Image description
শিশুর প্রতি নৃশংসতা

মাগুরার শিশু আছিয়াকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ২০২৫ সালের মার্চে নাড়িয়ে দিয়েছিল পুরো দেশকে। আলোচিত এ মামলায় দৃষ্টান্তমূলক দ্রুততায় বিচারকাজ সম্পন্ন করে মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। ঘটনার দুই মাস ১২ দিনের মাথায় বিচার শুরু হয়। এরপর মাত্র ২১ দিনে, ১৩ কার্যদিবসের শুনানি শেষে একই বছরের ১৭ মে রায় ঘোষণা করা হয়। আদালত প্রধান আসামি শিশু আছিয়ার বড় বোনের শ্বশুর হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দেন। রায়ের চার দিনের মাথায় মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স হাই কোর্টে পাঠানো হলেও এক বছর পরেও শুনানি শুরু হয়নি।

রাজধানীর মিরপুর মডেল থানার পীরেরবাগ এলাকায় ছয় ও সাত বছর বয়সি দুই শিশুকে ধর্ষণের দায়ে দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে ২০২৩ সালের ২৯ জানুয়ারি রায় দেন ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮। আসামি মো. ফজলু ও মো. জহিরুল ইসলামের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স পাঠানো হয় হাই কোর্টে। ডেথ রেফারেন্স শুনানি শুরু হয়নি এ মামলাটিরও।

২০২০ সালের ৩ অক্টোবর বাগেরহাটের মোংলায় সাত বছর বয়সি এক শিশুকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এ মামলায় ৫৩ বছর বয়সি আবদুল মান্নান সরকারকে আসামি করা হয়। অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশের পর মাত্র সাত কার্যদিবস শুনানি শেষে ১৯ অক্টোবর মান্নানকে যাবজ্জীবন সাজার রায় দেয় বাগেরহাটের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের অপেক্ষায় এই মামলাটিও।

শুধু এ ঘটনা তিনটিই নয়, শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা ঘটার পর দেশব্যাপী বিক্ষোভ-প্রতিবাদ সামাল দিতে তড়িঘড়ি অধস্তন আদালতে দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করা হলেও উচ্চ আদালতে এসে থমকে যায়। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায়ের হাই কোর্টে আসা ডেথ রেফারেন্স বা আপিল শুনানি দ্রুত করার উদ্যোগ খুব একটা দেখা যায় না। অধস্তন আদালতের পর হাই কোর্ট ও আপিল বিভাগে গিয়ে চূড়ান্ত বিচার পেতে অপেক্ষায় থাকতে হয় বছরের পর বছর। আইনজ্ঞরা বলেন, মামলাজটের কারণে চাঞ্চল্যকর মামলাগুলোর বিচারও বিলম্বিত হচ্ছে। তারা বলেন, ঘটনার পর পর গণদাবির পরিপ্রেক্ষিতে দ্রুত তদন্ত শেষ করে আসামিদের বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছে, সেখানে রায়ও হচ্ছে, দণ্ড হচ্ছে। উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল দ্রুত নিষ্পত্তি না হওয়ায় চূড়ান্ত বিচার পাওয়া যাচ্ছে না।

ফলে আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। তাদের মতে, দু-একটি ঘটনায় জনগণের প্রতিবাদ থামাতে স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থা গ্রহণ না করে, বিচার বিভাগের কাঁধে থাকা পাহাড়সম মামলার জট কমানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। যে কোনো ঘটনার চূড়ান্ত বিচার দ্রুত করতে পারলে, অপরাধীরা অপরাধ করতেও ভয় পাবে। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারার বিধান অনুযায়ী, অধস্তন আদালতে কোনো আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় হলে তা কার্যকরে উচ্চ আদালতের অনুমোদন ও শুনানি হতে হয়। এজন্য অধস্তন আদালতের রায়ের অনুলিপি ও মামলার নথি হাই কোর্টে পাঠানো হলে এটি ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) হিসেবে নথিভুক্ত এবং শুনানির জন্য পেপারবুক (মামলার রায়সহ যাবতীয় নথি) প্রস্তুত হয়। পাশাপাশি কারাগারে থাকা আসামি হাই কোর্টে আপিল কিংবা জেল আপিলের সুযোগ পান। সুপ্রিম কোর্টের গত ১০ বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ডেথ রেফারেন্স হিসেবে নথিভুক্ত হওয়া এসব মামলা শুনানির জন্য প্রস্তুত হতে সময় লাগে পাঁচ বছরের বেশি। 

বর্তমানে হাই কোর্টের পৃথক চার বেঞ্চে ২০১৮ সালে নথিভুক্ত হওয়া ডেথ রেফারেন্স মামলার শুনানি চলছে বলে সুপ্রিম কোর্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে ব্যক্তিক্রমও রয়েছে। আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর মামলার ক্ষেত্রে অনেক সময় অগ্রাধিকারভিত্তিতে পেপারবুক তৈরি ও শুনানির নজিরও রয়েছে হাই কোর্টে। সুপ্রিম কোর্টের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত হাই কোর্টে বিচারাধীন ডেথ রেফারেন্সের সংখ্যা এক হাজার ২৭২টি। এদিকে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন জানিয়েছে, আসন্ন ঈদুল আজহার পর সুপ্রিম কোর্টের নিয়মিত কার্যক্রম শুরু হলে নারী ও শিশুর প্রতি নৃশংসতার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানিতে বিশেষ বেঞ্চ গঠনের পরিকল্পনা নিয়েছেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের মুখপাত্র ও স্পেশাল অফিসার মো. মাজহারুল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ডেথ রেফারেন্স শুনানির জন্য বর্তমানে হাই কোর্ট বিভাগে আলাদা চারটি বেঞ্চ রয়েছে। তিনি বলেন, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির জন্য বিশেষ বেঞ্চ গঠনের পরিকল্পনা নিয়েছেন প্রধান বিচারপতি। ঈদের পর সুপ্রিম কোর্টের নিয়মিত কার্যক্রম শুরু হলে এই বিশেষ বেঞ্চ গঠন করা হতে পারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন এমপি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, কারও কোনো সাজা হলে আপিল বিভাগে আসার পর সেই শুনানি হতে কত বছর লাগবে, কেউ জানেন না। এজন্য সরকারের আশ্বাসেও মানুষ এখন আর বিশ্বাস করছে না। তাই নারী ও শিশু নির্যাতনসহ স্পর্শকাতর ঘটনাগুলো নিয়ে বিশেষ বেঞ্চ তৈরি করতে হবে। তাহলেই তাড়াতাড়ি আপিল নিষ্পত্তি হবে। চাঞ্চল্যকর মামলার বিচারকাজ দ্রুত শেষ করতে বিশেষ বেঞ্চ গঠনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের মামলার বিশাল জট কমাতে উচ্চ আদালতে অবিলম্বে বিচারক নিয়োগ, মিথ্যা মামলা বন্ধ এবং হয়রানির শিকার নির্দোষ ব্যক্তিদের জন্য ‘ক্ষতিপূরণ বোর্ড’ গঠন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দ্রুত বিচার নিশ্চিতে পুলিশি তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা দূর করতে হবে।

উচ্চ আদালতে বিচারক সংকটের কথা তুলে ধরে মাহবুব উদ্দিন বলেন, বিচারকের স্বল্পতার কারণে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ অনেকটা স্থবির হয়ে গেছে। আগে আপিল বিভাগে তিনটি বেঞ্চ থাকলেও এখন মাত্র একটি বেঞ্চ দিয়ে কাজ চলছে। হাই কোর্টে কারও জামিন হলে এবং চেম্বার জজ তা স্থগিত করলে সাত-আট বছর ধরে সেটার আর শুনানি হচ্ছে না। এ কারণে মানুষের বিচার পেতে দেরি হলে তা দুর্নীতির জন্ম দেয়। তাই কমপক্ষে দুটি বা তিনটি বেঞ্চ যেন করা যায়, সেজন্য আপিল বিভাগকে দ্রুত বিচারপতি নিয়োগ করতে হবে। জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) সভাপতি অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, মামলাজট কমানো না গেলে কোনো বিচারই চূড়ান্তভাবে দ্রুত পাওয়া যাবে না। তিনি বলেন, দুই একটি ঘটনার পর অধস্তন আদালতে দ্রুত বিচারের নজির দেখা যায়। তবে এটি স্বল্পমেয়াদি কাজ। সব মামলার ক্ষেত্রেই যেন নির্ধারিত সময়ে দ্রুত বিচার পাওয়া যায়, সে ব্যবস্থা নিতে হবে। এটা হবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।