ইরানে মার্কিন সম্ভাব্য হামলা এখন শুধু একটি ইশারার অপেক্ষায় আছে। দেশটিতে আক্রমণ করার জন্য মধ্যপ্রাচ্যে বিশাল সমরাস্ত্রের বহর মোতায়েন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই প্রস্তুতি ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর সবচেয়ে বড়। হোয়াইট হাউসও বার বার বলে আসছে যে, ট্রাম্প নির্দেশ দিলেই ইরানে হামলা চালাবে দেশটির সামরিক বাহিনী।
এর মধ্যে একটি প্রশ্ন বেশ বড় করে দেখা দিয়েছে যে, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে দীর্ঘ মেয়াদে যুদ্ধ করার জন্য ইরানের আশপাশে যুক্তরাষ্ট্রের কী পরিমাণ সেনা মোতায়েন করা আছে, তাদের শক্তিই বা কতটুকু। আবার তারা কি আদৌ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের নাগালের বাইরে আছে?
মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি জর্ডানে অবস্থিত। যেখানে প্রায় চার হাজার সেনা মোতায়েন আছে। এই ঘাঁটি ইরান থেকে সবচেয়ে দূরে অবস্থিত, আকাশপথে যার দূরত্ব প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার। কিন্তু ইরান সর্বশেষ যে ক্ষেপণাস্ত্র প্রকাশ্যে এনেছে তা হলো কাশেম বাছির, যার পাল্লা দেড় হাজার কিলোমিটার। ইতোমধ্যে এই ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে গত বছরের জুনের ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরাইলে সফলভাবে হামলা চালিয়ে এর সক্ষমতা পরীক্ষা করে নিয়েছে তেহরান।
এছাড়া খোররামশাহর-৪ ক্ষেপণাস্ত্রও প্রায় একই পাল্লার, যা জর্ডান পার হয়ে ইসরাইলে আঘাত হানতে সক্ষম বলে ইতোমধ্যে প্রমাণ হয়েছে। এরই বাইরে ইরানের কাছে ১০ হাজার কিলোমিটার পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র আছে বলে বার বার হুমকি দিয়ে আসছে দেশটি। এই দাবি সত্য না হলেও জর্ডানের ঘাঁটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের নাগালের বাইরে নয়। এ কারণে ইরান বরাবরই বলে আসছে যে আমেরিকা আগ্রাসন চালালে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন কোনো ঘাঁটিই অক্ষত থাকবে না।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন কোন ঘাঁটিতে কত সৈন্য আছে
ওয়াশিংটন কঠোর বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তব্য ও ইরানের বিরুদ্ধে হামলার হুমকি দিচ্ছে। তেহরান, সেইসঙ্গে এর কিছু মিত্র গোষ্ঠী, পাল্টা হুমকি দিয়েছে যে কোনও হামলার ঘটনায় এই অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে প্রতিশোধমূলক হামলা চালাবে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে নতুন শক্তিবৃদ্ধি মোতায়েন করা ছাড়াও, মধ্যপ্রাচ্যে ইতোমধ্যে হাজার হাজার আমেরিকান সৈন্য এবং গুরুত্বপূর্ণ বিমান, নৌ ও প্রশিক্ষণ ঘাঁটি আছে।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস অনুসারে, মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১৯টি ঘাঁটি আছে - যার মধ্যে আটটি স্থায়ী ঘাঁটি হিসেবে বিবেচিত হয়। বাহরাইন, মিশর, ইরাক, ইসরাইল, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, সিরিয়া, ওমান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে এর সামরিক উপস্থিতি আছে।
তুরস্ক এবং জিবুতিতে, যুক্তরাষ্ট্র বড় সামরিক ঘাঁটি রক্ষণাবেক্ষণ করে যা বিভিন্ন আঞ্চলিক কমান্ডে কাজ করে, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের কার্যকলাপে অবদান রাখে না।

বাহরাইন (৯ হাজার আমেরিকান সৈন্য আছে) হলো মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর, যার দায়িত্বে আছে পারস্য উপসাগর, লোহিত সাগর, আরব সাগর এবং ভারত মহাসাগরের কিছু অংশ।
কাতারের দোহার উপকণ্ঠে মরুভূমিতে অবস্থিত আল-উদেদ বিমানঘাঁটি হলো মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড, যা সেন্টকম নামেও পরিচিত, এর কৌশলগত সদর দপ্তর। সেন্টকমের দায়িত্বের এলাকা কেবল মধ্যপ্রাচ্যই নয়, মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অংশও অন্তর্ভুক্ত। আল-উদেদ হলো এই অঞ্চলের বৃহত্তম আমেরিকান ঘাঁটি, যেখানে প্রায় ১০ হাজার সৈন্য আছে।
এদিকে, কুয়েতে ক্যাম্প আরিফজান আছে। এটি হলো ইউএস আর্মি সেন্ট্রালের কৌশলগত (বা ফরওয়ার্ড) সদর দপ্তরের নাম - এটি একটি সামরিক গঠন যা সেন্টকমের সেনা অংশ হিসেবে কাজ করে।
আলি আল-সালেম বিমানঘাঁটি, যা তার বিচ্ছিন্ন পরিবেশের জন্য ‘দ্য রক’ নামে পরিচিত, সেটিও ইরাকি সীমান্তের কাছে কুয়েতে অবস্থিত।
আরেকটি কুয়েতি ঘাঁটি হলো ক্যাম্প বুহরিং, যা ইরাক এবং সিরিয়াগামী ইউনিটগুলোর জন্য একটি স্টেজ করার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। সব মিলিয়ে, প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ মার্কিন সৈন্য কুয়েতে মোতায়েন আছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ৩ হাজার ৫০০ মার্কিন সৈন্যের আবাসস্থল, সেইসঙ্গে আল-ধাফরা বিমানঘাঁটিরও, যা ওয়াশিংটন এবং আমিরাতের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া একটি স্থান।
এটি (আল-ধাফরা বিমানঘাঁটি) ইসলামিক স্টেট (আইএস) বিরোধী অভিযানে এবং এই অঞ্চলে গোয়েন্দা নজরদারি মিশনে ব্যবহৃত হয়েছে।
ইরাকে মার্কিন উপস্থিতির মধ্যে আছে আম্বারের আইন আল-আসাদ বিমানঘাঁটি—যা জ্যেষ্ঠ ইরানি জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে মার্কিন হত্যার পর ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল। এছাড়া আধা-স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তান অঞ্চলে আছে এরবিল বিমানঘাঁটি, যা মূলত প্রশিক্ষণ মহড়ার জন্য ব্যবহৃত হয়।
সৌদি আরবে প্রায় ২ হাজার ৭০০ মার্কিন সৈন্য মোতায়েন আছে, যারা আকাশপথ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সক্ষমতা প্রদান করে। রাজধানী রিয়াদের কাছে অবস্থিত প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি একটি প্রধান বিমান শক্তি কেন্দ্র, যেখানে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারিসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম আছে।
লেবানন অঞ্চলে অভিযানের জন্য জর্ডানের আজরাকে অবস্থিত মুওয়াফাক সালতি বিমানঘাঁটি হলো প্রধান কেন্দ্র। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৩২তম এয়ার এক্সপেডিশনারি উইং অবস্থান করে। বর্তমানে জর্ডানে প্রায় ৩ হাজার ৮০০, ইরাকে ২ হাজার ৫০০ এবং সিরিয়ায় ২ হাজার মার্কিন সৈন্য আছে।
তুরস্কের দক্ষিণে আদানায় অবস্থিত ইনসিরলিক বিমানঘাঁটি তুর্কি বাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালিত একটি বড় ঘাঁটি। জানা গেছে, এই ঘাঁটিতে মার্কিন পারমাণবিক অস্ত্র মজুত আছে।
সম্প্রতি কোন মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম আনা হয়েছে
আঞ্চলিক অগ্রাধিকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সাম্প্রতিক মাস ও বছরগুলোতে মার্কিন ঘাঁটি, সৈন্য এবং সামরিক সরঞ্জামের সংখ্যায় পরিবর্তন এসেছে। প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৪০ হাজার মার্কিন সৈন্য আছে।
তাদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ আছে আল-উদেদ ঘাঁটিতে, যেখানে যুদ্ধবিমান, ট্যাঙ্কার, আকাশপথে জ্বালানি রিফুয়েলিং এবং গোয়েন্দা সরঞ্জাম আছে। জনবলের দিক থেকে এর পরের বৃহত্তম ঘাঁটি হলো বাহরাইনের নৌঘাঁটি।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে বেশ কিছু যুদ্ধজাহাজ অভ্যন্তরীণ ও অন্যান্য কার্যক্রমের জন্য এই অঞ্চল ছেড়েছিল। তবে এখন মধ্যপ্রাচ্যে পুনরায় নৌ-শক্তি বাড়ানো হচ্ছে।
এই শক্তি প্রদর্শনের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন মোতায়েন। এটি দক্ষিণ চীন সাগর ছেড়ে এখন সেন্টকম এলাকায় কাজ করার জন্য আরব সাগরে প্রবেশ করেছে। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ের স্যাটেলাইট ইমেজ অনুযায়ী, এটি ওমান উপকূল থেকে প্রায় ৭০০ কিমি দূরে অবস্থান করছে। আব্রাহাম লিঙ্কন একটি পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী। এর স্ট্রাইক গ্রুপে রয়েছে টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র সজ্জিত আর্লি বার্ক-ক্লাস গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার, যা ইরানের অভ্যন্তরে গভীরে আঘাত হানতে সক্ষম।
ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন-এ ৫ হাজার ৬৮০ জন ক্রু সদস্য আছেন। এই জাহাজটি ওই অঞ্চলে আগে থেকেই অবস্থানরত নৌ-পাহারায় যোগ দিচ্ছে, যার মধ্যে সেন্টকম এলাকায় ইউএসএস ম্যাকফল ও ইউএসএস মিটসার এবং ভূমধ্যসাগরে ইউএসএস রুজভেল্ট আছে।
১৮ ফেব্রুয়ারি জানা গেছে যে, দ্বিতীয় একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী এই অঞ্চলের দিকে আসছে। বিশ্বের বৃহত্তম যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড ৪৮ মিনিটের জন্য জনসমক্ষে তার অবস্থান প্রচার করেছিল। সে সময় এটি মরক্কোর আটলান্টিক উপকূলে ছিল এবং ভূমধ্যসাগরের দিকে এগোচ্ছিল। এছাড়া গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার ইউএসএস ডেলবার্ট ডি. ব্ল্যাক-ও সেন্টকম বাহিনীতে যোগ দিয়েছে।
আরেক সূত্রের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে অন্তত ১২টি জাহাজ আছে। এর মধ্যে আছে আব্রাহাম লিঙ্কন, তিনটি আর্লি বার্ক-ক্লাস ডেস্ট্রয়ার, দীর্ঘ পাল্লার আঘাত হানতে সক্ষম দুটি ডেস্ট্রয়ার এবং বাহরাইনে মোতায়েন তিনটি বিশেষ যুদ্ধজাহাজ। আরও দুটি ডেস্ট্রয়ার গ্রিসের সুদা বে ঘাঁটির কাছে এবং একটি লোহিত সাগরে শনাক্ত হয়েছে।
তবে শুধু নৌ-শক্তিই নয়, বিমানও এই অঞ্চলে আসছে। ফ্লাইট ট্র্যাকার অনুযায়ী, ইলেকট্রনিক নিঃসরণ পর্যবেক্ষণ এবং রাডার ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ট্র্যাকিংয়ে বিশেষায়িত আরসি-১৩৫ ডব্লিউ রিভেট জয়েন্ট বিমান সাম্প্রতিক দিনগুলোতে কাতারে অবতরণ করেছে। ইসরাইলি গণমাধ্যমও ইরানের আঘাত হানার দূরত্বের মধ্যে মার্কিন বাহিনী ও সরঞ্জাম মোতায়েনের খবর দিয়েছে।
ইসরাইলের চ্যানেল ১৩ জানায়, নৌ-সাড়ার পাশাপাশি মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের স্থল-ভিত্তিক প্রতিরক্ষা জোরদার করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যেখানে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে একটি থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যাটারি পৌঁছানোর কথা আছে।
ওপেন সোর্স ফ্লাইট ট্র্যাকিং থেকে দেখা যায়, জর্ডানের মুওয়াফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে এক স্কোয়াড্রন এফ-১৫ যুদ্ধবিমান জমা করা হয়েছে। 'দ্য ওয়ার জোন' আরও জানিয়েছে যে, আরও কিছু আকাশপথের শক্তি মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এর মধ্যে আছে ছয়টি ইএ-১৮জি গ্রোলার ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার জেট, যা ক্যারিবিয়ান অঞ্চল ছেড়ে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিচ্ছে। এগুলো ইলেকট্রনিক যুদ্ধে সহায়তার পাশাপাশি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে ব্যবহৃত হতে পারে।
এছাড়া ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে এফ-৩৫ এবং এফ-২২ ফাইটার জেট, কেসি-১৩৫ ও কেসি-৪৬ রিফুয়েলিং ট্যাঙ্কার এবং ই-৩ সেন্ট্রি কমান্ড ও নজরদারি বিমানসহ আরও মার্কিন বিমান মধ্যপ্রাচ্যে স্থানান্তরিত হয়েছে।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই।