যৌন নিপীড়ন ও গুরুতর পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রধান কৌঁসুলি (চিফ প্রসিকিউটর) করিম খানকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। বৃটিশ এই আইনজীবীর বিরুদ্ধে দীর্ঘ তদন্ত ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা প্রক্রিয়ার শুনানি শেষে সোমবার রাতে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আইসিসির গভর্নিং বডি আনুষ্ঠানিকভাবে এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন গার্ডিয়ান। বিশ্বের যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারকারী সর্বোচ্চ এই আদালতের ইতিহাসে কোনো প্রধান প্রসিকিউটরের এভাবে বরখাস্ত হওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম।
গার্ডিয়ানের হাতে আসা আদালতের একটি গোপন নথি থেকে জানা গেছে, আইসিসির ২১টি সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত কার্যনির্বাহী কমিটি ‘কোয়ালিফাইড মেজরিটি’ বা বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের মাধ্যমে করিম খানকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। কমিটি স্পষ্ট জানিয়েছে, তদন্তে করিম খানের বিরুদ্ধে ওঠা যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এবং গুরুতর অসদাচরণের প্রমাণ মিলেছে। জাতিসংঘের একটি স্বাধীন নজরদারি সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক বিচার বিভাগীয় বিশেষজ্ঞদের একটি বিশেষ প্যানেলের যৌথ তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। একই সাথে অভিযোগকারী নারী এবং করিম খানের লিখিত বক্তব্যও পর্যালোচনা করেছে কমিটি।
হোটেল রুম থেকে কার্যালয়, কী ছিল অভিযোগ? : বৃটেনের খ্যাতনামা এই আইনজ্ঞের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের শেষের দিকে প্রথম এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সামনে আসে। হেগে আইসিসির সদর দপ্তরে করিম খানের অধীনেই কর্মরত একজন নারী কর্মী এই মামলা দায়ের করেন। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশে দাপ্তরিক সফরের সময় হোটেলের রুমে, করিম খানের নিজস্ব কার্যালয়ে এবং এমনকি তার ব্যক্তিগত বাসভবনেও ওই নারীর ওপর জোরপূর্বক ও সম্মতিহীন যৌন আচরণ করা হয়। ক্ষমতার অপব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে এই মানসিক ও শারীরিক নিপীড়ন চালানো হয়েছিল বলে ভুক্তভোগী দাবি করেন।
সম্পূর্ণ অস্বীকার করিম খানের: অভিযোগের শুরু থেকেই আইনজীবী করিম খান এবং তার আইনি দল সমস্ত দাবিকে ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তার আইনজীবীদের পক্ষ থেকে পুনরায় জানানো হয়েছে, করিম খান কোনো কর্মীকে হেনস্তা বা অপব্যবহারের অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করছেন। তিনি কখনোই নিজের পদের ক্ষমতার অপব্যবহার করেননি এবং এমন কোনো আচরণ করেননি যা জোরপূর্বক, শোষণমূলক বা পেশাগতভাবে অনুপযুক্ত বলে গণ্য হতে পারে।
করিম খান গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির জন্য সফল আবেদন করেন। এতে আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় আসেন বৃটিশ এই আইনজীবী। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষোভ জানায়। এর পরপরই তিনি ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার শিকার হন।
চূড়ান্ত অপসারণের মুখে আইসিসি প্রসিকিউটর: আইসিসির গভর্নিং বডি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বর্তমান বরখাস্তের সিদ্ধান্তটি সাময়িক এবং এটি চূড়ান্ত রায় নয়। তবে পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হওয়ায় কার্যনির্বাহী কমিটি পুরো প্রক্রিয়াটি এখন আইসিসির ১২৫টি সদস্য রাষ্ট্রের সাধারণ অধিবেশনে পাঠানোর পক্ষে ভোট দিয়েছে। খুব শীঘ্রই সদস্য রাষ্ট্রগুলোর একটি বিশেষ অধিবেশন ডাকা হবে, যেখানে করিম খানকে স্থায়ীভাবে পদ থেকে বরখাস্ত করা হবে কি না, তা চূড়ান্ত ভোটের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। এই আইনি জটিলতার কারণে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। তবে করিম খান ২০২৫ সালের মে মাস থেকেই স্বেচ্ছায় অবসরে রয়েছেন।