Image description

দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি কৃষি। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখা এবং কর্মসংস্থান তৈরিতে এ খাতের ভূমিকা অপরিসীম। অথচ জাতীয় বাজেটে কৃষির অংশীদারত্ব বছর বছর কমছে। গত ১৪ অর্থবছর ধরে মোট বাজেটের ১০ শতাংশের নিচেই রয়েছে কৃষি খাতের বরাদ্দ। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে মাত্র ৫ দশমিক ৯ শতাংশে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষিতে এই ধারাবাহিক অবহেলা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষকের আয় এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কৃষিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বরাদ্দ, ভর্তুকি, গবেষণা, যান্ত্রিকীকরণ এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সংস্কার আনার দাবি উঠেছে।

আগামী ১১ জুন ঘোষণা হতে যাচ্ছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। সম্ভাব্য বাজেটের আকার ধরা হচ্ছে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কমে যাওয়া বিনিয়োগ, দুর্বল কর্মসংস্থান এবং খাদ্যপণ্যের বাজার অস্থিরতার মধ্যে এবারের বাজেটে কৃষি খাতকে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব না দিলে অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।

কৃষির গুরুত্ব বাড়লেও কমছে বাজেট

বাংলাদেশের জিডিপিতে কৃষির অবদান প্রায় ১১ শতাংশ। দেশের মোট কর্মশক্তির প্রায় ৪০ শতাংশ এবং গ্রামীণ নারীদের প্রায় ৬০ শতাংশ কোনও না কোনোভাবে কৃষির সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু বাজেটে কৃষির অংশ ক্রমেই সংকুচিত হয়েছে।

২০১১-১২ অর্থবছরে মোট বাজেটের ১০ দশমিক ৬৫ শতাংশ কৃষিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এরপর ধারাবাহিকভাবে কমতে কমতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৭ শতাংশে। চলতি অর্থবছরে তা আরও কমে ৫ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে এসেছে। চলতি অর্থবছরে কৃষি বিষয়ক পাঁচটি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৬ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরাসরি শস্য খাতে বরাদ্দ ২৭ হাজার ২২৪ কোটি টাকা—যা মোট বাজেটের মাত্র ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ। অপরদিকে কৃষি ভর্তুকির পরিমাণও কার্যত স্থবির। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষি ভর্তুকি ছিল ১৭ হাজার ২৬১ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ২৪১ কোটি টাকায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মোট বাজেটের আকার যেভাবে বেড়েছে, কৃষি খাতের বরাদ্দ ও ভর্তুকি সেই হারে বাড়েনি। ফলে কৃষির বাস্তব চাহিদা ও বাজেটের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কৃষিই প্রধান ভরসা

দেশে গত চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি স্থায়ী রূপ নিয়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ১০ শতাংশের ওপরে ছিল। যদিও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কিছুটা কমেছে, তবু এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি এখনও অন্যতম উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, খাদ্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের একমাত্র টেকসই উপায় হলো কৃষি উৎপাদন বাড়ানো। কিন্তু কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।

২০০৯-১০ অর্থবছরে কৃষি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ। বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ২ দশমিক ৪ শতাংশে। এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কৃষি প্রবৃদ্ধি অন্তত ৪ থেকে ৫ শতাংশে উন্নীত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘কৃষিতে ভর্তুকি ব্যয় নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। কৃষিতে বিনিয়োগ কমলে উৎপাদন কমবে, আমদানি নির্ভরতা বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে।’’

৯.৫ শতাংশ বরাদ্দের দাবি

বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতি আসন্ন বাজেটে কৃষি খাতে মোট বাজেটের অন্তত ৯ দশমিক ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। সম্ভাব্য ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেট বিবেচনায় এ বরাদ্দ দাঁড়াবে প্রায় ৮৮ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা।

সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলে অনুষ্ঠিত “জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: বাংলাদেশে কৃষির টেকসই উন্নয়নের রূপরেখা” শীর্ষক সেমিনারে এ দাবি তুলে ধরা হয়। সেমিনারে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, কৃষি কার্ড, কোল্ড চেইন, কৃষি বিমা, জলবায়ু সহনশীল কৃষি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, রফতানি জোন এবং কৃষি উদ্যোক্তা তৈরিতে বড় বিনিয়োগের সুপারিশ করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষিতে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, উৎপাদনের সঙ্গে সংরক্ষণ, বাজার ব্যবস্থাপনা ও মূল্য সংযোজন শিল্পও গড়ে তুলতে হবে।

কৃষক উৎপাদন বাড়াচ্ছেন, লাভ পাচ্ছেন না

বাংলাদেশ এখন ধান, সবজি, মাছ, ভুট্টা ও আলু উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু কৃষক এখনও ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত। ধান কাটার মৌসুমে কৃষক নগদ অর্থের চাপে কম দামে ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হন। অপরদিকে মধ্যস্বত্বভোগী ও আড়তদাররা সেই পণ্য মজুত করে পরে বেশি দামে বিক্রি করেন। ফলে উৎপাদক ও ভোক্তা—উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিপণ্যের বাজারে সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ বাড়াতে হবে। সরকারি ক্রয় কার্যক্রম ডিজিটাল করতে হবে এবং কৃষকের ব্যাংক বা মোবাইল অ্যাকাউন্টে সরাসরি অর্থ পাঠানোর ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
তারা বলছেন, কৃষক কার্ডের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র ও জমির তথ্য সংযুক্ত করে একটি জাতীয় কৃষক ডাটাবেজ তৈরি করা জরুরি। এর মাধ্যমে প্রকৃত কৃষককে শনাক্ত করা এবং সরাসরি সহায়তা দেওয়া সহজ হবে।

হাওর, উপকূল ও জলবায়ু ঝুঁকিতে বাড়তি নজর প্রয়োজন

চলতি বছর আগাম বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে হাওর অঞ্চলের বড় অংশের বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে খাদ্য উৎপাদন ও কৃষকের আয় উভয়ই চাপের মুখে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষি এখন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ খাতগুলোর একটি। তাই হাওর, উপকূল ও খরাপ্রবণ অঞ্চলের জন্য বিশেষ বাজেট ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন পরিকল্পনা প্রয়োজন। তারা বন্যা সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন, কৃষি বিমা চালু, জরুরি ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠন এবং দুর্যোগকালীন সহায়তা কাঠামো শক্তিশালী করার সুপারিশ করেছেন।

যান্ত্রিকীকরণে নেই গতি

উৎপাদন খরচ কমাতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে কয়েক বছর আগে শুরু হওয়া কৃষিযন্ত্রে ভর্তুকি প্রকল্প কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউনিয়নভিত্তিক কৃষিযন্ত্র ব্যাংক গড়ে তোলা গেলে ক্ষুদ্র কৃষকরাও কম খরচে আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করতে পারবেন। পাশাপাশি দেশীয়ভাবে কৃষিযন্ত্রের যন্ত্রাংশ উৎপাদনে কর রেয়াত ও প্রণোদনা দিলে আমদানি নির্ভরতা কমবে।

গবেষণা ও সংরক্ষণে বড় ঘাটতি

বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষি গবেষণায় সরকারি বিনিয়োগ এখনও অত্যন্ত কম। বর্তমানে কৃষি-জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ গবেষণায় ব্যয় হয়, যেখানে অনেক দেশে তা ৩ থেকে ৫ শতাংশ।

একইসঙ্গে দেশে কৃষিপণ্য সংরক্ষণের সক্ষমতাও সীমিত। বর্তমানে সরকারি খাদ্য গুদামের ধারণক্ষমতা প্রায় ২২ লাখ টন। অথচ প্রয়োজন কমপক্ষে ৬০ লাখ টন ধারণক্ষমতা। কোল্ড স্টোরেজ, আধুনিক গুদাম ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প না থাকায় প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ফল, সবজি ও কৃষিপণ্য নষ্ট হচ্ছে।

কাঠামোগত পরিবর্তনে বাড়ছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের গুরুত্ব

বাংলাদেশের কৃষিতে এখন বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটছে। স্বাধীনতার পর কৃষি-জিডিপিতে শস্য খাতের অংশ ছিল ৭৫ শতাংশের বেশি। বর্তমানে তা কমে প্রায় ৪৬ শতাংশে নেমে এসেছে। অপরদিকে মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও বনজ খাতের অংশ বাড়ছে। মানুষের আয় বৃদ্ধির সঙ্গে খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন এসেছে। ফলে মাছ, মাংস, দুধ ও ডিমের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। তবে উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় এসব পণ্যের দাম এখনও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। বিশেষ করে পশুখাদ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে পোলট্রি ও দুগ্ধ খাত চাপে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফিড, ওষুধ ও উৎপাদন উপকরণে সহায়তা বাড়ানো না গেলে প্রাণিসম্পদ খাতে স্থিতিশীলতা আসবে না।

কৃষিবান্ধব বাজেট কতটা সম্ভব

অর্থনীতিবিদদের মতে, এবারের বাজেটের বড় চ্যালেঞ্জ হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আর এই তিন ক্ষেত্রেই কৃষি সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
তারা বলছেন, একটি বাস্তবমুখী কৃষিবান্ধব বাজেটের জন্য কয়েকটি বিষয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে—কৃষি খাতে মোট বাজেটের অন্তত ১০ শতাংশ বরাদ্দ, কৃষি ভর্তুকি ৪০ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে বাজার সংস্কার, কৃষি গবেষণা ও জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ, কোল্ডচেইন ও সংরক্ষণ অবকাঠামো গড়ে তোলা, কৃষি বিমা ও দুর্যোগ তহবিল চালু। কৃষকভিত্তিক ডিজিটাল ডাটাবেইজ তৈরি এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প ও রফতানিতে প্রণোদনা বৃদ্ধি।

বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, কৃষক শুধু খাদ্য উৎপাদন করেন না—দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ভিতও রক্ষা করেন। তাই বাজেটে কৃষিকে প্রান্তিক না রেখে কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার দেওয়াই এখন সময়ের দাবি।