এক-এগারো পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের পুরো সময় জুড়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ ও উষ্ণ। তবে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের নানা জটিলতায় অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে সেই সম্পর্কে তৈরি হয় টানাপড়েন, অবিশ্বাস ও দূরত্ব। রাজনৈতিক সরকার আসার পর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং আঞ্চলিক সমীকরণের কারণে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে নতুন করে উদ্যোগী হয়েছে বাংলাদেশ ও ভারত। বিএনপি সরকারের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’- নীতিকে সামনে রেখে নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে গুরুত্ব দিচ্ছে ঢাকা।
অন্যদিকে বাংলাদেশকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও পাকিস্তানের বাড়তি কূটনৈতিক তৎপরতা ও নিজেদের নিরাপত্তা বিবেচনায় নিয়ে সতর্ক কৌশলে এগোচ্ছে দিল্লি। অন্তর্বর্তী আমলে নানা টানাপড়েনের সময় বারবার নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে ভারত। যদিও বাস্তবতা হলো সম্পর্ক এক পা এগোলে দুই পা পিছিয়ে যাওয়ার মতো।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এমন পরিস্থিতির পেছনে বড় কারণ আস্থার সংকট। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক অনেকটাই ‘অ্যাকশন ও রিঅ্যাকশন’-এর ধারায় পরিচালিত হচ্ছে। ভারত বাংলাদেশের প্রতি যে কূটনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করছে, তার প্রতিক্রিয়ায় ঢাকাও নিজেদের অবস্থান নির্ধারণ করছে। ফলে দুই দেশের সম্পর্কে কিছুটা স্থিতিশীলতা দেখা গেলেও জটিলতা থেকে যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুই দেশের সম্পর্ক এক পর্যায়ে তলানিতে গিয়ে ঠেকে। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে পারস্পরিক অবিশ্বাস, একে অপরকে দোষারোপ এবং দুই দেশের ‘ভারতবিরোধী’ ও ‘বাংলাদেশবিরোধী’ রাজনৈতিক বক্তব্যকে দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীকে ভারতে আশ্রয় নেয়ার বিষয়টিও দিল্লির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কে তিক্ততা বৃদ্ধির কারণ বলে মনে করেন তারা।
সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে সচেষ্ট দিল্লি: বিএনপিকে ঘিরে ভারত সরকারের তরফে নেয়া সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বেশকিছু উদ্যেগ ইতিবাচকভাবে বিবেচিত হচ্ছে। গত ডিসেম্বরে দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসিত জীবন শেষে ঢাকায় ফেরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর ইতিবাচক বার্তা দেয় ভারত। এছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তারা আনুষ্ঠানিকভাবে শোক জানায়। দিল্লির পক্ষ থেকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ঢাকায় অনুষ্ঠিত জানাজা প্রাঙ্গনে উপস্থিত হন এবং তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর তারেক রহমানকে তাৎক্ষণিক অভিনন্দন জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। একই সঙ্গে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা ঢাকায় এসে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তার কাছে মোদির চিঠি হস্তান্তর করেন। এছাড়া বর্তমানে ভারতীয় গণমাধ্যমেও বিএনপি সরকারের প্রতি তুলনামূলক ইতিবাচক অবস্থান দেখা যায়। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর দুই দেশের মধ্যে স্থবির হয়ে পড়া ভিসা কার্যক্রম পুনরায় চালুর বিষয়ে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসা ও পর্যটনের প্রয়োজনে উভয় দেশই ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার ইঙ্গিত দিয়েছে।
বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্য বড় বাধা: সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা হাজির হয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি তথা বিজেপি’র উত্থানের পর বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্য আরও বাড়ছে। এ বিষয়ে সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস)-এর নির্বাহী পরিচালক এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পারভেজ করিম আব্বাসী মানবজমিনকে বলেন, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তথাকথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’- ইস্যুটি দীর্ঘদিন ধরেই ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষ করে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশি হিসেবে চিত্রিত করে রাজনৈতিক প্রচারণা চালানো হয়েছে। রাজনৈতিক এসব বক্তব্যের ফলে দিল্লির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক এগিয়েও থমকে যাচ্ছে বলে মনে করেন মি. আব্বাসী।
তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্য এবং শেখ হাসিনার প্রতি প্রকাশ্য সহানুভূতি দুই দেশের সম্পর্কের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। একই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে ভোটার তালিকা থেকে বহু মুসলিম নাগরিকের নাম বাদ পড়া নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে উদ্বেগ বাড়ছে এবং কূটনৈতিক পর্যায়েও প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে। কূটনৈতিক বিশেজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সম্পর্ককে শুধু রাষ্ট্রীয় কূটনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা যায় না। এক্ষেত্রে দুই উভয় অঞ্চলের ভাষা, সংস্কৃতি ও পারিবারিক যোগাযোগের একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। ফলে অনেকে কেন্দ্র তথা নয়াদিল্লির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক পশ্চিমবঙ্গ বা কলকাতার এই দিক থেকে চিন্তা করেন। যা ভুল। বাস্তবতা হলো- এ দুই দেশের সম্পর্ক পরিচালিত হয় ‘ঢাকা-দিল্লি’ কাঠামোর মধ্য দিয়ে। কারণ ভারতের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করে কেন্দ্রীয় সরকার।
যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও পাকিস্তান ফ্যাক্টর: ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভেতরে শুধু কূটনীতি নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং বৈশ্বিক ভূরাজনীতিও সক্রিয়ভাবে কাজ করে। বিশেষ করে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দিল্লি সতর্কভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রেখেছে। ভারতের নীতি-নির্ধারকদের বড় একটি অংশের উদ্বেগ হলো- বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাড়ছে কিনা। কারণ দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী উপস্থিতির বিষয়ে ভারত সবসময়ই শঙ্কিত। একই সঙ্গে চীনকে নিয়েও ভারতের উদ্বেগ রয়েছে।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দিল্লিতে এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, বাংলাদেশ হয়তো আরও বেশি চীনের দিকে ঝুঁকতে পারে। বিশেষ করে তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পে চীনের সম্ভাব্য অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সম্পৃক্ততা ভারতের জন্য মাথা ব্যাথার কারণ। কেননা এই প্রকল্প এলাকা ভারতের শিলিগুড়ি করিডরের কাছাকাছি। এছাড়া বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের সামপ্রতিক উষ্ণতাকেও ভারত সতর্কভাবে দেখছে।
অন্যদিকে সামপ্রতিক সময়ে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন রাজা নাকভির ঢাকা সফর এবং বিভিন্ন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের বিষয়টি দিল্লি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
এদিকে বাংলাদেশ পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। ফলে ঢাকা-নয়াদিল্লির সম্পর্ক এখন পানি, সংযোগ, সীমান্ত নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের মতো ইস্যুগুলোকে সামনে রেখেই এগোবে বলে মনে করা হচ্ছে। এ বিষয়ে বিশ্লেষক পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘ স্থলসীমান্ত রয়েছে এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কও গভীর।
বাংলাদেশ ভারতের অন্যতম বড় বাণিজ্য অংশীদার হলেও বাণিজ্য ঘাটতির বিষয়টি এখনো ঢাকার জন্য বড় উদ্বেগ। তার মতে, সম্পর্ক স্থিতিশীল হলে দুই দেশের জনগণই অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে। তবে এজন্য পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি এবং সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেয়া জরুরি।