Image description

দশকের পর দশক ইরানের অবস্থান ছিল রক্ষণাত্মক। দেশটিকে আগাম হামলা চালাতে দেখা যায় না। তবে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা থাকলেও রোববার ইসরায়েলে প্রথম হামলা চালিয়েছে সেই ইরানই। এটি দেশটির কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত বলে মনে করা হচ্ছে।

ইরানের দীর্ঘদিনের নীতি ছিল, প্রথমে আঘাত সহ্য করে পরে নিজেদের পছন্দমতো সময় ও স্থানে প্রতিশোধ নেওয়া। তবে এবারের হামলা এমন বার্তা দিচ্ছে, প্রয়োজনে দেশটি বড় ধরনের সামরিক সংঘর্ষে জড়াতে প্রস্তুত। এমনকি প্রথমে হামলাও চালাতে পারে।

গত রোববার রাতে ইসরায়েলে উত্তরাঞ্চল লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ইরান। পরে তেহরান জানায়, লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর অবস্থান লক্ষ্য করে ইসরায়েলি হামলার জবাবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

এর মাধ্যমে দেশটি দেখায়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রায় ৪০ দিন টানা বোমাবর্ষণ করলেও তাদের সামরিক সক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে যায়নি। তারা এখনও ইসরায়েলে হামলা চালাতে ভালোভাবেই সক্ষম।

‘নাসর’ (বিজয়) নামের এই অভিযানে ইরানি কর্তৃপক্ষ আরও দেখিয়েছে, তারা আগের মতো নিজ দেশের জেনারেলদের হত্যাকাণ্ড বা পুরোনো ক্ষোভের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য বসে নেই। বরং, বৈরুতের দাহিয়েহ শহরতলিকে রক্ষা করতে তারা যেকোনো মুহূর্তে পাল্টা আঘাত করতে প্রস্তুত।

ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সমন্বিত কমান্ড খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্সের মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাঘারি সোমবার বিকেলেই এক ভিডিও বার্তায় বলেন, আমরা যেমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, তেমনই কাজ করেছি।

কয়েক ঘণ্টা ধরে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে দফায় দফায় হামলা-পাল্টা হামলার পর তিনি এ কথা বলেন। ইব্রাহিম জোলফাঘারি বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র এবং অঞ্চলজুড়ে তাদের মিত্রবাহিনী কখনোই যুদ্ধে পরাজিত শত্রুদের সামনে নতিস্বীকার করবে না।

পরে ইরান জানায়, তাদের হামলা শেষ হয়েছে। তবে লেবাননে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকলে আরও কঠোর হামলা চালানো হবে।

দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ লেবাননে অবস্থানরত ইসরায়েলি সেনাদের সামরিক সহায়তা দেওয়া টিবেরিয়াস ও নাহারিয়া এলাকায় সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। পাশাপাশি রামাত ডেভিড, তেল নফ এবং নেভাতিম সামরিক বিমানঘাঁটিতেও হামলা চালানো হয়।

অন্যদিকে, ইসরায়েল তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে হামলা চালায়। প্রথমে লক্ষ্যবস্তু ছিল মাহশাহরের কারুন নামের একটি বৃহৎ পেট্রোকেমিক্যাল কারখানা। মাহশাহর শহরে আরও কয়েকটি বৃহৎ পেট্রোকেমিক্যাল প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যা ইরানের অ-তেলভিত্তিক অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত। ইরানের অর্থনীতিকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করতে এসব স্থাপনায় ব্যাপক বোমাবর্ষণ করে ইসরায়েল।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে যুদ্ধের সময়ও ইরানের বড় বড় ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম কারখানা এবং অন্যান্য বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছিল ইসরায়েল। সোমবারের সবশেষ হামলায় ‘ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির জন্য কাঁচামাল উৎপাদনকারী অবকাঠামো’ লক্ষ্য করে পরিচালিত বলে বর্ণনা করে ইসরায়েল।

জবাবে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) হাইফার বাজান তেল শোধনাগারে হামলা চালায়। তবে এতে কতটা ক্ষতি হয়েছে তা স্পষ্ট নয়।

আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট ফার্স নিউজ এজেন্সি এক অজ্ঞাত সূত্রের বরাত দিয়ে জানায়, ইরানের স্থাপনাগুলোতে আবার হামলা হলে অঞ্চলের অন্যান্য দেশের জ্বালানি অবকাঠামোও লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।

সোমবার সামাজিক মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইসরায়েল ও ইরান তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতির দিকে এগোচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত অবরোধ তিনি বহাল রাখবেন।

তেহরানে সোমবার সকাল ও সারা দিনজুড়ে স্বাভাবিক যানচলাচল দেখা যায়। যদিও নতুন করে বোমাবর্ষণ হয়েছিল। শহরটির কিছু এলাকায় একটি জোরালো বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। স্থানীয় গণমাধ্যম জানায়, পশ্চিম তেহরানের আকাশে একটি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে।

এক নতুন অধ্যায়

ইরানি কর্তৃপক্ষ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সবশেষ হামলার গুরুত্বকে কেবল সামরিক জবাবের চেয়ে বেশি কিছু হিসেবে তুলে ধরেছে। হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো অভ্যন্তরীণ মতবিরোধও দেখা যায়নি।

ইরানের এক্সপিডিয়েন্সি কাউন্সিলের প্রধান সাদেক আমোলি লারিজানি এই পদক্ষেপকে ‘একটি কৌশলগত মতবাদের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

তিনি সোমবার এক বিবৃতিতে বলেন, তেহরান তার প্রতিরক্ষা নীতির একটি নতুন অধ্যায় উন্মোচন করেছে। এটি এমন এক অধ্যায়, যেখানে আঞ্চলিক শক্তির সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে হুমকির অপেক্ষায় না থেকে। বরং উদ্যোগী ও আক্রমণাত্মক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে।

ইরানের সেনাপ্রধান আমির হাতামি বলেন, ইসরায়েলের আগ্রাসনের দায় যুক্তরাষ্ট্রের। আমরা শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাব।

তেহরানে এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, মার্কিন কর্মকর্তারা যা-ই বলুন না কেন, ইরান জানে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টকম প্রতিরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক উভয় অভিযানে ইসরায়েলের সঙ্গে পুরোপুরি সমন্বয় ও সহযোগিতা করছে।

তিনি ইরানের হামলাগুলোকে ‘আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, এটি জাতিসংঘ সনদে স্বীকৃত আত্মরক্ষার অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

কট্টরপন্থীদের প্রাধান্য থাকা পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়ি এক্সে লিখেছেন, শান্তি ও স্থিতিশীলতার পথ যুদ্ধের মধ্য দিয়েই যায়। কোনো দেশ যদি আত্মরক্ষার জন্য প্রস্তুত না থাকে, তাহলে সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে।

আইআরজিসির মহাকাশ বাহিনীর প্রধান মাজিদ মুসাভি যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবারের মতো ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেন। তিনি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানান, তারা যেন প্রতি রাতে রাস্তায় নেমে ‘যুদ্ধক্ষেত্র এবং কূটনীতিকে’ একত্রিত করে শত্রুদের মোকাবিলা করে।

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেখা যায়, রোববার রাতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের খবর শুনে কিছু সমর্থক রাস্তায় উল্লাস প্রকাশ করছেন।

তবে অনেকেই আশঙ্কা করছিলেন, কর্তৃপক্ষ আবারও অস্পষ্ট নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে ইন্টারনেট বন্ধ করে দিতে পারে। যদিও নতুন করে সংঘাত বাড়ার মধ্যেও কোনো আকস্মিক ইন্টারনেট বিভ্রাটের খবর পাওয়া যায়নি।