Image description
৮ জুন তেল আবিবে ইরানি হামলার পর হাসপাতালের কর্মীরা নিরাপত্তার জন্য ইনকিউবেটরে থাকা একটি শিশুকে ভূগর্ভস্থ একটি স্থাপনায় স্থানান্তর করছেন । সূত্র: এএফপি

ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা বাড়ার পর ইসরাইলের রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নীতির সমালোচনা করে ইরানের বিরুদ্ধে আরো সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে কথা বলছেন, অন্যরা নতুন করে যুদ্ধ শুরুর নিন্দা জানিয়ে সম্ভাব্য পরিণতির বিষয়ে সতর্ক করছেন।

রোববার রাতের ইরানি হামলা ইসরাইলের অনেককেই অবাক করেছে। চ্যানেল থার্টিন নিউজের সামরিক সংবাদদাতা অ্যালন বেন ডেভিড জানিয়েছেন, ইসরাইলের ধারণা ছিল যে ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র যৌথ যুদ্ধের পর ইরান ইসরাইলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার ‘সাহস করবে না’।

এর আগে রোববার সকালে বৈরুতের দক্ষিণে একটি ভবনে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী হামলা চালায়, যা যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন বলে নিন্দা করেছিল ইরান। বেন ডেভিডের মতে, ‘নামমাত্র প্রতীকী’ ওই হামলায় দুজন লেবানিজ নাগরিক নিহত হন। এর জের ধরেই রাতে এই উত্তেজনা তৈরি হয়।

গণমাধ্যমে ইরানি হামলা এবং ইসরাইলের প্রতিক্রিয়া নিয়ে ব্যাপক আলোচনার পাশাপাশি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যের ওপরও বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে, যিনি নেতানিয়াহুকে ইরানে হামলা না করার আহ্বান জানিয়েছেন। কিছু ইসরাইলি সমালোচক নেতানিয়াহুর সমালোচনা করে বলছেন, তিনি জাতীয় নিরাপত্তার সিদ্ধান্ত বিদেশি নেতাদের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন।

মা’আরিভ পত্রিকার প্রবীণ ইসরাইলি সাংবাদিক বেন ক্যাসপিট ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তাকে ‘বেসরকারীকরণ’ করে ট্রাম্পের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে এবং সামরিক সিদ্ধান্তের জন্য এখন ওয়াশিংটনের অনুমোদনের প্রয়োজন হচ্ছে।

তার সহকর্মী আভি আশকেনাজি বলেন, ‘ইসরাইলের উচিত হবে না চুপচাপ বসে থাকা এবং প্রতিক্রিয়া না দেখানোর এই মার্কিন নির্দেশ মেনে নেওয়া।’

এটি ইসরাইলের অস্তিত্বকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।

ইরানের রকেট হামলার কয়েক ঘণ্টা পর ইসরাইল তেহরানসহ অন্যান্য শহরে বিমান হামলা চালায়। সোমবারও দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি অব্যাহত থাকলে ট্রাম্প প্রকাশ্যে উভয় পক্ষকে ‘অবিলম্বে গোলাগুলি বন্ধ করার’ আহ্বান জানান।

তবে ট্রাম্পের প্রভাবের সমালোচনার পাশাপাশি অন্যান্য বিশ্লেষকরা এই ঘটনাকে চলতি বছরের শুরুতে ইরানের বিরুদ্ধে চালানো যৌথ ইসরাইল-মার্কিন যুদ্ধের ব্যর্থতার প্রমাণ হিসেবে দেখছেন। ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের (আইএনএসএস) ইসরাইল-ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড্যানি সিট্রিনোভিচ বলেন, ‘এই উত্তেজনা প্রমাণ করে ইরানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক অভিযানটি একটি শোচনীয় কৌশলগত ব্যর্থতা ছিল।’

এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে এক পোস্টে সিট্রিনোভিচ বলেন, ‘ইসরাইল এখন একটি ভাগ্যনির্ধারক দ্বিধার মুখোমুখি, প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাথে সরাসরি দ্বন্দ্বে জড়ানো, অথবা বিরত থেকে লেবাননে ইসরাইলি হামলা সীমিত হওয়ার ঝুঁকি নেওয়া।’

তিনি আরো বলেন, ‘ইসরাইল-মার্কিন যুদ্ধ ইরান সরকারকে উৎখাত করতে ব্যর্থ হওয়ার পর এখন ইসরাইলের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ কমে গেছে, ইরানের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিকভাবে এই সংকট সমাধানের ইচ্ছা তৈরি হচ্ছে।’

হারেৎস পত্রিকার সামরিক বিষয়ক বিশ্লেষক আমোস হারেল বলেন, ‘এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর নেতানিয়াহু ক্রমাগত যুদ্ধ পুনরারম্ভের জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। রোববারের এই উত্তেজনা ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী এবং ট্রাম্পের মধ্যে বাড়তে থাকা দূরত্বকে প্রতীকায়িত করে।’

এদিকে, ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ একাধিক জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। স্কুল-কলেজ ও গণজমায়েত বাতিল করা হয়েছে, গণপরিবহন এবং হাসপাতালগুলো সীমিত পরিসরে কাজ করছে এবং সামরিক বাহিনী বেন গুরিওন বিমানবন্দরে আগমন সীমিত করার দাবি জানিয়েছে।

নেতানিয়াহু এখন পর্যন্ত এই উত্তেজনা নিয়ে কোনো মন্তব্য না করলেও, তার মন্ত্রীরা ইরানে বোমা হামলার দাবি তুলেছেন। চ্যানেল টুয়েলভ নিউজের সিনিয়র সাংবাদিক অমিত সেগালের মতে, ‘অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ সোমবারের ক্যাবিনেট বৈঠকে দাবি করতে পারেন যে ইসরাইলে নিক্ষিপ্ত প্রতিটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের বিনিময়ে দক্ষিণ বৈরুতের শহরতলির অসংখ্য ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া হোক।’

ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গভির বলেন, ‘তেহরান অবশ্যই জ্বলবে।’

সংস্কৃতি মন্ত্রী মিকি জোহর নেতানিয়াহুকে ইরানে হামলা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে তারা কেবল শক্তি ও ক্ষমতাই বোঝে।’

ইরানে হামলার পক্ষে সমর্থন এসেছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের মতো বিরোধীদলীয় নেতাদের কাছ থেকেও। এক্সে তিনি লিখেছেন, ‘এটি সত্যের মুখোমুখি হওয়ার মুহূর্ত, ইসরাইল কী একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র যে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম? ইসরাইলকে অবশ্যই শক্তি ও কার্যকারিতার সাথে কাজ করতে হবে।’

ডানপন্থি বিরোধীদল ইসরাইল বেইতেনু পার্টির নেতা অ্যাভিগডোর লিবারম্যান বলেন, ‘আমাদের অবিলম্বে প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে এবং ইরানের কৌশলগত অবকাঠামোতে আঘাত করতে হবে।’

সাবেক সেনাপ্রধান বেনি গান্তজ বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে লেবাননে যুদ্ধ বন্ধ করা একটি ভুল ছিল এবং এই কৌশলগত ভুলটি ইরানের ওপর জোরালো জবাবের মাধ্যমে সংশোধন করতে হবে।

এদিকে, ইসরাইলি সামরিক বাহিনী রিজার্ভ সৈন্যদের একত্রিত করছে বলে জানা গেছে। চ্যানেল টুয়েলভ ইঙ্গিত দিয়েছে, কয়েকদিন ব্যাপী লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব বর্তমান উত্তেজনাকে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইল-মার্কিন যৌথ প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতা এবং ইরানি রাষ্ট্রে আঘাত করার একটি সুযোগ হিসেবে দেখছে।

তবে সব বিরোধী নেতা এই যুদ্ধ ফিরে আসাকে স্বাগত জানাননি। ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলান এক্স-এ লিখেছেন, ‘আমাদের শত্রুরা তা-ই দেখছে যা সবাই দেখতে পাচ্ছে, নেতানিয়াহু দুর্বল।’

তিনি আরো বলেন, ‘ইসরাইলকে আরেকটি যুদ্ধে জড়ানোর কোনো ম্যান্ডেট এই সরকারের নেই।

গোলান বলেন, ‘নেতানিয়াহু লেবাননে উত্তেজনা বাড়িয়েছেন পুরো অঞ্চলে আগুন লাগিয়ে নির্বাচন এড়ানোর জন্য।’

একই দলের আইনপ্রণেতা গিলাদ কারিভ এক্স-এ বলেন, ‘নেতানিয়াহু ইসরাইলের নাগরিক এবং রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। বর্তমান সরকার প্রতিটি ইসরাইলি পুরুষ ও নারীর নিরাপত্তা বিপন্ন করছে।’

সূত্র: মিডল ইস্ট আই