সময় বদলেছে। সবকিছুর দাম বেড়েছে। বদলে গেছে হাজারীবাগও। নেই সেই আগের মতো চামড়া বেচাকেনার হাঁকডাক। চিরচেনা ড্রেনের পানিতে নেই আগের মতো চামড়ার দুর্গন্ধ। গত এক দশকে সবকিছুর দাম গুণ হিসাবে বাড়লেও চামড়ার দাম কমেছে জ্যামিতিক আকারে। এমনকি এক দশক আগের একই ডিজাইনের জুতার দামও হয়েছে দ্বিগুণ। সাধারণ মানুষ দেশের তৈরি অন্যান্য জিনিস কম দামে কেনার সুবিধা ভোগ করলেও চামড়ার তৈরি জিনিস যেন বিপরীত। দেশে হাজার টাকার নিচে মিলছে না চামড়ার জুতা। পাওয়া যায় না বেল্টও। অথচ মাঠপর্যায়ে একটি চামড়ার দাম মিলছে না হাজার টাকা।
জুতার কারখানার মালিক ও ট্যানারি ব্যবসায়ীদের তথ্যানুযায়ী, সাধারণত একটি মাঝারি সাইজের গরু (যার ওজন ১৫০ থেকে ২০০ কেজি) থেকে গড়ে ২২ থেকে ২৫ বর্গফুট চামড়া পাওয়া যায়। গড়ে একটি মাঝারি গরুর চামড়া ৮০০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকায় কেনা হয়। মাঠপর্যায় থেকে সংগৃহীত পশুর চামড়া যখন সাভারের চামড়া শিল্পনগরী বা দেশের বিভিন্ন ট্যানারিতে পৌঁছায়, তখন তা থাকে সম্পূর্ণ কাঁচা এবং পচনশীল। ট্যানারিতে কাঁচা চামড়াকে জুতা, ব্যাগ কিংবা জ্যাকেট তৈরির উপযোগী আন্তর্জাতিক মানের ‘ফিনিশড লেদারে’ রূপান্তর করতে কয়েকটি ধাপ পার হতে হয়। একটি চামড়াকে পুরোপুরি ব্যবহারের উপযোগী করতে প্রধানত তিনটি বড় ধাপে প্রসেস করা হয়। এগুলো হলো ওয়েট ব্লু, ক্রাস্ট ও ফিনিশিং। ট্যানারিতে লবণ দেওয়া, চুল ও চর্বি পরিষ্কার, ওয়েট-ব্লু, ক্রাস্ট এবং ফিনিশড লেদার করা পর্যন্ত প্রতি বর্গফুটে কেমিক্যাল, বিদ্যুৎ, পানি ও শ্রমিকের মজুরি বাবদ খরচ হয় প্রায় ৬০ থেকে ৮০ টাকা। এরপর এক জোড়া ভালোমানের জেন্টস ফরমাল জুতা বা লোফার তৈরি করতে গড়ে ৩ বর্গফুট ফিনিশড লেদার প্রয়োজন হয় (কাটিং অপচয় বা ওয়েস্টেজসহ)। জুতা সম্পূর্ণ করতে চামড়া ছাড়াও বেশ কিছু অতিরিক্ত কাঁচামাল ও উৎপাদন খরচের প্রয়োজন হয়।
জুতার ভিতরের লাইনিং বা ইনসোলের জন্য নরম চামড়া বা সিনথেটিক ম্যাটেরিয়াল বাবদ প্রতি জোড়াতে খরচ হয় ১০০ টাকা। জুতার নিচের অংশ বা উন্নত মানের রাবার সোলের জন্য খরচ হয় ১২০ থেকে ১৮০ টাকা। জুতা জোড়া লাগানোর আঠা, সুতা, আইলেট ও ফিতার মতো আনুষঙ্গিক কেমিক্যালের পেছনে ব্যয় হয় ৫০ টাকা। জুতা কাটিং, আপার স্টিচিং এবং সোল ফিটিংয়ের জন্য দক্ষ কারিগরের মজুরি বাবদ দিতে হয় ১৫০ টাকা। জুতা তৈরি হওয়ার পর তার আকর্ষণীয় প্যাকেজিং, ইনার বক্স ও টিস্যু পেপারের জন্য খরচ হয় ৭০ টাকা। এর বাইরে কারখানার নিজস্ব বিদ্যুৎ বিল, ঘরভাড়া ও অন্যান্য ওভারহেড খরচ বাবদ ৫০ টাকা। সব মিলিয়ে এক জোড়া প্রিমিয়াম কোয়ালিটির চামড়ার তৈরিতে ১ হাজার টাকারও বেশি খরচ হয় না। আর ব্র্যান্ডের দোকানে এসব জুতা ৪ হাজার টাকার নিচে পাওয়া যায় না। হাজারীবাগে কথা হয় এস এস ট্যানারির ম্যানেজার আবরার হোসেন ফাহিমের সঙ্গে। তিনি জানান, মাঝারি সাইজের চামড়া ৮০০ থেকে ১২০০ টাকায় কেনা হয়। ট্যানারিতে ওয়েট ব্লু স্টেজ পর্যন্ত আসতে চামড়াপ্রতি প্রায় ১৫০০ টাকা খরচ হয়। এরপর রয়েছে জুতা তৈরির খরচ যার মধ্যে সোল ১৫০-২০০ টাকা, সলিউশন ও পেস্টিং ১২০-১৪০ টাকা এবং ডিজাইন চার্জ ২০০ টাকা। সব মিলিয়ে কাঁচামাল ও মজুরিসহ একটি জুতার পেছনে প্রায় ১ হাজার টাকার মতো খরচ হয়। অথচ এই জুতাই বিভিন্ন বড় বড় ব্র্যান্ডের দোকানে বিক্রি হয় প্রায় ৪ হাজার টাকায়।
চামড়াজাত পণ্যের বাজারজাতকারী এবং রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘থ্রি টেক’-এর সিইও ও প্রোপ্রাইটর মো. তাসনিম আলম (শাহীন) বলেন, একটি মাঝারি সাইজের গরুর চামড়া (যা সাধারণত ১৮ থেকে ২০ স্কয়ার ফুট হয়ে থাকে) থেকে অন্তত ৫-৬ জোড়া জুতা তৈরি সম্ভব। তবে জুতার শুধু ওপরের অংশ (আপার লেদার) ছাড়াও ভিতরের লাইনিং ও ইনসোলের জন্য আরও ভিন্ন ধরনের চামড়ার প্রয়োজন হয়। বর্তমান বাজারে কাঁচা চামড়ার দাম কম হলেও চূড়ান্ত পণ্যের দাম বেশি হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ কেমিক্যালের উচ্চমূল্য ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ। তিনি বলেন, বড় বড় ব্র্যান্ডগুলো সাধারণত পাইকারি বা সাপ্লাইয়ার মূল্যের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি দামে পণ্য বিক্রি করে থাকে। আমার থেকে যে বেল্ট তারা ৪০০ টাকায় কেনে, তা শোরুমে ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকায় বিক্রি হয়। ব্র্যান্ডগুলোর প্রাইম লোকেশনে শোরুমের চড়া ভাড়া, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন এবং বিশাল অফিস মেইনটেইন্যান্স খরচের কারণেই পণ্যের দাম এতটা বেড়ে যায়। ফলে সাধারণ কাস্টমাররা যখন হাজারীবাগের মতো সরাসরি ফ্যাক্টরি আউটলেট বা পাইকারি বাজার থেকে পণ্য কেনেন, তখন তারা অনেক সাশ্রয়ী মূল্যে তা পেয়ে থাকেন।