Image description

মর্গে পড়ে আছে লাশ। সেই লাশ নেওয়ার জন্য দিতে হবে পৌনে দুই কোটি টাকা। কিন্তু কে দেবে এই টাকা? টাকার অভাবে লাশগুলো পড়ে আছে প্রায় ৯ থেকে ১৪ বছর ধরে হাসপাতাল মর্গের ফ্রিজে।

কীভাবে, কোন উপায়ে এসব লাশ মর্গ থেকে বের হবে কিংবা সৎকার হবে, সে বিষয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা নেই। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও পুলিশ প্রশাসন একে-অপরের প্রতি দায় চাপাচ্ছে। এরকম নির্মম বাস্তবতায় এখন চারটি লাশের করুণ পরিণতি। এর মধ্যে তিনজন মুসলিম ও একজন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। সবাই মিয়ানমারের নাগরিক।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে (চমেক) লাশ রাখার জন্য দুটি ফ্রিজ। ২০টি পর্যন্ত মরদেহ রাখা যায়। এ চারটি ছাড়া আর কোনো লাশ নেই বর্তমানে।

মর্গে পড়ে থাকা লাশের কেন শেষ ঠিকানা হচ্ছে না— এমন প্রশ্ন করা হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক জসিম উদ্দিনের কাছে। তিনি বললেন, ‘লাশগুলো অনেক দিন ধরে এখানে। কয়েকবার চিঠি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখনো সেভাবেই পড়ে রয়েছে।’

চার মরদেহ নিয়ে যাওয়ার জন্য চমেক কর্তৃপক্ষ কয়েকবার নগর পুলিশ প্রশাসনকে চিঠি দেয়। তখন মর্গের ভাড়া বাবদ বকেয়া টাকার দাবি তোলা হলে কেউই এ নিয়ে এগোয়নি। প্রতিটি মরদেহ সংরক্ষণের জন্য দৈনিক ভাড়া এক হাজার টাকা। ২০১২ সাল থেকে রাখা দুই মরদেহের জন্য বকেয়া দাঁড়ায় এক কোটি টাকা। তারা হলেন কালা হোসেন (৫০) ও আবু তৈয়ব (২০)। ২০১৪ সালে মারা যাওয়ার পর সহিমং থোর মরদেহ সংরক্ষণ বাবদ খরচ দাঁড়ায় ৪৩ লাখ টাকা। ২০১৭ সাল থেকে মর্গের ফ্রিজে থাকা অন্য রোহিঙ্গার নাম হাফেজ সিরাজ। এ লাশের ভাড়া ৩২ লাখ টাকা।

নগর পুলিশের (সিএমপি) সহকারী কমিশনার (জনসংযোগ) আমিনুর রশিদ বললেন, ‘অস্বাভাবিক মৃত্যুর শিকার নাগরিকের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো পর্যন্ত পুলিশের মূল দায়িত্ব। মর্গে বিদেশি নাগরিকের লাশের বিষয়ে সিএমপির পক্ষ থেকে যথাযথ প্রক্রিয়ায় মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে। এখন লাশ হস্তান্তরের বিষয়টি মন্ত্রণালয় দেখবে। আর লাশ মর্গে রাখার যে খরচ সেটা সাধারণত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ওয়েলফেয়ার ফান্ড থেকে বহন করে।’

চার মরদেহের মধ্যে তিনজন অবৈধ অনুপ্রবেশকারী মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিম। এর মধ্যে ২০১২ সালের জুন মাসে মিয়ানমারে দাঙ্গায় গুরুতর আহত হয়ে কালা হোসেন ও আবু তৈয়ব টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশ করেছিলেন। একইভাবে ২০১৪ সালে সহিমং থো (৮ বছর) এবং ২০১৭ থেকে হাফেজ সিরাজ আহত অবস্থায় অবৈধ অনুপ্রবেশ করে। চারজনই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেলে তাদের স্বজনরা লাশ ফেলে চলে যান। তখন থেকে লাশ চমেক মর্গের ফ্রিজে।

চমেক কর্তৃপক্ষ জানায়, ভাড়া পরিশোধ করে সংরক্ষণ করা লাশগুলো নিয়ে যাওয়ার জন্য তারা কয়েক দফা নগর পুলিশকে অবহিত করেছে। কিন্তু পুলিশের দিক থেকে কোনো ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। দীর্ঘদিন হয়ে যাওয়ায় লাশগুলো এখন নষ্ট হওয়ার পথে। মর্গের ডোম কদম আলী জানালেন, লাশগুলোর পোস্টমর্টেম করা আছে। দীর্ঘদিন থাকতে থাকতে সেগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কখনো মর্গের ফ্রিজ নষ্ট হলে লাশ একেবারে পচে যাবে।

কয়েক বছর আগে চমেক কর্তৃপক্ষের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে নগর পুলিশ বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠি দেয় মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে। তারা রোহিঙ্গার দায়িত্ব নিতে রাজি হয়নি। পুলিশের পক্ষ থেকে চাওয়া হয়েছিল আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে লাশগুলো দাফন করতে। কিন্তু চমেক কর্তৃপক্ষের বকেয়া টাকা পরিশোধ না হওয়ায় এ নিয়ে বিপত্তি দেখা দেয়।