আজ ২৯ নভেম্বর ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি দিবস। ১৯৭৭ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ দিনটিকে ফিলিস্তিনি জনগণের সঙ্গে সংহতি প্রকাশে ‘আন্তর্জাতিক ফিলিস্তিন সংহতি দিবস’ হিসেবে গ্রহণ করে। এরপর থেকেই মূলত দিনটি ‘আন্তর্জাতিক ফিলিস্তিনি সংহতি দিবস’ হিসেবে সারা বিশ্বে পালিত হয়ে আসছে।
বর্তমানে দিবসটি এমন এক সময় পালিত হচ্ছে, যখন গত দুই বছরের ইসরাইলি আগ্রাসনে অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গাজায় প্রতি ৩৩ জনে একজন নিহত হয়েছেন। কিন্তু বিশ্ব এ ব্যাপারে নিশ্চুপ অথবা যে ভূমিকা রাখার কথা ছিল, তা রাখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে আরব রাষ্ট্রগুলোর ওপর ফিলিস্তিনিরা ভরসা করলেও তারা যুদ্ধ বন্ধে কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি বা রাখেনি। এছাড়া মুসলিম বিশ্বের জোট অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি) শুধু বিবৃতি দিয়ে দায় সেরেছে। অন্যদিকে জাতিসংঘ এবং পশ্চিমা বিশ্ব ইউক্রেন নিয়ে যতটা সরব ছিল, ফিলিস্তিন নিয়ে ততটা বিচলিত তাদের দেখা যায়নি। পশ্চিমা বিশ্বের অস্ত্র দিয়েই ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের হত্যা করেছে। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, দুই বছরের বেশি সময়ের আগ্রাসনে অন্তত ৭০ হাজার গাজাবাসী নিহত হয়েছেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, নিহতের সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে।
গত ২৪ নভেম্বর জার্মানির শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর ডেমোগ্রাফিক রিসার্চ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসনে অন্তত এক লাখের বেশি মানুষ নিহত হতে পারেন।
এই প্রেক্ষাপটে দিবসটি পালনের লক্ষ্যে জাতিসংঘে ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার বাস্তবায়ন কমিটি গত মঙ্গলবার নিউ ইয়র্কে বিশেষ বৈঠকে মিলিত হয়।
বৈঠকটি ১৯৪৭ সালের জাতিসংঘের একটি প্রস্তাবকে মনে করিয়ে দেয়। যেখানে দুটি রাষ্ট্রকে শান্তি ও নিরাপত্তায় পাশাপাশি বসবাসের কল্পনা করা হয়েছিল। এই কমিটির চেয়ারম্যান কলি সেক দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ৭৮ বছরে শান্তি বা নিরাপত্তা কিছুই আসেনি।
সেক বলেন, ফিলিস্তিনিরা ঐতিহাসিক অবিচারের সম্মুখীন হচ্ছে এবং এটা অব্যাহত থাকবে। ফিলিস্তিনি সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘের দায়িত্বের ওপর জোর দেন তিনি। একই সঙ্গে পূর্ব জেরুসালেমকে রাজধানী করে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র স্বীকৃতি দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি আনালেনা বেয়ারবক উল্লেখ করেছেন, ১৯৪৭ সালের ওই প্রস্তাব দুই রাষ্ট্র সমাধানের ভিত্তি স্থাপন করেছে। তবে ইসরাইল জাতিসংঘের স্বীকৃত সদস্য হলেও ফিলিস্তিন নয়। এ কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের মর্যাদা পাওয়া ফিলিস্তিনিদের অধিকার, যা রক্ষা করা উচিত।
দিবসটি উপলক্ষে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস এক বার্তায় অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর নেমে আসা অবর্ণনীয় দুর্ভোগের কথা স্বীকার করেন। ইসরাইলিরা অন্যায়ভাবে বসতি স্থাপন করতে গিয়ে যে হামলা চালাচ্ছে, তা অবর্ণনীয় বলে উল্লেখ করেন। তবে সম্প্রতি ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকরে মিসর, কাতার, তুরস্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের চেষ্টার প্রশংসা করেন তিনি।
ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস এক বার্তায় নিশ্চিত করেছেন, গাজা উপত্যকা ফিলিস্তিনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিবৃতিতে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়াসহ সাম্প্রতিক মাসগুলোয় ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়া বেশ কয়েকটি দেশকে ধন্যবাদ জানান তিনি। এছাড়া যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন।
আরব লিগের মহাসচিব আহমেদ আবুল গেইত এক বার্তায় উল্লেখ করেছেন, ইসরাইলের ‘বিচ্ছিন্নতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে,’ ফলে দুই রাষ্ট্র সমাধান বাস্তবায়নে একটি আন্তর্জাতিক জোট গঠন করা হয়েছে।
নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি মাইকেল ইমরান কানু ঐকমত্যের অভাবে এ ব্যাপারে বিবৃতি দিতে পারেননি। নিরাপত্তা পরিষদের বার্ষিক বিশেষ বৈঠক শুরুর পর প্রথমবারের মতো এমন ঘটনা ঘটল, সেক বলেন।
২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৭০ হাজার গাজাবাসীকে হত্যা করেছে দখলদার ইসরাইলি বাহিনী। যার মধ্যে বেশির ভাগ নারী এবং শিশু। এছাড়া এ সময় প্রায় এক লাখ ৭১ হাজার গাজাবাসী আহত হয়েছে। দুই বছরের এই যুদ্ধে গাজার অধিকাংশ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে উপত্যকা।
দীর্ঘ আলোচনার পর চলতি বছরের ১০ অক্টোবর হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। যুদ্ধবিরতির আওতায় ফিলিস্তিনি বন্দিদের বিনিময়ে ইসরাইলি বন্দিদের মুক্তি দেওয়া হয়। এই পরিকল্পনার মধ্যে গাজার পুনর্গঠন এবং হামাসবিহীন নতুন শাসনব্যবস্থা কীভাবে চলবে সেটার কথাও উল্লেখ আছে। তবে যুদ্ধবিরতি শুরু হলেও ইসরাইল হামলা অব্যাহত রেখেছে। এ সময় অন্তত ৩৪২ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা ও ৯০০ জনকে আহত করেছে দখলদার বাহিনী।
গত বৃহস্পতিবার অধিকৃত পশ্চিম তীরের জেনিন শহরে আত্মসমর্পণের পরও ইসরাইলি বাহিনী দুই নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিকে খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করেছে।