বিশ্বজুড়ে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলোর সামরিক প্রতিযোগিতা এক নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। তবে এই প্রতিযোগিতায় শীর্ষে থেকে বিশ্বের মোট পারমাণবিক অস্ত্রের প্রায় ৮৬ শতাংশই নিজেদের কবজায় রেখেছে দুই পরাশক্তি রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র।
সোমবার (৮ জুন) স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপ্রি) প্রকাশিত এক বার্ষিক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈশ্বিক সামরিক ব্যবহারের উপযোগী মোট পারমাণবিক ওয়ারহেডের ৮৩ শতাংশ এবং সামগ্রিক পারমাণবিক অস্ত্রের প্রায় ৮৬ শতাংশই এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র।
সিপ্রি জানিয়েছে, ২০২৫ সালের তুলনায় চলতি বছরের শুরু পর্যন্ত এই দুই দেশের অস্ত্রের সংখ্যায় খুব একটা হেরফের না হলেও, তাদের চলমান ব্যাপক আধুনিকায়ন কর্মসূচি ভবিষ্যতে অস্ত্রাগারের আকার ও বৈচিত্র্য আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। বর্তমানে উচ্চ সতর্কাবস্থা থাকা প্রায় ২ হাজার ২০০টি ওয়ারহেডের (যা মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে উৎক্ষেপণ সম্ভব) প্রায় সবই এই দুই পরাশক্তির দখলে, যার সামান্য কিছু অংশ রয়েছে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের কাছে।
স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক অস্ত্রের মজুত কমার যে প্রবণতা ছিল, প্রধান শক্তিগুলো কর্তৃক পুরোনো ওয়ারহেড ধ্বংসের গতি কমিয়ে নতুন অস্ত্র মোতায়েন বাড়ানোর ফলে সামনের বছরগুলোতে তা পুরোপুরি বদলে যেতে পারে।
সিপ্রির প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীন, ফ্রান্স, ভারত, ইসরায়েল, উত্তর কোরিয়া, পাকিস্তান, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র—বিশ্বের এই ৯টি পারমাণবিক শক্তিধর দেশের কাছে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ১২ হাজার ১৮৭টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯ হাজার ৭৪৫টি ওয়ারহেড সম্ভাব্য ব্যবহারের জন্য সামরিক মজুতে রাখা হয়েছে এবং আনুমানিক ৪ হাজার ১২টি ওয়ারহেড বর্তমানে ক্ষেপণাস্ত্র ও যুদ্ধবিমানে মোতায়েন রয়েছে।
সিপ্রির গবেষক হ্যান্স ক্রিস্টেনসেন সতর্ক করে বলেন, পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলো তাদের নিরস্ত্রীকরণের অঙ্গীকারকে গুরুত্ব না দিয়ে উল্টো পারমাণবিক শক্তির মহড়া দিচ্ছে, যা বিগত কয়েক দশকের বৈশ্বিক প্রচেষ্টাকে উল্টো পথে ঠেলে দিচ্ছে।
পরাশক্তি দুই দেশ ছাড়াও অন্যান্য পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোও নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী দেশ চীন গত এক বছরে তাদের মজুত ৬০০ থেকে বাড়িয়ে ৬২০টিতে উন্নীত করেছে এবং অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় দ্রুতগতিতে এর সম্প্রসারণ ঘটাচ্ছে। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স তাদের সক্ষমতা আধুনিকায়ন অব্যাহত রেখেছে।
তবে ফরাসি সরকার জানিয়েছে, তারা এখন থেকে তাদের অস্ত্রাগারের আকার নিয়ে জনসমক্ষে কোনো তথ্য দেবে না। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ২০২৫ সালেও তাদের পারমাণবিক অস্ত্রাগার কিছুটা বাড়িয়েছে এবং নতুন ধরনের ডেলিভারি সিস্টেম বা অস্ত্র বহনকারী ব্যবস্থা তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
পাকিস্তানও তাদের সক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে এবং ভবিষ্যতে বড় ধরনের সম্প্রসারণের লক্ষ্যে পারমাণবিক জ্বালানি বা ফিসাইল ম্যাটেরিয়াল জমা করছে।
এদিকে, ইসরায়েল তাদের পারমাণবিক সক্ষমতার বিষয়ে বরাবরের মতো অস্পষ্টতা বজায় রাখলেও সিপ্রির অনুমান অনুযায়ী দেশটির কাছে ৯০টি ওয়ারহেড রয়েছে। ২০২৫ সালে দিমোনার কাছে নেগেভ পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রে নির্মাণকাজ বৃদ্ধি দেশটির দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত উন্নতির সংকেত দিচ্ছে। অন্যদিকে, উত্তর কোরিয়া সম্ভবত মোট ৬০টি ওয়ারহেড তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে এবং নিজেদের ঘোষিত লক্ষ্য অনুযায়ী পারমাণবিক অস্ত্রাগারের জ্যামিতিক হারে প্রসারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করে সিপ্রির পরিচালক করিম হাজ্জাজ বলেন, বিশ্বের অনেক নেতাই শত্রু রাষ্ট্রের হামলা থেকে সুরক্ষার গ্যারান্টি হিসেবে পারমাণবিক অস্ত্রের পক্ষে কথা বলছেন। কিন্তু জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা কৌশলকে পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল করা মূলত পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকিকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা বিশ্বশান্তির জন্য চরম হুমকিস্বরূপ।