ফাইজ তাইয়েব আহমেদ
দুই পত্রিকার মালিক/প্রকাশক পক্ষের পুরানা রেষারেষি নতুন করে শুরু হয়েছে। থলের কিছু বেড়াল বেরিয়ে আসুক। এক পক্ষ অন্যের সার্কুলেশন সংখ্যা নিয়ে আলাপ তুলেছে। এটা সত্য যে, বাংলাদেশের পত্রিকার সার্কুলেশন সংখ্যা জালিয়াতিপূর্ণ। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় যে সংখ্যা দেখায় তা প্রায় ৩ গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেখানো বলে অভিযোগ আছে। এসব অভিযোগ তদন্ত দরকার। এক লাখ সার্কুলেশন নাই এমন পত্রিকা দেখায় প্রায় ৩ লাখ, এমনটা চলছে। প্রচার সংখ্যায় দশের কাছাকাছি বা বাইরে হয়েও টাইটেলে লিখে 'প্রচার সংখ্যায় শীর্ষে'। তাহলে ভোক্তা হিসেবে পাঠকের অধিকার কই? সেতো টাকা দিয়ে পত্রিকা কিনে!
সরকারি বিজ্ঞাপন, বিভিন্ন দিবসের ক্রোড়পত্র, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক দরপত্রের বিজ্ঞাপন কিংবা বিভিন্ন নোটিশ, এবং নিউজ পেপার আমদানির শুল্ক ছাড় ও কোটা, প্রেসের মেশিনারি ও স্পেয়ার পার্টস-আমদানিতে বিভিন্ন ধরনের শুল্ক ও কর ছাড়া আদায় অব্যাহত রাখতে মিডিয়ার মাফিয়ারা পত্রিকার সার্কুলেশন সংখ্যা ঠিক করতে দেয় না। এখানে নামিদামি সব পত্রিকা জড়িত। মন্ত্রণালয় যেন এখানে অসহায়।
বাংলাদেশের মিডিয়া মালিক, প্রকাশক ও সম্পাদকদের আয়কর ফাইল, ভ্যাট, ভর্তুকি ও শুল্কছাড়ের ফাইল টানলে অনেক কিছু বেরিয়ে আসবে।
পত্রিকার সার্কুলেশন সংখ্যা প্রায় তিন গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেখানোর প্রক্রিয়া বন্ধ করে বাস্তব সংখ্যা প্রকাশ করলে, আমদানি শুল্ক ও সুবিধা গুলো অডিট করলে, মিডিয়া মালিক/প্রকাশক ও সম্পাদকদের ভর্তুকির যে অংশ সাশ্রয় হবে, তা সাংবাদিক কল্যাণ কিংবা সাংবাদিক ট্রেনিং এ ব্যয় করা যাবে, এবং এটাই হবে উত্তম পথ।
আমরা দায়িত্বকাল সময়ে মন্ত্রণালয়ে ২টা বাংলা ক্রোড়পত্র/বিজ্ঞাপন আওয়ামী সময়ে বঞ্চিত ২টা সংবাদপত্রকে কেন দেওয়া হলো, তা নিয়ে ঐ এলিট সম্পাদক আমার উপর নাখোশ হয়েছেন। অথচ একই মালিক পক্ষের ইংরেজি পত্রিকায় ক্রোড়পত্র দেওয়া হয়েছিল। তারা এলিট মিডিয়া এবং বাংলা-ইংরেজি সব খেতে চায়।
আপনি সাংবাদিকদের ওয়েজ ৭ম ও ৮ম বোর্ডের কথা জিজ্ঞেস করুন। সর্বশেষ অষ্টম ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন হলে সাংবাদিকদের বেতন ও ভাতা কিছু বাড়ে। কিছু সম্পাদকের চক্র রিট করে সেটা আটকে দিয়েছে। প্রায় হাফ ডজন উপদেষ্টাকে তদবির করে ওয়েজ বোর্ড বাদ দিতে কাজ করেছে। এবং ভয়ংকর কথা হচ্ছে, ব্যক্তি সাংবাদিকদের কেউ ফলে সম্পাদক চক্রের সিন্ডিকেট নিয়ে আলাপ তুলতে পারে না, কারণ তাকে এলিট মহল থেকে খারিজ করে দেওয়া হবে এই ভয়ে। খোঁজ করে দেখেন, কয়টা হাউজ কর্মীদের শতভাগ বেতন ও বোনাস ঈদের আগে পরিশোধ করেছে? তাহলে গারমেন্টস ব্যবসায়ী, পত্রিকার প্রকাশক/সম্পাদকের মধ্যে পার্থক্য রইলো কই?
পত্রিকায় আইটি ও ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন একটি বড়ো ব্যয়ের খাত। অবাক হবেন, এসবে বিনিয়োগের আড়ালে পত্রিকার মালিক/প্রকাশক/সম্পাদকরা অর্থ পাচারের লিপ্ত আছেন, এমন অভিযোগও আছে।
দুই ,
টিভি টিআরপির মেজারমেন্ট পদ্ধতির বিষয়ে শুনলে আপনারা অবাক হবেন। ৫০০ জায়গায় বসানো আছে। টিভি কোম্পানিগুলো ঐ লোকেশন গুলার তথ্য টাকা দিয়ে জেনে নিয়েছে। সেখানে গ্রাহকদের টাকা দিয়ে ঐ টিভি চ্যানেল সারাদিন চালু রাখে, যাতে তাদের টিআরপি বেশি দেখায়। মিডিয়া মালিকদের জালিয়াতির মাত্রা নেহায়তে কম নয়।
বিদেশে স্যাটেলাইট টিভি, ক্যাবল টিভি কিংবা আইপি টিভির ক্ষেত্রে সেট-টপ বক্স বাধ্যতামূলক। এতে পাইরেসি ও কপিরাইট আইন ভাঙার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া যায়। বাংলাদেশের ওটিটি, আইপিটিভি, ক্যাবল চ্যানেল এরা সবাই পাইরেসিতে লিপ্ত। ক্রিয়েটিভ হাউজ, কপিরাইট রিস্পেক্ট করে এমন প্রতিষ্ঠান, স্বত্ত্ব কেনা স্পোর্টস চ্যানেল গুলা ক্ষতিগ্রস্ত। ভারতীয় টিভি রয়ালিটি পায় কিংবা দেশের টিভিগুলা পায় না। পোর্টাল, ওটিটি ও আইপিটিভি দেশীয় মেধাস্বত্ত ভঙ্গ করে, পাইরেসি করে। ফলে শিল্প, সিনেমা, বিনোদন খাত গ্রো করছে না।
এখানে গ্রে এরিয়া শুধু বাড়ছেই। বেতন-ভাতা ঠিকঠাক পায় না বলেন, আজকের ব্যাপকসংখ্যক সাংবাদিকের মূল কাজ চাঁদাবাজি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, তদবির, পিআর এর নামে দুর্নীতির অর্থে ভাগ বসানো, ইনাদের সাইড কাজ হয়ে গেছে সাংবাদিকতা। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করতে গিয়ে, বড়ো জালিয়াতির সন্ধান পেয়ে ব্যবসায়ীর সাথে আঁতাত করে গড়ে উঠছে নতুন নতুন মিডিয়া। এবং দিনশেষে হারিয়ে যাওয়া।
পাশাপাশি,
তথ্য মন্ত্রণালয়ের অনেক কাজ বাকি। দেশের ওটিটি নীতিমালা, সম্প্রচার নীতিমালা নাই। এই দুটা নীতিমালা নিয়ে বিটিআরসি/পিটিয়ে এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে বৈরিতা চলছে। আমি দুই উপদেষ্টার কাছে ৫ বার গিয়েও এখান থেকে কাজ আদায় করতে পারিনি। একটি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী/উপদেষ্টা ও বিশেষভাবে সচিব না চাইলে, সচিব কাজ না আগালে এসব নিষ্পত্তি অসম্ভব। একদিকে মিডিয়ার নৈরাজ্য, অন্যদিকে দেশের রাজস্ব ক্ষতি। আফসোস।
স্যাটেলাইটের ৫টা ট্রান্সপন্ডার ফাঁকা। বিটিভির ডিটিএচ করার কাজ সচিবালয়ে আটকে আছে বছরের পর বছর। আইপি টিভির লাইসেন্স ১৫টা আছে, কিন্তু অবৈধ আছে কয়েক ডজন, তারাই ডোমিনেট করে।
দেশে ট্রিপল প্লে, কোয়াড প্লে নাই। আমি বিটিসিএল এর ভয়েস (এমভিএনও সও)/ইন্টারনেট/কন্টেন্ট ট্রিপল-প্লে লাইভ পাইলট করে দিয়ে এসেছি। কোনো অজ্ঞাত কারণে আমি আসার পরে বন্ধ করে দিয়েছে।
দরকার হচ্ছে, আইএসপি কোম্পানিগুলোকে ট্রিপল-প্লের লাইসেন্স দেয়া, ক্যাবল টিভিদের আইএসপি লাইসেন্স দেয়া। অথচ ক্যাবল টিভি, ডায়িং টেকনোলজি। দরকার সবাইকে আইএসপি এবং টিভির লাইসেন্স দিয়ে দেয়া, সেট-টপ বক্স বাধ্যতামূলক করে এন্টি-পাইরেসি মেকানিজম এনশিওর করা। ওটিটি গুলোকে রেগুলেশনে আনার কারিগরি প্রযুক্তি আনা।
আমাদের মন্ত্রণালয় গুলো নতুন প্রযুক্তি, পুরানো প্রযুক্তির এন্ড অফ লাইফ সাইকেল, ডায়িং প্রযুক্তির ট্রানজিশন ও মাইগ্রেশন এগুলো কিছুই বুঝে না। ডজন বার বললেও এসব তাদের মাথার উপর দিয়ে যায়। বাংলাদেশের স্যাটেলাইট টিভির লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে, পুরানা ডিশ বা ক্যাবল টিভির অচল সম্প্রচার নীতি দিয়ে। পুরো টিভি ইন্ডাস্ট্রি আইপি-ফাই হয়ে গেছে, অথচ সম্প্রচার আইনে অনলাইনকে সম্প্রচার বলা যাবে না বলা আছে। এসব নীতি, পলিসি ও প্রযুক্তিগত বিষয়ে সাংবাদিকদের ট্রেনিং নাই বলে লিটারেসিও কম।
টিআরপি মেজারমেন্ট ভুল। পত্রিকার সার্কুলেশন সংখ্যা ভুল। পোর্টাল, ওটিসি, আইপিটিভি রেগুলেশন নাই। পিটিয়ে, বিটিআরসি, বিটিভি, তথ্য মন্ত্রণালয় সবাই রেগুলেটর হতে চায়। হাসান মাহমুদ নিজে জোর করে প্রজ্ঞাপন করে, সম্প্রচারকে এককভাবে তথ্য মন্ত্রণালয়ে এনেছে। কিন্তু রেগুলেশন করার জন্য প্রযুক্তি আনেননি, পাইরেসি ধরার ও বন্ধের মেকানিজম আনেননি। আবার আনলে বিটিআরসি/পিটিডি ও তথ্য কীভাবে কাজ করবে, তার স্কোপ অফ ওয়ার্ক ডিফাইন করেননি।
ওটিটি'তেও স্কোপ ডিফাইন করা দরকার। কাজ করছে না, কিন্তু মন্ত্রণালয় বাড়ছে। রাজস্ব ফাঁকি চলছে। পাইরেসি ও অরাজকতা চলছে। অথচ প্রযুক্তি কনভার্জেন্স এ যাচ্ছে। আমাদের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনার জ্ঞানহীন বা স্বল্পজ্ঞানী কর্তদের কেউ জানে না কীভাবে উন্নত দেশে কিংবা পাশের দেশে এসব ব্যবস্থাপনা হয়, কারও একটা ডিপ স্ট্যাডি নেই।