরুবহী ট্রাক থামিয়ে পুলিশ টাকা নিচ্ছে-এমন খবর ও ভিডিও যমুনা টেলিভিশনে প্রচারের পর এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সিরাজগঞ্জ হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ ইসমাইল হোসেন জানান, অভিযোগ সত্য হলে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাঙামাটি প্রতিনিধি জানান, জেলার বিভিন্ন স্থানে পশুবাহী পরিবহণ থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়া গেছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকা, ট্রলার ও ট্রাকে করে পশু আনা-নেওয়ার সময় স্থানীয় একাধিক গ্রুপ এই চাঁদা আদায় করছে। তবে এতে কারা জড়িত, তা স্পষ্ট করছেন না ভুক্তভোগীদের কেউ। আবার বিভিন্ন ঘাটে বিভিন্ন সংস্থা টোলের নামে টাকা আদায় করছে। এছাড়া রাঙামাটি থেকে চট্টগ্রাম ও ঢাকায় নেওয়ার পথেও পশুবাহী পরিবহণ থেকে একাধিক স্থানে চাঁদা দিতে হয় বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যবসায়ী বলেন, রাঙামাটি থেকে চট্টগ্রাম ও ঢাকায় নেওয়ার সময় রাঙামাটি সদরের মানিকছড়ি থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের হাটহাজারী পর্যন্ত পথে পথে চাঁদা দিতে হয়।
কোতোয়ালি থানার ওসি মো. জসীম উদ্দিন বলেন, পশুবাহী যানবাহন থেকে চাঁদাবাজি বন্ধে পুলিশের তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। এজন্য পশুর হাটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে টহল বসানো হয়েছে।