মধ্যপ্রাচ্যের উত্তাল ভূরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক আবারও এক অনিশ্চিত মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধের অবসান ও সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি নিয়ে একদিকে আশার বার্তা শোনা যাচ্ছে, অন্যদিকে বারবার উঠে আসছে দ্বিধা, সংশয় ও বিরোধপূর্ণ অবস্থান। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে ঘোষণা দিচ্ছেন- চুক্তি কাছাকাছি, যুদ্ধের ইতি ঘটতে যাচ্ছে; অন্যদিকে নিজেই বলছেন এখনই কোনো সিদ্ধান্তে তাড়াহুড়া করতে চান না। তার এই দ্বৈত বার্তা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে অনিশ্চয়তার আবহ তৈরি করেছে।
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান আলোচনা কখনো আশাব্যঞ্জক ইঙ্গিত দিচ্ছে, আবার পর মুহূর্তেই তা থমকে যাচ্ছে জটিল বাস্তবতায়। বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ইস্যুতে ইরানের কঠোর অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের চাপ- এই দুইয়ের সংঘাত আলোচনাকে বারবার আটকে দিচ্ছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, জব্দকৃত সম্পদ, জ্বালানি রপ্তানি এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার- প্রতিটি বিষয়ই আলোচনার টেবিলে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এরই মধ্যে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে। জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন, নৌপথ নিয়ন্ত্রণ এবং সামরিক উপস্থিতি- সব মিলিয়ে শুধু দুই দেশের সম্পর্ক নয়, বরং পুরো বিশ্বের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাও এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। ফলে এই সংঘাত আর দ্বিপক্ষীয় সীমায় আবদ্ধ নেই; এটি এখন বৈশ্বিক উদ্বেগের বিষয়।
তবে পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক তৎপরতা থেমে নেই। বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারী দেশ এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলো শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সাময়িক যুদ্ধবিরতি, আংশিক সমঝোতার ইঙ্গিত এবং ধাপে ধাপে অগ্রগতির সম্ভাবনা আলোচনাকে পুরোপুরি ভেঙে পড়তে দেয়নি। কিন্তু বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে- এই উদ্যোগগুলো কি শেষ পর্যন্ত একটি কার্যকর শান্তিচুক্তিতে রূপ নেবে, নাকি আবারও অনিশ্চয়তার চক্রেই আটকে যাবে?
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ই এখন উপলব্ধি করছে যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত তাদের কারও জন্যই লাভজনক নয়। তবুও বাস্তবতা হলো- কেউই প্রথম বড় ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়। পারস্পরিক অবিশ্বাস, রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ এবং আঞ্চলিক চাপের কারণে আলোচনার পথ বারবার জটিল হয়ে উঠছে।
ইতিহাসের দীর্ঘ ছায়া: অবিশ্বাসের শেকড় কোথায়?
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের বর্তমান টানাপোড়েনের শেকড় নিহিত ১৯৭৯ সালের ইরান বিপ্লব-এ, যা কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন ছিল না, বরং ছিল এক গভীর আদর্শিক ও রাষ্ট্রীয় রূপান্তরের সূচনা। এই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বহুদিনের রাজতান্ত্রিক শাসনের অবসান ঘটে এবং একটি নতুন ধর্মভিত্তিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পশ্চিমা প্রভাব থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিতে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যা দীর্ঘদিন ধরে ইরানের সাবেক শাসকের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল, হঠাৎ করেই নতুন শাসকদের চোখে প্রতিপক্ষে পরিণত হয়। এই পরিবর্তন শুধু কূটনৈতিক সম্পর্কেই নয়, বরং পারস্পরিক দৃষ্টিভঙ্গি ও নীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে।
বিপ্লবের পরপরই তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে ঘটে যাওয়া জিম্মি সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। বিপ্লব-সমর্থিত একদল শিক্ষার্থী দূতাবাস দখল করে মার্কিন কূটনীতিক ও কর্মীদের আটক করে রাখে দীর্ঘ সময় ধরে। এই ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের জনমত ও রাজনীতিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং দুই দেশের সম্পর্ক একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকে। এর পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ শুরু করে, যা সময়ের সঙ্গে আরও কঠোর রূপ নেয়। এই দুই ঘটনার- বিপ্লব এবং জিম্মি সংকট- সমন্বিত প্রভাব ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে এমন এক পথে ঠেলে দেয়, যেখান থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ে। পারস্পরিক অবিশ্বাস ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে আঞ্চলিক অস্থিরতার উৎস হিসেবে দেখতে শুরু করে, অন্যদিকে ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে তার সার্বভৌমত্ব ও আদর্শিক অবস্থানের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে।
পরবর্তী দশকগুলোতে এই অবিশ্বাস আরও গভীর হয় বিভিন্ন ঘটনা ও নীতিগত দ্বন্দ্বের কারণে। নিষেধাজ্ঞা, সামরিক উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক সংঘাতে পরোক্ষ সম্পৃক্ততা- সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক কখনোই স্থিতিশীলতার দিকে এগোতে পারেনি। বরং প্রতিটি নতুন সংকট পুরোনো ক্ষতকে আরও গভীর করেছে।
ফলে আজ যখন শান্তি আলোচনা বা সমঝোতার কথা ওঠে, তখন সেই অতীতের অভিজ্ঞতাগুলো বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। দুই দেশই আশঙ্কা করে, অপর পক্ষ হয়তো আবারও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে পারে বা কৌশলগত সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করবে। এই মানসিকতা আলোচনার পরিবেশকে জটিল করে তোলে এবং আস্থার সংকটকে দীর্ঘস্থায়ী করে। সব মিলিয়ে বলা যায়, ১৯৭৯ সালের সেই ঐতিহাসিক পরিবর্তন শুধু একটি যুগের সমাপ্তি ঘটায়নি, বরং এমন এক দ্বন্দ্বের সূচনা করেছে, যার প্রভাব আজও বিদ্যমান। বর্তমান শান্তি আলোচনার প্রতিটি ধাপেই সেই ইতিহাসের ছায়া স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে, যা সমাধানের পথকে আরও কঠিন ও দীর্ঘায়িত করে তুলেছে।
পারমাণবিক ইস্যু- দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দু
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ এবং জ্বালানি উৎপাদনের জন্য। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা মনে করে, এই কর্মসূচির আড়ালে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।
এই সংকট নিরসনে ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত হয় জেসিপিওএ- যা “ইরান নিউক্লিয়ার ডিল” নামে পরিচিত। এতে ইরান তার পারমাণবিক কার্যক্রম সীমিত করতে সম্মত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শন মেনে নেয়। বিনিময়ে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়। তবে ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ালে পুরো প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ে। এরপর ইরান ধাপে ধাপে চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করতে শুরু করে, ফলে পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
উত্তেজনা ও কূটনীতির দ্বৈত চিত্র
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক এমন এক জটিল বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে একই সঙ্গে উত্তেজনা ও কূটনৈতিক তৎপরতা- দুটিই সমান্তরালভাবে চলছে। একদিকে সংঘাতের আশঙ্কা পুরোপুরি দূর হয়নি, অন্যদিকে পরোক্ষ সংলাপের পথও খোলা রয়েছে। এই দ্বৈত চিত্রই সম্পর্কটিকে আরও অনিশ্চিত ও জটিল করে তুলেছে। পারস্য উপসাগর অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর শক্তিশালী উপস্থিতি এবং ইরানের নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা পরিস্থিতিকে সবসময় উত্তেজনাপূর্ণ করে রাখছে। গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোতে নজরদারি বৃদ্ধি, সামরিক মহড়া এবং শক্তি প্রদর্শনের এই প্রবণতা উভয় পক্ষের মধ্যে অবিশ্বাসকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আঞ্চলিক সংঘাতে পরোক্ষ সম্পৃক্ততা, যেখানে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা চলছে। বিশেষ করে ইয়েমেন, সিরিয়া ও ইরাকের মতো সংকটপূর্ণ অঞ্চলে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয়তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতে, এসব কার্যক্রম আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে বিঘ্নিত করছে এবং তার মিত্রদের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে। অন্যদিকে ইরান দাবি করে, তারা তাদের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার জন্যই এসব পদক্ষেপ নিচ্ছে।
একই সময়ে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে যে, ওয়াশিংটন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, সামরিক চাপ এবং কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মাধ্যমে তাদের ওপর এক ধরনের সর্বাত্মক চাপ প্রয়োগ করছে। ইরানের দৃষ্টিতে এটি শুধুমাত্র রাজনৈতিক নয়, বরং অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটও সৃষ্টি করছে। ফলে দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থানকে ন্যায্য বলে মনে করে, যা সমঝোতার পথকে আরও কঠিন করে তোলে।
হরমুজ প্রণালি
বিশ্ব রাজনীতির উত্তপ্ত অক্ষ এখন হরমুজ প্রণালি, যেখানে মুখোমুখি অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান; পারস্য উপসাগর থেকে ওমান উপসাগরে প্রবেশের এই সরু করিডর দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি বহনকারী জাহাজ চলাচল করে, ফলে এখানে সামান্য উত্তেজনাও বৈশ্বিক বাজারে তেলের দামে তাৎক্ষণিক অস্থিরতা তৈরি করে এবং এ কারণেই দুই দেশের সামরিক উপস্থিতি, নজরদারি ও পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করছে যে ইরান আন্তর্জাতিক নৌচলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করে এই গুরুত্বপূর্ণ রুটকে চাপের মুখে ফেলছে; অন্যদিকে ইরান দাবি করছে, তাদের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপ সৃষ্টি করে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত এই প্রণালিকে কৌশলগতভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে, যা তাদের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি।
এই দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে রয়েছে জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক আধিপত্য; সৌদি আরব, কুয়েত, কাতারসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর অধিকাংশ তেল রপ্তানি এই পথের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায়, যেকোনো সংঘাত সরাসরি বিশ্ব অর্থনীতিতে ধাক্কা দেয়, একই সঙ্গে এশিয়া ও ইউরোপের জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
বর্তমানে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনা চললেও হরমুজ প্রণালি প্রশ্নে সমঝোতা এখনো অনিশ্চিত; যুক্তরাষ্ট্র চায় অবাধ নৌচলাচল নিশ্চিত হোক, আর ইরান চায় নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তা- এই দুই অবস্থানের সংঘাতই আলোচনাকে বারবার থামিয়ে দিচ্ছে।
অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা: চাপ ও প্রতিরোধের রাজনীতি
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আসছে। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যেমন: তেল রপ্তানি কমে গেছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকুচিত হয়েছে, মুদ্রাস্ফীতি বেড়েছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইরান এই নিষেধাজ্ঞাকে “অর্থনৈতিক যুদ্ধ” হিসেবে আখ্যা দেয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, এই চাপই ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে কার্যকর হাতিয়ার। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে- অর্থনৈতিক চাপ বাড়লেও ইরান তার কৌশলগত অবস্থান থেকে সহজে সরে আসছে না।
কেন থমকে আছে শান্তি আলোচনা?
কেন থমকে আছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা- এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই সামনে আসে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাসের দেয়াল। চার দশকের বেশি সময় ধরে দুই দেশের সম্পর্ক সংঘাত, নিষেধাজ্ঞা ও পরস্পরবিরোধী কৌশলের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। ফলে আজও যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, ইরান আন্তর্জাতিক চুক্তি মানার ক্ষেত্রে পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য নয়। অন্যদিকে ইরানের দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্র একটি “অস্থির অংশীদার”- যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নীতিও বদলে ফেলে। ২০১৫ সালের জেসিপিওএ (ঔঈচঙঅ) থেকে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা সরে দাঁড়ানো এই অবিশ্বাসকে আরও গভীর করেছে।
অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতাও এই অচলাবস্থার বড় কারণ। যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ইরানের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতাকে সন্দেহের চোখে দেখে, বিশেষ করে যারা মনে করে ইরানকে ছাড় দিলে তা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হবে। একইভাবে ইরানের ভেতরেও শক্তিশালী রক্ষণশীল বা কঠোরপন্থী গোষ্ঠী রয়েছে, যারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি গভীর অবিশ্বাস পোষণ করে এবং পশ্চিমা প্রভাবকে প্রতিহত করাকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। ফলে দুই দেশের সরকারই চাইলেও সহজে আপস করতে পারে না; তাদেরকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ বিবেচনায় রাখতে হয়।
আঞ্চলিক রাজনীতিও এই সমীকরণকে জটিল করে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিধর দেশগুলো-বিশেষ করে ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো- ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তির বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, ইরানকে অর্থনৈতিক বা কূটনৈতিকভাবে শক্তিশালী করে তুললে তা আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে। এই দেশগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগ যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলে, ফলে ওয়াশিংটনকে শুধু দ্বিপক্ষীয় নয়, বহুপক্ষীয় বাস্তবতাও বিবেচনা করতে হয়।
এর পাশাপাশি রয়েছে তথাকথিত “প্রক্সি যুদ্ধ” ইস্যু। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়ে তার প্রভাব বিস্তার করছে। ইয়েমেন, সিরিয়া ও লেবাননের মতো অঞ্চলে এই প্রভাব স্পষ্ট বলে মনে করা হয়। ইরান অবশ্য এসব কর্মকাণ্ডকে তার নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবে দেখে। কিন্তু এই প্রক্সি সংঘাত চলতে থাকলে পারস্পরিক আস্থা তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে, যা একটি দীর্ঘমেয়াদি শান্তি চুক্তির পথে বড় বাধা।
তবে সম্পূর্ণ অচলাবস্থা সত্ত্বেও কূটনীতির দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা। যেমন ওমান বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে গোপন সংলাপের একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করেছে। একইভাবে কাতার সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে সংলাপ এগিয়ে নিতে চেষ্টা করছে। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ঔঈচঙঅ পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
সাধারণ মানুষের প্রভাব
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিনের সংঘাত ও উত্তেজনার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের ওপর, যা প্রায়শই রাজনৈতিক আলোচনার আড়ালে চাপা পড়ে যায়। এই দ্বন্দ্বের ফলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে ইরানের সাধারণ জনগণ। যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির অর্থনীতি ব্যাপক চাপে রয়েছে। তেল রপ্তানি কমে যাওয়া, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি- সব মিলিয়ে মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। খাদ্য, ওষুধ ও চিকিৎসা সেবার মতো মৌলিক প্রয়োজন মেটাতেও অনেকের হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাওয়া, বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার ফলে তাদের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে হতাশা বাড়ছে, কারণ তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণও এই সংঘাত থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত নয়। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, যার পরোক্ষ চাপ পড়ে দেশের অর্থনীতিতে। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক উত্তেজনা বাড়লে জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা দেখা দেয়, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তি এখন এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে- যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপই গুরুত্বপূর্ণ, আর সামান্য ভুল সিদ্ধান্ত পুরো প্রক্রিয়াকে আবার শূন্যে ফিরিয়ে দিতে পারে। তাই প্রশ্ন থেকেই যায়- এই অনিশ্চয়তার দোলাচল কাটিয়ে কি সত্যিই সম্ভব হবে স্থায়ী শান্তির পথে এগোনো, নাকি এই দ্বন্দ্ব আরও দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্ব রাজনীতিকে প্রভাবিত করে যাবে?
শীর্ষনিউজ