Image description

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সাথে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগের একমাত্র সঙ্কীর্ণ পথ শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’। এরই মধ্যে ভারত সরকার এক নজিরবিহীন সামরিক ও কৌশলগত অবকাঠামো জোরদারকরণ প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করেছে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নবগঠিত বিজেপি সরকার কেন্দ্রকে এই স্পর্শকাতর অঞ্চলের ১২০ একর কৌশলগত জমি হস্তান্তর করেছে। একই সাথে শিলিগুড়ি ও উত্তরবঙ্গের প্রধান সাতটি মহাসড়কের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেয়া হয়েছে, দিল্লির জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষের (এনএইচএআই) হাতে। ভারতের এই আকস্মিক ও সর্বাত্মক সামরিকায়নে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বড় ধরনের মেরুকরণের ইঙ্গিত মিলছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভারতের এই আগ্রাসী সামরিক অবকাঠামো বৃদ্ধি শুধু চীনের মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নয়, বরং তা প্রতিবেশী বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তাকে এক গভীর ও বহুমাত্রিক ঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছে।

‘চিকেনস নেক’ ও ভারতের নতুন কৌশলগত চাল :

সীমান্তে কাজ করা একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র জানায়, মাত্র ২০ থেকে ২২ কিলোমিটার প্রস্থের এই সঙ্কীর্ণ শিলিগুড়ি করিডোরটি ভারতের মানচিত্রে অন্যতম প্রধান দুর্বলতা বা ‘অ্যাকিলিস হিল’ হিসেবে পরিচিত। উত্তর-পূর্ব ভারতের আটটি রাজ্যকে বিচ্ছিন্ন হওয়া থেকে রক্ষা করতে এই পথটি ভারতের জন্য জীবনরেখা। এত দিন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের আপত্তির কারণে এই অঞ্চলে কেন্দ্রীয় বাহিনীর অবকাঠামো নির্মাণ গতি পায়নি। তবে সম্প্রতি জমি হস্তান্তরের পর বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) অতি দ্রুততার সাথে শিলিগুড়ির ফাঁসিদেয়া এলাকায় ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ১২ ফুট উঁচু নিরেট কাঁটাতারের বেড়া ও অত্যাধুনিক নজরদারি চৌকি নির্মাণের কাজ শুরু করেছে।

গোয়েন্দা সূত্র আরো জানায়, ভারতীয় সেনাবাহিনী করিডোরের স্পর্শকাতর সীমান্ত এলাকাগুলোতে তিনটি নতুন সামরিক গ্যারিসন বা দুর্গ (চোপড়া, কিশানগঞ্জ এবং বামুনি) স্থাপন করেছে। এর মধ্যে চোপড়া সামরিক ঘাঁটিটি বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে এক কিলোমিটারেরও কম দূরত্বের মধ্যে অবস্থিত। এই ঘাঁটিগুলোতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ‘ত্রিশক্তি কোর’ এবং প্যারা স্পেশাল ফোর্সের মতো এলিট ইউনিট মোতায়েন করা হচ্ছে। আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য এই অঞ্চলে ভারতের হাসিমারা বিমানঘাঁটিতে রাফাল ও মিগ যুদ্ধবিমানের স্কোয়াড্রন এবং এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও দূরপাল্লার ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র রেজিমেন্ট সক্রিয় করা হয়েছে।

বাংলাদেশের নিরাপত্তায় যেসব বড় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে :

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, শিলিগুড়ি করিডোরে ভারতের এই সামরিক প্রস্তুতি ও অবকাঠামো উন্নয়ন বাংলাদেশের জন্য সুদূরপ্রসারী ও ভয়াবহ প্রভাব নিয়ে আসতে পারে। এর প্রধান ঝুঁকিগুলোর মধ্যে রয়েছে- বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গভীর নজরদারি ও সার্বভৌমত্বে আঘাত। বাংলাদেশ সীমান্তের ঠিক ওপারে এক কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে চোপড়ায় ভারতীয় সেনাঘাঁটি ও উচ্চপ্রযুক্তির রাডার স্থাপনের মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গ ও উত্তরাঞ্চলীয় সামরিক গতিবিধির ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সার্বভৌম প্রতিরক্ষা কৌশল সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ও ঝুঁকির মুখে পড়বে।

উত্তরবঙ্গের সীমান্ত অবরুদ্ধকরণ ও পুশব্যাকের আশঙ্কা : করিডোরজুড়ে বিএসএফকে অতিরিক্ত জমি দিয়ে কাঁটাতারের বেড়া ও স্মার্ট ফেন্সিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অনুপ্রবেশের অজুহাতে যেকোনো সময় নিরীহ সীমান্তবাসীদের ওপর নির্যাতন এবং জোরপূর্বক পুশব্যাকের মতো ঘটনা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেতে পারে, যা দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করবে।

ভূরাজনৈতিক সঙ্ঘাতের ‘বাফার জোন’ হওয়ার ঝুঁকি:

শিলিগুড়ি করিডোরটি চীন সীমান্ত থেকে মাত্র ৬০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ভবিষ্যতে ভারত ও চীনের মধ্যে কোনো যুদ্ধ বা বড় ধরনের সঙ্ঘাত শুরু হলে, সঙ্কীর্ণ করিডোর এড়াতে বা একে রক্ষা করতে ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশের ভূখণ্ড (বিশেষ করে রংপুর ও দিনাজপুর অঞ্চল) করিডোর বা ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহারের জন্য প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশ না চাইলেও অন্য দু’টি পরাশক্তির যুদ্ধের রণাঙ্গনে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

ভূগর্ভস্থ রেল নেটওয়ার্ক ও ট্রানজিট কূটনীতি :

করিডোরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারত বিহারের জোগবানি থেকে নেপালের বিরাটনগর হয়ে নিউ মল জংশন পর্যন্ত বিকল্প রেল রুট ও ভূগর্ভস্থ রেললাইন নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। এই অবকাঠামো বাংলাদেশের ওপর ভারতের ট্রানজিট ও করিডোর সুবিধার লজিস্টিকস নির্ভরতা কমিয়ে দেবে, যা ঢাকার দরকষাকষির কূটনৈতিক ক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করবে।

নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা :

শিলিগুড়ি করিডোরের এই অভূতপূর্ব সামরিক রূপান্তর নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। গতকাল বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) একজন সাবেক জ্যেষ্ঠ সামরিক বিশ্লেষক নয়া দিগন্তকে বলেন, শিলিগুড়ি করিডোরে ভারতের নতুন সামরিক ঘাঁটি স্থাপন এবং সড়ক ও যোগাযোগের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি সেনাবাহিনীর লজিস্টিকস উইংয়ের হাতে চলে যাওয়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ভারত স্পষ্টতই বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ঢাকাকে একটি সম্ভাব্য প্রতিকূল বা নিরপেক্ষ শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে তাদের প্রতিরক্ষা নীতি ঢেলে সাজাচ্ছে। বাংলাদেশ সীমান্তের এত কাছে ভারী ক্ষেপণাস্ত্র, রাফাল স্কোয়াড্রন এবং বিশেষায়িত গ্যারিসন স্থাপন কোনোভাবেই সাধারণ সীমান্ত পাহারা দেয়ার অংশ হতে পারে না। এটি সরাসরি বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গকে মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক চাপের মুখে রাখার একটি সুস্পষ্ট কৌশল।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের একজন অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, শিলিগুড়ি করিডোরের নিরাপত্তা নিশ্চিতের নামে ভারত এখন সীমান্তজুড়ে যে নি-িদ্র দেয়াল ও সামরিক বেষ্টনী তুলছে, তা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের সীমান্ত বাণিজ্য ও কানেক্টিভিটিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হলো, ভূরাজনৈতিক সঙ্কটে ভারত যদি এই অঞ্চলে কোনো উসকানিমূলক পদক্ষেপ নেয়, তবে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ওপর। বাংলাদেশের উচিত অবিলম্বে এই সামরিকায়নের বিষয়ে দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে প্রশ্ন তোলা এবং নিজের সীমান্ত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করা।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব:) রোকন উদ্দিন এ বিষয়ে বলেন, ভারতের এই একপক্ষীয় সামরিক তৎপরতার মুখে বাংলাদেশকে নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থরক্ষায় অবিলম্বে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হবে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে (রংপুর ও বগুড়া সেনানিবাসসহ সমগ্র উত্তরবঙ্গে) প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা (এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম) আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন। একই সাথে, সীমান্তে ভারতের যেকোনো ধরনের উসকানি বা পুশব্যাকের চেষ্টা রুখে দিতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জনবল বৃদ্ধি ও আধুনিকায়ন নিশ্চিত করতে হবে। কূটনৈতিক ক্ষেত্রে, বাংলাদেশের উচিত আঞ্চলিক ভারসাম্য বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক ফোরামে নিজেদের ভৌগোলিক ও কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরা, যাতে কোনো পরাশক্তি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে হালকাভাবে নেয়ার সাহস না পায়।

শিলিগুড়ি করিডোরে ভারতের এই বিশাল সামরিক ও অবকাঠামোগত মহোৎসব প্রমাণ করে যে, আগামী দিনগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ার সীমান্ত রাজনীতি আরো উত্তপ্ত হতে চলেছে। আর এই ঝড়ের কেন্দ্রে থাকা বাংলাদেশকে অত্যন্ত বিচক্ষণতা, সাহসিকতা ও দূরদর্শী সামরিক কূটনীতির মাধ্যমেই নিজের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা অক্ষুণœ রাখতে হবে। রোকন উদ্দিন আরো বলেন, বাংলাদেশ সরকারের উচিত বিজিবির পাশাপাশি আমাদের সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনী তথা সশস্ত্রবাহিনীকে পররাষ্ট্রনীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে অন্যান্য দেশের সাথে বন্ধুত্ব বাড়ানো। শুধু প্রতেবেশী দেশের সাথে সম্পর্ক থাকলেই হবে না। অন্যান্য দেশে গিয়ে জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক কর্মশালা, শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করতে বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনীর সাথে সম্পর্ক আরো বৃদ্ধি করতে হবে। তিনি বলেন, আমাদের দেশের তিন দিকে ভারতের সীমান্ত, এক পাশে মিয়ানমার। ভারত আমাদের কখনই বন্ধু ভাবে না, আবার মিয়ানমারে অভ্যন্তরীণ সঙ্কটের মধ্যে আছে, ফলে চারপাশের সীমান্তই আমার জন্য বড় ঝুঁকি। যদিও তারা হুঙ্কার দিলেও তারা আমাদের উপর সরাসরি কিছু করতে পারবে না। তবুও আমাদের সীমান্ত বাহিনীর পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীকেও সক্রিয় অবস্থায় সতর্ক থাকতে হবে।