Image description

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিরাট অংশজুড়ে কুমিল্লা। ঢাকা ছাড়ার দেড় থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে এই জেলায় প্রবেশ করা যায়। তা পার হয়ে পরের অংশ ফেনীতে প্রবেশেও দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময় লাগে। এই সময়টুকু লুটপাটের জন্য ‘উপযুক্ত’ হিসেবে বেছে নিয়েছে দুর্বৃত্তরা। অর্থাৎ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে ডাকাতির শিকার হতে হচ্ছে অনেককে। তাদের প্রধান টার্গেট প্রবাসী ও দূরপাল্লার যাত্রী।

 

রাত যত গভীর হয়, ‘ডাকাতির পরিবেশ’ তত চাঙা হয়ে ওঠে। বিশেষ করে মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকারের মতো ছোট যানবাহনের গতিরোধ করে অস্ত্রের মুখে সর্বস্ব লুটে নেওয়া হয়। সাম্প্রতিক কয়েকটি অপতৎপরতায় এবারের ঈদযাত্রা ঘিরে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। যাত্রীদের সঙ্গে উদ্বেগ ছড়িয়েছে পরিবহনসংশ্লিষ্টদের মধ্যেও।

 

এ বিষয়ে বাংলাদেশ হালকা মোটরযান চালক-মালিক ঐক্য পরিষদের সভাপতি সাগর মাহমুদ টিপু এশিয়া পোস্টকে বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যাত্রীবাহী গাড়িতে হামলা, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে বিদেশফেরত যাত্রীদের বহনকারী গাড়িগুলোকে টার্গেট করা হচ্ছে বেশি।

 

তিনি অভিযোগ করেন, মহাসড়কসংলগ্ন বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরাঁ এলাকায় চাঁদাবাজি ও হয়রানির ঘটনাও বাড়ছে। আবার অনেক সময় ডাকাতদল কৌশলে চালকদের দায়ী করে যাত্রীদের কাছে ফাঁসিয়ে দেয়। এতে নিরীহ চালকদেরও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।

 

রেড জোন ছয় কিলোমিটার

এশিয়া পোস্টের কাছে আসা তথ্য থেকে চলতি বছরের চার মাসের তিনটি বড় ডাকাতির ঘটনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ঘটনাগুলো ঘটেছে ২৮ ফেব্রুয়ারি, ১ মার্চ ও ২০ মে। বিশ্লেষণ বলছে–মহাসড়কের চান্দিনা উপজেলার কুটুম্বপুর থেকে দাউদকান্দি উপজেলার রায়পুর পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি অপরাধপ্রবণ। এই ছয় কিলোমিটার এলাকায় সন্ধ্যার পর থেকেই চুরি-ডাকাতি ঘটতে থাকে।

 

ডাকাতির জন্য বেছে নেওয়া হয় যাত্রীবাহী মাইক্রোবাস ও প্রাইভেটকার। এসব বাহনে করে প্রবাসীরা ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি ফেরেন। লোহার রড নিক্ষেপ করে থামানো হয় তাদের গাড়ি। চালক কোনো ত্রুটি ভেবে একটু ব্রেক করলেই হামলে পড়ে ডাকাতদল।

 

সবশেষ বুধবার (২০ মে) রাতের ঘটনা। সৌদি আরব প্রবাসী আশিকুর রহমান ডাকাতির শিকার হন। প্রবাস থেকে ঢাকা বিমানবন্দরে নেমে পরিবারের সঙ্গে ফিরছিলেন গ্রামে বাড়ি। তাদের গাড়ি দেবিদ্বার-চান্দিনা সড়কের নবীয়াবাদ এলাকায় পৌঁছলে গতিরোধ করে একদল ডাকাত। অস্ত্রের মুখে ছিনিয়ে নেওয়া হয় টাকা, সৌদি রিয়াল, ডলার ও মালামালসহ প্রায় ২৮ লাখ টাকা।

 

গত ১ মার্চ মালয়েশিয়া প্রবাসী বেলাল হোসেন দীর্ঘ তিন বছর পর দেশে ফিরে ঢাকা থেকে ভাড়া করা প্রাইভেটকারে ফেনীর দাগনভূঞায় নিজ বাড়িতে যাচ্ছিলেন। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের ফালগুনকরা এলাকায় পৌঁছলে একটি পিকআপ ভ্যান তাদের গাড়িকে ধাক্কা দেয়। সাত থেকে আটজনের একটি সশস্ত্র দল গাড়ি ঘিরে ফেলে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার, বিদেশি মুদ্রা ও মালামাল লুট করে নেয়।

 

বেলাল হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ডাকাতরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে গাড়ি ভাঙচুর করে। আমাদের জিম্মি করে সবকিছু নিয়ে যায়। এমনকি পাসপোর্টও নিয়ে নিয়েছিল। অনেক অনুরোধের পর সেটি ফেরত দেয়।

 

একই এলাকায় গত ২৭ ফেব্রুয়ারি কুয়েতপ্রবাসী নাইমুল ইসলামও ডাকাতির শিকার হন। তিনি জানান, চৌদ্দগ্রাম থানার কাছাকাছি এলাকায় তাকে বহনকারী গাড়ির গতিরোধ করে অস্ত্রের মুখে সর্বস্ব লুট করা হয়। দীর্ঘ ১৯ মাস পর দেশে ফিরে এমন অভিজ্ঞতায় হতাশা প্রকাশ করেন তিনি।

রড ছুড়ে গতিরোধ

ডাকাতির শিকার হওয়া একাধিক গাড়িচালকের সঙ্গে কথা বলেছে এশিয়া পোস্ট। তারা জানান, ডাকাতদল বেশিরভাগ সময় গাড়ি লক্ষ্য করে রড ছুড়ে মারেন। চালকরা বুঝে উঠতে পারেন না কী হয়েছে। অনেকে যান্ত্রিক ত্রুটি ভেবে গাড়ি থামিয়ে যাচাই করার সময় বাধে বিপত্তি। গাড়ি থামালেই হামলে পড়ে সশস্ত্র গোষ্ঠী। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফিলিং স্টেশন বা সড়কসংলগ্ন হোটেলে যাত্রাবিরতির সময়ও যাত্রী ও চালকরা ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন।

 

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে নিয়মিত যাতায়াত করেন মাইক্রোবাসচালক সোহেল মিয়া। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, রাত হলেই মহাসড়কের বিভিন্ন স্পটে ডাকাতদল সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। রড মেরে বা গাড়ি ধাক্কা দিয়ে যানবাহন থামিয়ে যাত্রীদের সবকিছু নিয়ে যায়।

 

প্রাইভেটকার চালক আবুল খায়েরের অভিযোগ, অধিকাংশ ভুক্তভোগী থানায় গিয়ে কাঙ্ক্ষিত সহায়তা পান না। উল্টো নানা প্রশ্ন ও হয়রানির মুখে অনেকে মামলা করতেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।

 

এ বিষয়ে কুমিল্লা হাইওয়ে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহরিয়ার আলম এশিয়া পোস্টকে বলেন, সড়কে নিরাপত্তা জোরদারে সাড়ে ৯০০ পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। রাতে সাত প্লাটুন টহল ও প্যাট্রোল টিম বাড়ানো হয়েছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে হাইওয়ে পুলিশের সদস্যরা নিরলসভাবে কাজ করছেন।

 

ঈদযাত্রায় ঘরমুখো মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়ে তিনি বলেন, ঈদে অপরাধ দমিয়ে রাখতে রাতের টিম বাড়ানো হয়েছে। মহাসড়কে আগের চেয়ে অপরাধ কমেছে। সবার সহযোগিতা ছাড়া এটা শূন্যের কোঠায় নামানো সম্ভব নয়।