ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কোরবানির জন্য গরু কিনেছিলেন তারা। পরিকল্পনা ছিল পরিবারের সবাই মিলে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করবেন, কোরবানি দেবেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, সেই গরু আজও উঠানে বাঁধা থাকলেও তার মালিকরা আর ফিরে আসবেন না। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন একই পরিবারের চার সদস্য।
আজ রবিবার দুপুরে মাদারীপুর সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের বালিয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায় এই দৃশ্য। উঠানে বাঁধা রয়েছে কোরবানির গরু। আর বাড়ি জুড়ে চলছে স্বজন হারানোর আহাজারি। কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পুরো পরিবেশ।
নিহতরা হলেন বালিয়া গ্রামের হাজী আব্দুল ওয়াহেদ মোল্যার ছেলে জাহাঙ্গীর মোল্লা, তার স্ত্রী বেলি বেগম, জাহাঙ্গীরের মেজ ভাই আলমগীর মোল্লা এবং আলমগীরের স্ত্রী খুশি বেগম।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আলমগীর মোল্লা অসুস্থ হয়ে পড়লে আজ সকালে তাকে মাদারীপুর সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে করে ফরিদপুরের উদ্দেশে রওনা হন।
পথে ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার শংকরপাশা এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা বরিশালগামী একটি বিআরটিসি বাসের সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই অ্যাম্বুলেন্সচালকসহ পাঁচজন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের চার সদস্য ছিলেন।
দুর্ঘটনার খবরে মুহূর্তেই শোক নেমে আসে বালিয়া গ্রামে। যে বাড়িতে ঈদের প্রস্তুতি চলছিল, সেখানে এখন শুধুই কান্না আর শোকের মাতম। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের ভিড়ে ভারী হয়ে উঠেছে বাড়ির আঙিনা।
নিহতদের খালাতো বোন শিউলি বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে, ‘ওরা সব সময় একসঙ্গে ঈদ করত। এবারও কোরবানির জন্য গরু কিনেছিল। কিন্তু সেই গরু উঠানে রয়ে গেছে, আর ওরা ফিরছে লাশ হয়ে। এমন দৃশ্য আমরা কখনো কল্পনাও করিনি।’
নিহতের ভাতিজা হাসান মোল্লা বলেছেন, ‘একসঙ্গে পরিবারের চারজন মানুষকে হারিয়েছি। এই শোক ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। বেপরোয়া গাড়ি চালানোর কারণেই আজ আমাদের এই ক্ষতি। আমরা এই ঘটনার বিচার চাই।’
মাদারীপুর সদর থানার ওসি মো. আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, ‘ফরিদপুরের ভাঙ্গায় সড়ক দুর্ঘটনায় মাদারীপুরের একই পরিবারের চারজনের মৃত্যুর খবর পেয়েছি। শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই। পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ এলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ঈদের আনন্দকে ঘিরে যে বাড়িতে ছিল উৎসবের প্রস্তুতি, সেখানে এখন শোকের ছায়া। উঠানে বাঁধা কোরবানির গরুটি যেন নীরবে সাক্ষ্য দিচ্ছে একটি পরিবারের অপূর্ণ থেকে যাওয়া স্বপ্নের।