Image description

বিশ্বজুড়ে ভারতীয় পর্যটকদের উপস্থিতি এখন আর নতুন কোনো ঘটনা নয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমুদ্রসৈকত থেকে ইউরোপের ঐতিহাসিক শহর—সবখানেই ভারতীয় ভ্রমণকারীদের দেখা মেলে। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, হোটেল, রেস্তোরাঁ কিংবা পর্যটনকেন্দ্রে হিন্দি ভাষা বা বলিউডের গানের উপস্থিতি আজ প্রায় স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ভারতীয় পর্যটকদের নিয়ে আলোচনার কারণ শুধু তাদের বিপুল সংখ্যা নয়; বরং বিদেশের মাটিতে তাদের কিছু আচরণ নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক।

ভিয়েতনামের একটি বিমানবন্দরের টারম্যাকে গার্বা নৃত্য, ইন্দোনেশিয়ার বালিতে একটি বিলাসবহুল রিসোর্ট থেকে বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ কিংবা থাইল্যান্ডের ফুকেটে একটি জনপ্রিয় বিচ ক্লাবে ভারতীয়দের প্রবেশ নিয়ে বিতর্ক—ঘটনাগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। এসব ঘটনার পর আন্তর্জাতিক পর্যটন আচরণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এবং নতুন প্রজন্মের ভ্রমণ সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলোও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া, এনডিটিভি, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে শুধু পৃথক ঘটনাই নয়, বরং এসব ঘটনার পেছনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণ খুঁজে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ভিয়েতনামে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, উড়োজাহাজ থেকে নামার পর বিমানবন্দরের টারম্যাক এলাকায় কয়েকজন ভারতীয় পর্যটক গার্বা নাচ শুরু করেন। গুজরাটের ঐতিহ্যবাহী এই নৃত্য সাধারণত ধর্মীয় উৎসবের সঙ্গে যুক্ত। ভিডিওতে দেখা যায়, বিমানবন্দরের কর্মীরা দ্রুত সেখানে গিয়ে তাদের থামিয়ে দেন।

বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বিধি অনুযায়ী টারম্যাক এমন একটি এলাকা, যেখানে যাত্রীদের চলাফেরা নিয়ন্ত্রিত থাকে। সেখানে নাচ বা বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডের কোনো সুযোগ নেই। ফলে ঘটনাটি আইনগতভাবে বড় অপরাধ না হলেও আন্তর্জাতিক ভ্রমণশিষ্টাচারের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।

ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর অনেক ভারতীয় নেটিজেনও বিরক্তি প্রকাশ করেন। কেউ কেউ মন্তব্য করেন, অল্প কয়েকজনের এমন আচরণের কারণে বিদেশে ভ্রমণরত অন্য ভারতীয়দেরও নেতিবাচক ধারণার মুখোমুখি হতে হয়।

আরেকটি ঘটনা ঘটে ইন্দোনেশিয়ার পর্যটনস্বর্গ বালিতে। স্থানীয় গণমাধ্যম এবং ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, চার ভারতীয় পর্যটকের বিরুদ্ধে একটি বিলাসবহুল রিসোর্ট থেকে বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। চেকআউটের সময় রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ তাদের লাগেজ পরীক্ষা করে হারিয়ে যাওয়া পণ্যগুলো উদ্ধার করে।

ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, কর্মীরা পর্যটকদের ব্যাগ থেকে তোয়ালে, হেয়ার ড্রায়ার, রিমোট কন্ট্রোল, পোশাক এবং অন্যান্য ব্যবহার্য সামগ্রী বের করে মেঝেতে সাজিয়ে রাখছেন। পরে পর্যটকেরা সেগুলো ফেরত দেন এবং হোটেল কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়নি।

ঘটনাটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খুব বড় আকারে না এলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, বিলাসবহুল বিদেশি রিসোর্টে গিয়ে এ ধরনের আচরণের ব্যাখ্যা কী হতে পারে।

তৃতীয় আলোচিত ঘটনাটি থাইল্যান্ডের ফুকেটে। ইয়োনা বিচ ক্লাব নামের একটি জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে কয়েকজন ভারতীয় পর্যটককে প্রবেশ করতে না দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। একজন ভারতীয় ডিজে ও কনটেন্ট নির্মাতা ইনস্টাগ্রামে অভিযোগ করেন, কেবল ভারতীয় হওয়ার কারণেই তাদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে।

এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। ক্লাব কর্তৃপক্ষ বৈষম্যের অভিযোগ অস্বীকার করে জানায়, তাদের নির্দিষ্ট প্রবেশনীতি রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট দলটি সেই শর্ত পূরণ করেনি। বিশেষ করে নারী-পুরুষের অনুপাতসংক্রান্ত নিয়মের কথা তারা উল্লেখ করে।

তবে ঘটনার পর সামাজিক মাধ্যমে যে প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, তা আরও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক বিদেশি ব্যবহারকারী দাবি করেন, অতীতে কিছু পর্যটকের আচরণের কারণে ভারতীয়দের নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। উচ্চ শব্দে গান বাজানো, ড্রেস কোড না মানা, অতিরিক্ত ভিড় সৃষ্টি করা কিংবা অন্যদের অসুবিধার কারণ হওয়া—এ ধরনের অভিযোগ বিভিন্ন মন্তব্যে উঠে আসে।

এসব মন্তব্য যে পুরো ভারতীয় জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে, তা নয়। তবে ঘটনাগুলো দেখিয়ে দেয় যে আন্তর্জাতিক পর্যটনক্ষেত্রে আচরণগত বিষয় এখন আগের চেয়ে বেশি আলোচনায় আসছে। প্রশ্ন হলো, কেন এমন হচ্ছে?

বিশ্লেষকদের মতে, এর একটি বড় কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে ‘ভাইরাল সংস্কৃতি’র উত্থান। টাইমস অব ইন্ডিয়া সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে লিখেছে, বর্তমানে অনেক মানুষ বাস্তব অভিজ্ঞতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন এমন কর্মকাণ্ডকে, যা অনলাইনে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। অর্থাৎ কোনো কাজের সামাজিক বা সাংস্কৃতিক উপযোগিতা নয়, বরং সেটি কতটা মনোযোগ আকর্ষণ করবে—সেই বিষয়টি অনেকের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

ফরাসি দৈনিক লো মোঁদও সম্প্রতি পর্যটনের পরিবর্তিত চরিত্র নিয়ে বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকের যুগে ভ্রমণ এখন শুধু ঘোরাফেরা নয়; এটি একই সঙ্গে একটি প্রদর্শনমূলক কার্যক্রমে পরিণত হয়েছে। পর্যটকরা কোথায় গেলেন, কী খেলেন, কী ছবি তুললেন—এসবই এখন ভ্রমণের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

এর ফলে অনেকে এমন কিছু করতে চান, যা অন্যদের থেকে আলাদা এবং সহজেই ভাইরাল হতে পারে। কখনো কখনো সেই প্রচেষ্টাই শিষ্টাচার ও বাস্তবতার সীমা অতিক্রম করে। ভারতীয় পর্যটকদের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় কারণ হতে পারে সংখ্যাগত বিস্তার। ভারতের মধ্যবিত্ত শ্রেণির দ্রুত সম্প্রসারণ, সাশ্রয়ী বিমান ভাড়া এবং সহজতর ভিসা ব্যবস্থার ফলে বিদেশ ভ্রমণ এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি নাগালের মধ্যে এসেছে।

ভারতের পর্যটন খাতের বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক দশকে বিদেশগামী ভারতীয় পর্যটকের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রথমবারের মতো বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ পাচ্ছেন।

স্বাভাবিকভাবেই, ভ্রমণকারীর সংখ্যা যত বাড়বে, ব্যতিক্রমী বা নেতিবাচক ঘটনার সংখ্যাও তত বাড়বে। কোটি কোটি মানুষের মধ্যে সামান্য অংশও যদি নিয়ম ভঙ্গ করে, তবে সামাজিক মাধ্যমের যুগে সেই ঘটনাগুলোই সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

বিশ্লেষকেরা আরেকটি বিষয়ের কথা বলছেন—সংস্কৃতিগত অভিযোজনের অভাব। প্রত্যেক দেশেই কিছু সামাজিক আচরণ গ্রহণযোগ্য, আবার কিছু আচরণ অগ্রহণযোগ্য। নিজের দেশে যেটি স্বাভাবিক, অন্য দেশে সেটি অসৌজন্যমূলক বলে বিবেচিত হতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে উচ্চস্বরে গান বাজানো, জনসমাগমে অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস প্রকাশ, নির্দিষ্ট ড্রেস কোড উপেক্ষা করা কিংবা ব্যক্তিগত পরিসরের প্রতি অমনোযোগী হওয়া—এসব আচরণ বিভিন্ন দেশে ভিন্নভাবে মূল্যায়িত হয়। আন্তর্জাতিক ভ্রমণের সময় স্থানীয় সংস্কৃতি ও নিয়মকানুন সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকলে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।

এ ছাড়া নতুন একটি ধারণা সামনে এসেছে—‘কনটেন্ট-ফার্স্ট ট্রাভেল’। ভারতীয় গবেষণা প্ল্যাটফর্ম রিসার্চগেটে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, বর্তমানে অনেক তরুণ পর্যটক ভ্রমণের অভিজ্ঞতার চেয়ে সেটি কীভাবে অনলাইনে উপস্থাপন করা যাবে, সে বিষয়ে বেশি মনোযোগী।

গবেষকেরা বলছেন, ‘ফিয়ার অব মিসিং আউট’ বা ফোমোও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সামাজিক মাধ্যমে অন্যদের ভ্রমণ দেখে অনেকেই একই ধরনের ছবি, ভিডিও বা অভিজ্ঞতা পুনরুত্পাদন করতে চান। ফলে ভ্রমণ কখনো কখনো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা না হয়ে ডিজিটাল প্রদর্শনীতে পরিণত হয়।

তবে বিষয়টির আরেকটি দিকও রয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যটন নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই একটি ঝুঁকি দেখা যায়—কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে পুরো জাতির বৈশিষ্ট্য হিসেবে উপস্থাপন করা। ভারতীয় পর্যটকদের ক্ষেত্রেও সেই আশঙ্কা আছে।

প্রতি বছর কোটি কোটি ভারতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেন। তাদের বিপুল অংশ কোনো বিতর্কে জড়ান না, বরং স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখেন এবং ইতিবাচক অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফেরেন। কিন্তু সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রকৃতি এমন যে, স্বাভাবিক আচরণ কখনো খবর হয় না; ব্যতিক্রমী ঘটনাই শিরোনাম হয়।

ফলে কয়েকটি ভাইরাল ভিডিও বা অভিযোগ কখনো কখনো বাস্তবতার তুলনায় বড় চিত্র তৈরি করতে পারে। সামাজিক মাধ্যমের অ্যালগরিদমও সাধারণত বিতর্কিত ও আবেগঘন কনটেন্টকে বেশি গুরুত্ব দেয়।

তবু এটাও সত্য, আন্তর্জাতিক পর্যটনের সঙ্গে দায়িত্বশীল আচরণের প্রশ্নটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। পর্যটন কেবল ব্যক্তিগত আনন্দের বিষয় নয়; এটি একটি দেশের নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বও করে। বিদেশে একজন পর্যটকের আচরণ অনেক সময় তার দেশের সামগ্রিক ভাবমূর্তির ওপর প্রভাব ফেলে।

ভারতীয় পর্যটকদের সাম্প্রতিক বিতর্কগুলো তাই শুধু কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার গল্প নয়। এগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে পর্যটনের পরিবর্তিত চরিত্র, বৈশ্বিক সংস্কৃতির সঙ্গে অভিযোজনের চ্যালেঞ্জ এবং ডিজিটাল স্বীকৃতির প্রতি মানুষের ক্রমবর্ধমান আকর্ষণেরও প্রতিফলন।

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর পর্যটকদের মধ্যেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ভ্রমণের আনন্দকে ছাপিয়ে কখনো কখনো গুরুত্ব পাচ্ছে ভিডিও, রিল বা ভাইরাল পোস্ট। ফলে প্রশ্ন উঠছে—মানুষ কি এখনও পৃথিবীকে জানার জন্য ভ্রমণ করছে, নাকি পৃথিবীকে দেখানোর জন্য?

সম্ভবত উত্তরটি মাঝামাঝি কোথাও। তবে আন্তর্জাতিক পর্যটনের ভবিষ্যৎ যে ক্রমেই ‘কনটেন্ট’ ও ‘অভিজ্ঞতা’র দ্বন্দ্বে আবর্তিত হচ্ছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো অন্তত সেই বাস্তবতাই সামনে নিয়ে এসেছে।