Image description

সুস্থ হয়েও পাবনা মানসিক হাসপাতালের চার দেয়ালে বন্দি ওদের জীবন, ওদের ঈদের আনন্দ। বছরের পর বছর ওদের ছন্দহারা জীবন থেকে হারিয়ে গেছে সোনালি দিনগুলো।

 

কারো কারো জীবন থেকে হারিয়ে গেছে সব স্বপ্ন। তাদের যেন নেই কোনো আপনজন, নেই কোনো আত্মীয়স্বজন। কেননা সুস্থ হয়েও যারা নিজের আপনজনদের কাছে যেতে পারেননি। এদের মধ্যে কেউ কেউ আপনজনের ঠিকানায় ফিরছেন লাশ হয়ে।

পাবনা মানসিক হাসপাতাল সূত্র জানায়, বিগত ৪০ বছর ধরে অন্তত ৪৫ জন রোগী সুস্থ হওয়ার পরও আপনজনের কাছে যেতে পারেননি। সুস্থ হওয়ার পরও আপনজনরা গ্রহণ না করায় বা তাদের খুঁজে না পাওয়ায় পাবনা মানসিক হাসপাতালে এক প্রকার বন্দি জীবন কাটান তারা।

সূত্রমতে, এসব রোগীর অধিকাংশ ক্ষেত্রে পারিবারিক সম্পত্তি দখল অথবা সামাজিক লজ্জার ভয়ে রোগীদের এভাবে ফেলে যাওয়া হয়। অনেকে ইচ্ছা করেই ভুল ঠিকানা বা ভুল নাম্বার দিয়ে ভর্তি করান যাতে রোগী সুস্থ হলেও তাকে আর ফেরত নিতে না হয়। এজন্য সুস্থ হয়েও তারা দীর্ঘদিন এখানেই থাকতে বাধ্য হন। এ অবস্থায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে আবারও অসুস্থ হয়ে পড়েন। এদের মধ্যে এখনো ফেরার অপেক্ষার মিছিলে রয়ে গেছেন ৯ জন। তারা যেন সবাই জীবন্ত লাশ।

এদের মধ্যে হাসপাতালের ৫ নাম্বার ওয়ার্ডের সাইদ হোসেন (৫৬) ভর্তি হন ১৯৯৬ সালে। ঢাকার মগবাজার নয়াটোলার ঠিকানা দিয়ে ভর্তি হওয়া সাইদ সুস্থ হলেও ৩০ বছর ধরে এই হাসপাতালই তার ঠিকানা।

জানা গেছে, বিয়ের পরপরই অসুস্থ হয়ে পাড়েন সাইদ। এরপর পাবনা মানসিক হাসপাতালে ভর্তির পর স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যান। এরপর আপনজনরাও আর কেউ খোঁজ নেয়নি।

একই করুণ দশা বদিউল আলমের। ২০০৫ সালে মাত্র ৩০ বছর বয়সে হাসপাতালে ভর্তি হন বদি। সুস্থ হওয়ার পর তাকে বাড়ির ঠিকানায় (মধ্য বাসাবো, ঢাকা) পাঠানো হলেও ভুল ঠিকানার কারণে তাকে আবার ফেরত আনা হয়। অভিমানে এখন সে একদম চুপ হয়ে গেছে।

মিরপুর বাংলা কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করা কাজী আকরামুল জামান ১৯৯৪ সাল থেকে এখানে। পরিবার ভুল ঠিকানা দিয়ে তাকে ফেলে গেছে। নারায়ণগঞ্জের আশরাফ উদ্দিন ওরফে বিদ্যুতের গল্পটি আরও করুণ। সুস্থ হওয়ার পর ২০১৫ সালে তাকে সশরীরে বাড়ির সামনে নিয়ে যান হাসপাতালের কর্মীরা; কিন্তু স্বজনরা ঘরের দরজা খোলেননি। শেষপর্যন্ত পুলিশ নিয়ে গিয়েও তাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হয়নি।

নাজমা নিলুফার নামের এক রোগী ১৯৮৯ সাল থেকে এখানে চিকিৎসাধীন। এর আগে মাহবুব আনোয়ার ও ছকিনা নামে দুই রোগী ২০ ও ১২ বছর হাসপাতালে কাটিয়ে ২০১৫ সালে এখানেই মারা যান।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত আড়াই বছরে পাবনা মানসিক হাসপাতালে কমপক্ষে ২৫ জন রোগী মারা গেছেন। এদের মধ্যে ২০২৩ সালে ১০ জন, ২০২৪ সালে ১০ জন, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত মারা গেছেন ১০ জন। এছাড়া ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মারা যান নাইমা চৌধুরী।

তবে বেসরকারি হিসেবে এ সংখ্যা আরও বেশি হবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

এ বছরের ৫ জানুয়ারি মারা যান নাইমা চৌধুরী। চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে একবুক প্রতীক্ষা নিয়ে পথ চেয়ে থাকেন আপনজনরা এসে নিয়ে যাবেন বলে; কিন্তু কেউ তাকে নিয়ে যাননি। মারা যাওয়ার ৫ দিন পর ১০ জানুয়ারি নাইমা চৌধুরীর সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে। এদিন তার এক ভাই এসে তাকে নিয়ে যান।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০৯ সালের ১৪ নভেম্বর মাত্র ২৫ বছর বয়সে নাইমা চৌধুরীকে পাবনা মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন তার স্বজনরা। তখন তিনি ছিলেন প্রাণচঞ্চল এক তরুণী। নথিতে নাইমার বাবার নাম মজিবুল হক চৌধুরী এবং ভাইয়ের নাম মো. হাবিব উল্লেখ আছে। ঠিকানা দেওয়া হয়েছিল ঢাকার কেরানীগঞ্জের আশরাফবাদের আহসানবাদ গ্রাম।

হাসপাতালের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মাসুদ রানা জানান, মানসিক রোগীরা সুস্থ হয়ে বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সাপোর্ট পান না, বরং তাদের অবহেলা করা হয়। এতে তারা আবারও ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন।

তিনি বলেন, মানসিক রোগীদের পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সবদিকে পুনর্বাসন করতে হবে।