Image description

কোরবানির ঈদ সামনে রেখে সারা দেশে ছিনতাই, ডাকাতি, চুরি, অজ্ঞান ও মলম পার্টির তৎপরতা বেড়েছে বলে জানিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। এ ছাড়া জাল টাকার বিস্তার নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সদর দপ্তর বিশেষ পরিকল্পনা নিয়েছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, ঈদকে কেন্দ্র করে সক্রিয় হয়ে ওঠা ছয় ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে জেলা পুলিশ সুপারদের বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মহাসড়কে ডাকাতি, পশুবাহী গাড়ি ছিনতাই, বাসাবাড়িতে চুরি ও গণপরিবহনে অজ্ঞান পার্টির দৌরাত্ম্য ঠেকাতে নেওয়া হয়েছে বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা।

পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকেও মাঠ পর্যায়ে তৎপর থাকতে বলা হয়েছে।

রাজধানীতে প্রায় ১৬ হাজার পুলিশ সদস্য অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করবেন। পাশাপাশি ৬০টি টহলদল বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও স্পর্শকাতর এলাকায় দায়িত্বে থাকবে। পশুর হাট ও নগদ অর্থ লেনদেনকেন্দ্রিক এলাকাগুলোতে থাকবে বিশেষ নজরদারি।

বসানো হবে ওয়াচ টাওয়ার। নগদ অর্থ পরিবহনে থাকবে মানি এসকর্ট টিমও।

ডিএমপি সূত্র জানায়, রাজধানীর বিভিন্ন পশুর হাট, বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট, রেলস্টেশন ও শপিং মল এলাকায় পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকের সদস্যও মোতায়েন থাকবেন। সিসিটিভি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনায় ঈদকে কেন্দ্র করে অপরাধীচক্রের তৎপরতা স্পষ্ট হয়েছে।

গত বুধবার রাতে সিলেটের বিশ্বনাথ থেকে তিনটি কোরবানির গরু নিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা দেওয়া একটি পিকআপ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর এলাকায় ছিনতাইয়ের শিকার হয়। পরে রাজধানীর বংশাল এলাকায় অভিযান চালিয়ে গরু তিনটি উদ্ধার করে পুলিশ।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপকমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আগা সাদেক রোডের একটি মাংসের দোকানে অভিযান চালিয়ে গরুগুলো উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া গরুর আনুমানিক মূল্য আট লাখ ৬০ হাজার টাকা।

ফেনীতে অস্ত্র ঠেকিয়ে ব্যবসায়ীর গরু ছিনতাই

ফেনীতে অস্ত্রের মুখে এক ব্যবসায়ীকে জিম্মি করে গরু ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। গত শনিবার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের রামপুর র‌্যাব ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। 

ছিনতাই ঝুঁকি এড়াতে হাটে ক্যাশলেস লেনদেন করতে বললেন র‌্যাব ডিজি

র‌্যাব মহাপরিচালক (ডিজি) মো. আহসান হাবীব পলাশ বলেন, কোরবানির ঈদে পশু ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা প্রতিরোধে ‘কার্যকর ব্যবস্থা’ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে হাটগুলোতে নগদ লেনদেন পরিহার করে ক্যাশলেস বা কার্ডের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধে উৎসাহিত করার কথাও বলেন তিনি। গতকাল রবিবার ঢাকার গাবতলী পশুর হাট পরিদর্শন শেষে গৃহীত নিরাপত্তাব্যবস্থার বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন। এ ছাড়া গত শনিবার রাজধানীর গোলাপবাগ মোড়ে এক নারীর কানের দুল ছিনতাইয়ের চেষ্টা করলে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য ধাওয়া দিয়ে অভিযুক্ত সজীব হায়দারকে আটক করেন। পরে ছিনিয়ে নেওয়া সোনার দুল উদ্ধার করে ভুক্তভোগীর কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্র বলছে, ঈদের আগে মহাসড়কগুলোতে ডাকাতির ঝুঁকি বাড়ে। সংঘবদ্ধ চক্র রাস্তা অবরোধ করে বা চালকদের ভয় দেখিয়ে বাস, ট্রাক, প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাস থামিয়ে মালপত্র লুট করছে। অনেক ক্ষেত্রে যাত্রীদের মারধর ও জিম্মি করার ঘটনাও ঘটছে। অজ্ঞান পার্টি ও মলম পার্টির সদস্যরা দূরপাল্লার বাস, ট্রেন ও লঞ্চে যাত্রীদের টার্গেট করছে।

ডাকাতির ডেঞ্জার স্পট ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক

বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাঁচপুর, দাউদকান্দি, চান্দিনা ও ফেনীর বিভিন্ন অংশ এখন ডাকাতির ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা-আরিচা, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-সিলেট, খুলনা-যশোর ও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন মহাসড়কেও সম্প্রতি ডাকাতির ঘটনা বেড়েছে।

এ বিষয়ে হাইওয়ে পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি দেলোয়ার হোসেন মিঞা বলেন, অপরাধীরা সাধারণত রাতের সময় বেছে নেয়। সীমাবদ্ধতা থাকলেও মহাসড়কে টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

গোয়েন্দা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর আটটি ক্রাইম জোনে চার শতাধিক ছিনতাইপ্রবণ স্থান রয়েছে। এসব এলাকায় এক হাজারের বেশি ছিনতাইকারী সক্রিয়। এর মধ্যে মিরপুর ও তেজগাঁও বিভাগে ৩৮৬ জন, মতিঝিল ও ওয়ারী বিভাগে ২১২ জন, রমনা ও লালবাগ বিভাগে ২১৭ জন এবং উত্তরা ও গুলশান বিভাগে ১৫৪ জন সক্রিয় ছিনতাইকারী রয়েছে বলে পুলিশের হিসাব।

পরিসংখ্যান বলছে, ছিনতাইয়ের প্রায় ৬৫ শতাংশ ঘটনায় মোটরসাইকেল ব্যবহার করা হয়। প্রায় ২০ শতাংশ সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে এবং বাকি ১৫ শতাংশ প্রতারণার কৌশলে সংঘটিত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার সুবিধা থাকায় অপরাধীরা মোটরসাইকেল বেশি ব্যবহার করছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ১৬ মাসে দেশে ডাকাতির ঘটনায় এক হাজারের বেশি মামলা হয়েছে। একই সময়ে ছিনতাই ও দস্যুতার ঘটনায় মামলা হয়েছে প্রায় চার হাজার।

অপরাধে সমাজে অস্থিরতা : চলতি বছরের প্রথম চার মাসে হত্যা, অপহরণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, ডাকাতি, দস্যুতা, চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে মামলা হয়েছে ১৩ হাজার ২২১টি। এর মধ্যে হত্যা মামলা এক হাজার ১৪২টি, দস্যুতার ৫৯১টি, ডাকাতির ১৮৪টি এবং চুরি-ছিনতাইয়ের মামলা চার হাজার ৯৯টি।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও মিটফোর্ড হাসপাতাল সূত্র জানায়, প্রতিদিনই ছিনতাই ও অজ্ঞান পার্টির শিকার মানুষ চিকিৎসা নিতে আসছে। অনেক ক্ষেত্রে যাত্রীরা বাস বা ট্রেনে অপরিচিত ব্যক্তির দেওয়া খাবার খেয়ে অচেতন হয়ে পড়ছেন।

অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, ঈদের আগে রাতে পর্যাপ্ত টহলের অভাব, নির্জন সড়ক, সংঘবদ্ধ অপরাধীচক্রের সক্রিয়তা এবং জনবলসংকটের কারণে অপরাধ বাড়ে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আরো বাড়তে পারে।

পুলিশের নিরাপত্তা পরামর্শ : ঈদে বাড়ি যাওয়ার আগে ও পরে সময় নিয়ে ভ্রমণ পরিকল্পনা করুন। এতে ট্রেন, বাস, লঞ্চ ও ফেরিঘাটের শেষ মুহূর্তের ভিড় এড়ানো সহজ হবে।

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে বাস, ট্রেন, লঞ্চ ও স্টিমারের ছাদে এবং ট্রাক, পিকআপ ও অন্যান্য পণ্যবাহী যানবাহনে ভ্রমণ থেকে বিরত থাকুন।

চালককে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালাতে দেবেন না। চালক যাতে নিয়ম মেনে গাড়ি চালান এবং ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং না করেন সেদিকে লক্ষ রাখুন। অপেশাদার, ক্লান্ত বা অসুস্থ চালক যাতে গাড়ি না চালান সে ব্যাপারে সতর্ক থাকুন।

হাইওয়েতে নছিমন, করিমন, ভটভটি ইত্যাদি যানবাহনে চলাচল পরিহার করুন। হাইওয়েতে ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি চালাবেন না। ট্রেনে ভ্রমণের সময় পাথর নিক্ষেপ সম্পর্কে সতর্ক থাকুন; মালপত্র নিজ দায়িত্বে রাখুন। বিনা টিকিটে ট্রেনে ভ্রমণ থেকে বিরত থাকুন।

এ বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির বলেছেন, ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে পুলিশ সর্বোচ্চ তৎপর রয়েছে। মহাসড়কে ডাকাতি ও ছিনতাই ঠেকাতে হাইওয়ে পুলিশকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।