Image description

২০২০ সালের ডিসেম্বরে তুরস্কের তখনকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত সাভাসগলু ঢাকা সফর করেছিলেন। করোনাভাইরাস সংক্রমণের আগে ওই সফরের তাৎপর্য বোঝাতে গিয়ে তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের ওয়েবসাইটে মেভলুত সাভাসগলুকে উদ্ধৃত করে লিখেছিল, ‘বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম উদীয়মান তারকা এবং আমাদের “এশিয়া এনিউ” উদ্যোগের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের মধ্যে অন্যতম।’

ছয় বছরের মাথায় তুরস্কের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বাংলাদেশে এলেন। তিন দিনের সফর শেষে ফিরে গেছেন তিনি। তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। ওই বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ককে পরের ধাপে নিতে তিনটি কাঠামো প্রতিষ্ঠার ঘোষণা আসে। তা হলো দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের অংশগ্রহণে প্রতিবছর ‘২+২ বৈঠক’, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক বৈঠক পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে উন্নীত করা এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা আরও জোরদার করার লক্ষ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি পরামর্শক কমিটি গঠন।

বাংলাদেশ ও তুরস্ক দুই দেশের সম্পর্ককে পরের ধাপে নিতে তিনটি কাঠামো প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছে। তা হলো দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের অংশগ্রহণে প্রতিবছর ‘২+২ বৈঠক’, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক বৈঠক পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে উন্নীত করা এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা আরও জোরদার করার লক্ষ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি পরামর্শক কমিটি গঠন।

তুরস্কের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্বের বিষয়ে মেভলুত সাভাসগলু ছয় বছর আগে যেটা বলে গিয়েছিলেন, প্রথমবারের মতো ঢাকায় এসে হাকান ফিদান ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ককে পরের ধাপে নিতে আঙ্কারা কী কী করতে চায়, তা স্পষ্টভাবে জানিয়ে গেলেন।

এ মুহূর্তে বিশ্বের বড় ও উদীয়মান শক্তিগুলো তাদের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের অংশগ্রহণে প্রতিবছর ‘২+২ বৈঠক’ করে থাকে। যে বৈঠকে দুই পক্ষের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়।

যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, নেদারল্যান্ডস আর ভারত—বিশ্বের চারটি দেশের সঙ্গে এই কাঠামোর আওতায় নিয়মিত বৈঠক করে থাকে তুরস্ক। তালিকায় পঞ্চম দেশ হিসেবে যুক্ত হলো বাংলাদেশ। অবশ্য অনিয়মিতভাবে ইউক্রেন আর ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে তুরস্ক ‘২+২ বৈঠক’ করে।

কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, হাকান ফিদানের সফরে ঘোষিত নতুন তিনটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ককে আর কেবল বাণিজ্য বা উন্নয়ন সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না আঙ্কারা। বরং নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সহযোগিতাকে অন্তর্ভুক্ত করে সম্পর্ককে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে। এটি বাংলাদেশের প্রতি তুরস্কের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত আগ্রহেরও প্রকাশ ঘটায়।

আমরা বিস্তৃত পরিসরে আমাদের দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্বকে আরও গভীর করার এবং দৃঢ় ভিত্তির ওপর এটিকে আরও শক্তিশালী ও দূরদর্শী পর্যায়ে উন্নীত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখছি।
হাকান ফিদান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, তুরস্ক

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তুরস্কের অগ্রাধিকার আর ‘এশিয়া এনিউ’ নীতি বা উদ্যোগের গুরুত্বটা কোথায়। আর বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কটা তুরস্ক কীভাবে এগিয়ে নিতে চায়?

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ঢাকায় পৌঁছানোর পর বিমানবন্দরে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয় তাঁকে
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ঢাকায় পৌঁছানোর পর বিমানবন্দরে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয় তাঁকেফাইল ছবি: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

তুরস্কের এশিয়া নীতি কী

তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, ২০১৯ সালের আগস্টে ‘এশিয়া এনিউ’ শিরোনামে পররাষ্ট্রনীতি ঘোষণা করে রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান সরকার। এ উদ্যোগ মূলত নেওয়া হয় এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও কৌশলগত পরিসরে সম্পর্ক জোরদারের জন্য।

বৈশ্বিক অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির ভরকেন্দ্র যে ক্রমশ এশিয়ার দিকে সরে যাচ্ছে, তুরস্ক এটা বুঝতে পেরেই এশিয়া এনিউ উদ্যোগটি গ্রহণ করেছে। আঞ্চলিক, উপ–আঞ্চলিক ও দেশভিত্তিক কৌশল গ্রহণের মাধ্যমে এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ককে আরও সুসংগঠিত, ধারাবাহিক ও টেকসই করাই এর উদ্দেশ্য।

এই উদ্যোগের অন্যতম অগ্রাধিকার হলো পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগপ্রবাহ বৃদ্ধি করা।

কাঠামোর মূল অগ্রাধিকার

তুরস্কের এশিয়া নীতির প্রধান অঙ্গ চারটি। এগুলো হচ্ছে সরকারি পরিসরে সহযোগিতা জোরদার; বাণিজ্য, বিনিয়োগের পাশাপাশি বেসরকারি সহযোগিতা বাড়ানো; শিক্ষা, বিজ্ঞান ও কারিগরি খাতে সহযোগিতার সম্প্রসারণ; সাংস্কৃতিক বিনিময় ও জনপরিসরে সহযোগিতা বাড়ানো।

বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ১৩০ কোটি ডলার থেকে ২০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার সম্ভাব্য উপায়গুলো খুঁজে দেখার কথা ভাবছে আঙ্কারা। হাকান ফিদান ঢাকায় বলে গেছেন, ‘বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বিশেষ করে প্রতিরক্ষাশিল্পে আমাদের সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য আমরা পদক্ষেপ নিতে পারি।’

বাংলাদেশকে আর শুধু একটি দ্বিপক্ষীয় অংশীদার নয়, বরং একটি কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখতে শুরু করেছে তুরস্ক। কারণ, ‘২+২ বৈঠক’ সাধারণত যেসব দেশের সঙ্গে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছায়, তাদের ক্ষেত্রেই চালু করা হয়।

‘এশিয়া এনিউ’ উদ্যোগে উচ্চ মূল্যসংযোজন ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প, পর্যটন, অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা শিল্প, অবকাঠামো, পরিবহন, লজিস্টিকস, সবুজ জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এশিয়ার দেশগুলোকে ঘিরে তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতি–বিষয়ক উদ্যোগে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপসহ দক্ষিণ এশিয়া, আসিয়ানভুক্ত সব দেশ, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো, মধ্য এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো অন্তর্ভুক্ত আছে।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। তিনি ২০১৯ সালে ঘোষণা করেন, ‘এশিয়া এনিউ’ পররাষ্ট্রনীতি
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। তিনি ২০১৯ সালে ঘোষণা করেন, ‘এশিয়া এনিউ’ পররাষ্ট্রনীতিফাইল ছবি: এএফপি

বাংলাদেশের গুরুত্ব কোথায়

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এশিয়া এনিউ উদ্যোগ ক্রমেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ, এ উদ্যোগই এমন একটি নীতিগত কাঠামো তৈরি করেছে, যার আওতায় তুরস্ক ঢাকা-আঙ্কারা সম্পর্ককে নতুন মাত্রায় সম্প্রসারণ করছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়গুলোতে জোর দেওয়া হচ্ছে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ অবকাঠামো উন্নয়ন, উচ্চশিক্ষা বিনিময়, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন, সুনীল অর্থনীতি ও সমুদ্রবিষয়ক সহযোগিতায়।

ঢাকায় দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে হাকান ফিদান বলেছিলেন, ‘আমরা বিস্তৃত পরিসরে আমাদের দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্বকে আরও গভীর করার এবং দৃঢ় ভিত্তির ওপর এটিকে আরও শক্তিশালী ও দূরদর্শী পর্যায়ে উন্নীত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখছি।’

ঢাকা-আঙ্কারা সম্পর্ককে কৌশলগত মাত্রায় উন্নীত করতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে নজর থাকবে। সার্বিকভাবে ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা যে গভীর হবে, সেটা বোঝাই যাচ্ছে।
আ ন ম মুনীরুজ্জামান, প্রেসিডেন্ট, বিআইপিএসএস

দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা থেকে কৌশলগত অংশীদার

বাংলাদেশকে আর শুধু একটি দ্বিপক্ষীয় অংশীদার নয়, বরং একটি কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখতে শুরু করেছে তুরস্ক। কারণ, ‘২+২ বৈঠক’ সাধারণত যেসব দেশের সঙ্গে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছায়, তাদের ক্ষেত্রেই চালু করা হয়।

পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের একই কাঠামোয় আনা সম্পর্ককে বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতার বাইরে নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক মাত্রায়ও উন্নীত করার ইঙ্গিত দেয়।

বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায় তুরস্ক। অনেক সময় ব্যক্তিনির্ভর বা সরকারনির্ভর সম্পর্ক রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু বার্ষিক পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক ও পরামর্শক কমিটি গঠনের মাধ্যমে তুরস্ক বোঝাতে চাইছে যে তারা সম্পর্ককে নিয়মিত, কাঠামোবদ্ধ ও স্থায়ী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে আগ্রহী।

বাংলাদেশ সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান
বাংলাদেশ সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানফাইল ছবি: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

বাংলাদেশের প্রতি তুরস্কের কৌশলগত গুরুত্ব বেড়েছে।

সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশ এখন দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি, বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক ভূরাজনৈতিক অবস্থান এবং মুসলিম বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ফলে এশিয়া এনিউ উদ্যোগের আওতায় বাংলাদেশকে আঞ্চলিক অংশীদার হিসেবে অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে তুরস্ক।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইপিএসএস) প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান মনে করেন, দুই দেশের সম্পর্ককে পরের ধাপে নিতে যে তিনটি কাঠামোর বিষয়ে দুই দেশ রাজি হয়েছে, তা অংশীদারত্বে যোগ করবে নতুন মাত্রা।

আ ন ম মুনীরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা-আঙ্কারা সম্পর্ককে কৌশলগত মাত্রায় উন্নীত করতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে নজর থাকবে। সার্বিকভাবে ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা যে গভীর হবে, সেটা বোঝাই যাচ্ছে।