পতিত আওয়ামী সরকারের সময়ে ২০১১ সালে চরম অমানবিকভাবে চাকরিচ্যুত করা হয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৮৮ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে। দীর্ঘ ১৪ বছরের বঞ্চনা আর হতাশার পর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের জুনে আদালতের রায় ও সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চাকরিতে পুনর্বহালের সুযোগ পান তারা। এতে সংশ্লিষ্টদের মাঝে বেশ আনন্দ-উচ্ছ্বাস দেখা দিলেও তাতে নতুন করে জটিলতা দেখা দিয়েছে।
নিয়মানুযায়ী বকেয়া বেতন ও পদোন্নতি সুবিধা পাওয়ার কথা থাকলেও তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। নতুন করে যোগদানের পর কয়েক দফায় অনেকে পদোন্নতি পেলেও চরম অনিশ্চয়তায় আছে তাদের ১৪ বছরের বকেয়া বেতন। তাছাড়া কাঙ্ক্ষিত পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় অনেকের মাঝে হতাশা দেখা দিয়েছে বলে জানা গেছে।
যদিও বকেয়া বেতনের বিষয়ে আপিল বিভাগের রায়ের ব্যাখ্যা চেয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি প্রদান এবং সংশ্লিষ্ট বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
সূত্রমতে, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২০০৩ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য প্রফেসর ড. আফতাব আহমাদের সময়ে ৯৮৮ কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগের প্রক্রিয়া
শুরু হয়। ২০০৪ সালের ৫ জানুয়ারি তিনটি দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় এবং ২০০৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ৬৫তম সিন্ডিকেট সভার মাধ্যমে তাদের নিয়োগ অনুমোদন করা হয়। কিন্তু ওই নিয়োগে মুক্তিযোদ্ধা কোটা সংরক্ষণ না করার ঠুনকো অজুহাতে মামলা করেন জাতীয় পার্টির তৎকালীন এমপি ফজলে রাব্বি মিয়া। ২০০৬ সালে আদালতে সেটি খারিজ হয়ে যায়। তবে পরে ২০১০ সালে ফ্যাসিবাদী সরকারের তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী মোজাম্মেল হকের করা রিভিউ মামলার রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১১ সালে তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়।
এদিকে দীর্ঘ সময় বেকার থাকায় বিনা চিকিৎসায় এবং অনাহারে প্রায় অর্ধশত কর্মকর্তা-কর্মচারী মৃত্যুবরণ করেন। কেউ বিদেশে, কেউ অন্য পেশায় যুক্ত হন। জুলাই বিপ্লবের পর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে এই ৯৮৮ জনকে সিনিয়রিটিসহ চাকরিতে পুনর্বহালের নির্দেশ দেওয়া হয়। এই রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের জুনে ৮৭৬ জন যোগদান করেন।
তা ছাড়া ২০২৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত জরুরি সিন্ডিকেট সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, চাকরির ধারাবাহিকতা রক্ষা করে জ্যেষ্ঠতা, বকেয়া বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধা দিয়ে তাদের পুনর্বহাল নিশ্চিত করা হবে। কিন্তু বাস্তবে আদালতের এই রায় ও সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত নানাভাবে উপেক্ষা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেছেন।
সূত্রমতে, পুনর্বহালের নির্দেশনা অনুযায়ী ১৪ বছর আগে যে যে পদে ছিলেন, সেখানেই যোগদান করেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মধ্যে ডেপুটি রেজিস্ট্রার/সমমান, সহকারী রেজিস্ট্রার/সমমান, সেকশন অফিসার, উচ্চমান সহকারী, নিম্নমান সহকারী, অফিস সহায়ক এবং টেকনিক্যাল পদধারীরা রয়েছেন। যোগদানের তিন মাসের মাথায় যোগ্য প্রায় ৩০০ জনকে সাধারণ একটি পদোন্নতি দেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ে পদোন্নতি দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম ও নানাভাবে বঞ্চনার অভিযোগ ওঠে।
ভুক্তভোগীরা জানান, আদালতের রায় অনুযায়ী প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে চাকরিতে পুনর্বহাল হওয়া কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সিনিয়রিটি বাস্তবায়ন না করে বিধিবহির্ভূতভাবে পদোন্নতির বিজ্ঞাপন জারি এবং মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে উচ্চমান সহকারী থেকে ৭৮ জনকে সেকশন অফিসার, সেকশন অফিসার থেকে ৭৭ জনকে সহকারী রেজিস্ট্রার এবং সহকারী রেজিস্ট্রার থেকে ৬২ জনকে পদোন্নতি দেয়। এভাবে ২১৭ জনের পদোন্নতি হলেও বাকিরা বঞ্চিত রয়েছেন। তা ছাড়া তৃতীয় শ্রেণিপ্রাপ্তদের পদোন্নতি দিলেও উচ্চতর ডিগ্রিধারীকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
অন্যদিকে অষ্টম ও নবম গ্রেডে যোগদানকারী, চারটি এবং একাধিক প্রথম শ্রেণিপ্রাপ্ত এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাতালিকায় স্থানপ্রাপ্ত অনেক যোগ্য কর্মকর্তাকে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এ নিয়ে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে।
সিলেকশন কমিটি নিয়েও প্রশ্ন তুলে সংশ্লিষ্টরা জানান, বিধি মোতাবেক কোনো উপকারভোগী সিলেকশন কমিটির সদস্য হতে পারে না। কিন্তু বিধি ভঙ্গ করে প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের সিলেকশন কমিটির সদস্য করে আত্মীয়স্বজনদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এমনকি যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকা কর্মকর্তাও পদোন্নতি পেয়েছেন। এর আগে ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে বঞ্চনার অজুহাতে ফ্যাসিবাদের দোসরদেরও পদোন্নতি দেওয়া হয়। এছাড়া জুলাইযোদ্ধা জুনায়েদের করা মামলার আসামিরাও বহাল তবিয়তে চাকরি করছেন। ছাত্রলীগের পদধারী সাবেক নেতারাও গুরুত্বপূর্ণ পদে বসে আছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনর্বহাল হওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বকেয়া বেতন ও পদোন্নতি বঞ্চনাসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ও প্রতিকার চেয়ে ভুক্তভোগীরা ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন করেছেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএসএম আমানুল্লাহ আমার দেশকে জানান, আমি নিয়োগ পাওয়ার পর আওয়ামী আমলে চাকরিচ্যুতদের যোগদানের সুযোগ করে দিই। প্রথমে তাদের সাধারণ একটি এবং পরবর্তী সময়ে অনেকের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বোর্ড বসে পদোন্নতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আস্তে আস্তে সবাই সব সুযোগ-সুবিধা পাবেন। এক্ষেত্রে কোনো বেইনসাফি করা হবে না।
তবে ১৪ বছরের বকেয়া বেতনের বিষয়ে অধ্যাপক আমানুল্লাহ জানান, এটি হাজার কোটি টাকার বিষয়। এ বিষয়ে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমাদের পক্ষ থেকে আপিল বিভাগের রায়ের বিষয়টির ব্যাখ্যা চেয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি। সেই রিপোর্টের অপেক্ষায় আছি।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্যাসিবাদের দোসরদের সুবিধা দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। আমি আসার পর ৮১ জনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। আরো যারা আছেন, তারা ক্রিমিনাল না হলে বের করে দেওয়া যায় না। তবে অনেকে (আওয়ামীপন্থি) টেকনিক্যাল দক্ষ হিসেবে বিভিন্ন সেকশনে চাকরি করছেন। তা ছাড়া তিনি আসার আগেই আওয়ামীপন্থিরা কিছু পদোন্নতি পেয়েছেন বলেও জানান।