Image description

টানা গেল কয়েক মাস রাজনীতিতে ছিল মাঠ দখলের লড়াই। বিরোধী দল বিএনপি আগস্ট থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ঢাকাসহ সারা দেশে রাজপথে কর্মসূচি পালন করেছে। জবাবে আওয়ামী লীগও ওসব জায়গায় পাল্টা কর্মসূচি দিয়ে মাঠ নিজেদের দখলে রাখার চেষ্টা করে। এমন মাঠ যুদ্ধের পর এবার জোট বাড়ানোয় মনোযোগ দিচ্ছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। 

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানান, তারা সরকারবিরোধী আন্দোলনে শুধু জামায়াত কেন; সবাইকেই সঙ্গে চান। যুগপৎ আন্দোলনে সমমনা শরিক বাড়াতে মরিয়া তারা। আর আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেন, পরিস্থিতি বুঝে আমরাও জোটের কলেবর বাড়ানোর চিন্তা করব। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন শেখ হাসিনা। 

১০ ডিসেম্বর ঢাকার সমাবেশ ঘিরে রাজনীতিতে বেশ উত্তাপ ছড়ায়। বিএনপি নয়াপল্টনের রাজপথ দখলের চেষ্টা করে। সরকার তাতে বাধা দেয়। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ঢাকার অলিগলিতে পাহারা বসায়। জাতীয় কাউন্সিল ঘিরে সরকারি দল চেয়েছে মাঠ নিজেদের দখলে রাখতে; বিএনপিও চেয়েছে মাঠে থাকতে। রাজনীতির মাঠ নিয়ে এমন লড়াইয়ের পর এবার নিজেদের শক্তি বাড়ানোয় মনোযোগ দিয়েছে প্রধান দুই দল।

বিএনপি ইতিমধ্যে সরকারবিরোধী বৃহত্তর আন্দোলনের জন্য সমমনা ডান, বাম ও ইসলামি দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা সেরে যুগপৎ আন্দোলনে নেমেছে। যুগপৎ আন্দোলনের শক্তি বাড়াতে তারা আরও কয়েকটি দলের সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। বিএনপি এই আন্দোলনে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে পেয়েছে জামায়াতকে। তারা ইতিমধ্যে সারা দেশে বিএনপির কর্মসূচির সঙ্গে তাল মিলিয়ে গণমিছিল করেছে।

২০ দল বিলুপ্ত : ১২ দলীয় জোট : দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের ১২ শরিক দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন জোট গড়েছে। নতুন এই জোটে আছে জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর), কল্যাণ পার্টি, লেবার পার্টি, জাতীয় দল, বাংলাদেশ এলডিপি, জাতীয় গণতান্ত্রিক দল-জাগপা (তাসমিয়া প্রধান), এনডিপি, এলডিপি (সেলিম), মুসলিম লীগ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোট, ইসলামিক পার্টি ও সাম্যবাদী দল। কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম জানান, ২০ দলীয় জোটের বিলুপ্তিটা আনুষ্ঠানিকভাবে হয়নি, অনানুষ্ঠানিভাবে হয়েছে।

এই ১২ দলীয় জোটে নেই জামায়াতে ইসলামী ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপি, যার সভাপতির নাম অলি আহমদ বীর বিক্রম। তবে তারা বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে যুক্ত আছেন। এই ১২ দলে নিবন্ধিত দল মাত্র দুটি। বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি এবং অন্যটি বাংলাদেশ মুসলিম লীগ।

বিশ দল ভেঙে আসছে ছয় দলীয় জোট : বিএনপির ১২ শরিক নতুন জোট গড়ার পর এবার ছয় শরিক মিলে হচ্ছে আরেক জোট। বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট’ নামে এই জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটবে। 

জানা গেছে, জোটের নেতৃত্বে থাকছেন ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ। আরও থাকছেন সাইফুদ্দীন মনির ডেমোক্রেটিক লীগ (ডিএল), খন্দকার লুৎফর রহমানের নেতৃত্বে জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) একাংশ, সাদেক শাওনের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ন্যাপ, আজহারুল ইসলামের ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ ভাসানী) ও গরীবে নেওয়াজের পিপলস লীগ।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, কৌশলগত কারণে আমরা ২০ দলীয় জোট ভেঙে সবাইকে যুগপৎ আন্দোলনে শরিক করছি। 

সূত্র বলছে, কৌশলে বিএনপি যুগপৎ আন্দোলনে জামায়াতকে বড় সঙ্গী হিসেবে রাখতে চায়। জোট ও ভোটে জামায়াতকে গুরুত্ব দিয়েই এগোচ্ছে দলটি।

সাত দলের ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’ : ৮ আগস্ট ৭ দলীয় জোটের ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’ আত্মপ্রকাশ করেছে। জোটভুক্ত দলগুলো হলো- জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), নাগরিক ঐক্য, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, গণ অধিকার পরিষদ, ভাসানী অনুসারী পরিষদ ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন। জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব এই মঞ্চের ঘোষণা দেন। তারা সম্প্রতি যুগপৎ আন্দোলন, সরকার ও শাসনব্যবস্থার বদলে ১৪ দফা ঘোষণা করেছে। মঞ্চের নেতা ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক সময়ের আলোকে বলেন, আমরা বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন শুরু করব ৩০ ডিসেম্বর থেকে। ওইদিন আমাদের ১৪ দফা দাবি আদায়ে ঢাকায় গণমিছিল হবে। আমরা শুধু এক সরকার বদলে আরেক সরকার চাই না; রাষ্ট্র কাঠামোর সংস্কার চাই। নানা আলোচনা শেষেই আমরা বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছি।

সুসংগঠিত হচ্ছে ১৪ দল : জোটযুদ্ধে বসে নেই শাসক দল আওয়ামী লীগও। তারা ১৪ দলীয় জোটের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে মান অভিমান ভাঙানোর চেষ্টা করছে। ১৪ দলীয় নেতারাও প্রধানমন্ত্রীকে কথা দিয়েছেন তারা এখন থেকে ‘অঙ্গীকারবদ্ধ ও সজাগ’ রয়েছেন। সম্প্রতি ১৪ দলীয় জোটের সমন্বয়ক ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমুর বাসায় এক বৈঠকে শরিকরা পাওয়া না পাওয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। 

পরে ১৪ দলীয় জোটের যোগ্য নেতাদের ন্যূনতম ১টি করে আসন দেওয়া হবে বলে জানান আমু। কোনো কোনো শরিক দল এর চেয়ে বেশিও পেতে পারেন। জোট নিয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও ১৪ দলীয় জোটের মহানগরের সমন্বয়ক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া সময়ের আলোকে বলেন, আমরা ১৪ দলীয় জোটকে আরও শক্তিশালী করে আগামী নির্বাচনে অংশ নেব। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে ধারণ করে এমন দলকে জোটে ভেড়াব আমরা। তবে জোট বিষয়ে পরিস্থিতি বুঝে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী ও দলের সভাপতি শেখ হাসিনা।

জাতীয় পার্টিকে কাছে রাখার চেষ্টা : বরাবরই ক্ষমতার করিডোরে থাকা জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের সাম্প্রতিক সময়ে সরকাবিরোধী কথা বলার পর তাকে নানাভাবে একঘরে করে রাখা হয়েছে। প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদের সঙ্গে জিএম কাদেরের মনোমালিন্য এখনও শেষ হয়নি। এরই মধ্যে তাদের দুজনকেই প্রধানমন্ত্রী গণভবনে ডেকে আপ্যায়ন করিয়েছেন। আওয়ামী লীগ চাচ্ছে জাতীয় পার্টি এককভাবে নির্বাচনে অংশ নিক। বিএনপির সঙ্গে যাতে কোনোভাবে না ভিড়ে। 

যদিও পার্টির মহাসচিব মজিবুল হক চুন্নু সময়ের আলোকে বলেন, আমরা কোনো জোটে নেই। পরিস্থিতি দেখে সিদ্ধান্ত নেব।

গুঞ্জন বাড়িয়েছেন কাদের সিদ্দিকী : আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনের এক দিনে আগে শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকী। তার এই সাক্ষাতের ঘটনায় নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে। একসময় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা কাদের সিদ্দিকী কি আবারও সেখানে ভিড়ছেন? 

জবাবে তিনি সময়ের আলোকে বলেন, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। কোনো জোটে নোঙর ফেলছি কি না সে জন্য আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। সময় হলে সব জানাতে পারব।

সবার নজর ইসলামি দলের প্রতি : বিএনপি আওয়ামী লীগ সবাই চাচ্ছে ইসলামি দলগুলোকে নিজেদের ছায়াতলে আনতে। বিএনপির সঙ্গে বেশ ইসলামি দল থাকলেও আওয়ামী লীগের সঙ্গে আছে মাত্র তরিকত ফেডারেশন। এ জন্য তারা আরও বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

তবে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ রেজাউল করিম সময়ের আলোকে বলেন, আমরা ইসলামি নীতি আদর্শ বাস্তবায়নে আলাদা জোট গঠনের চেষ্টা করছি। ইতোমধ্যে নয়টি সমমনা দলের সঙ্গে আলোচনা করেছি। আমরা আওয়ামী লীগ- বিএনপি কারোর সঙ্গে যেতে চাই না।

আর বর্তমান সরকারের সঙ্গে কওমি মাদ্রাসা-ভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের সখ্য দেখা যাচ্ছে। কয়েকদিন আগে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছেন সিনিয়র নেতারা। জাতির খেদমতে প্রধানমন্ত্রী তাদের দোয়া চেয়েছেন। বিরোধী দল বিএনপিও বেশ সতর্ক থাকছে হেফাজতের কর্মকাণ্ড নিয়ে। তারা কোনো মন্তব্য করতে চায় না হেফাজত নিয়ে।