রাজধানীর অন্যতম আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন এলাকা হাতিরঝিল। সন্ধ্যার পর নানা রঙের আলোর ঝলকানিতে আরও মোহনীয় হয় এলাকাটি। রাত একটু বাড়ার পর প্রায় বিভিন্ন অপরাধকর্ম, এমনকি ছিনতাই, ধর্ষণ, অজ্ঞাত কারণে মৃত্যু হয়ে লাশ পড়ে থাকা ও হত্যার মতো ঘটনায় মলিন হয়ে যায় এ সৌন্দর্য। নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা। দিনের বেলায় পুলিশের দেখা মিললেও রাতে নিরাপত্তা বলতে কিছুই থাকে না। এ সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা হাতিরঝিলে ছিনতাই, চাঁদাবাজি ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটায়। সিসি ক্যামেরাগুলো বেশিরভাগ অচল থাকায় অনেক বড় ঘটনা ঘটলেও এসব অপরাধের রহস্য উদঘাটন হয় না।
গত বুধবার রাত দেড়টায় হাতিরঝিলে মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ইসরাক হোসেন যোশী (২৭) নামে এক যুবকের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তবে তার মৃত্যুর কারণ দুর্ঘটনা বলা হলেও পুলিশ সিসি ক্যামেরার ফুটেজ এখনও হাতে পায়নি। এটি নিছক দুর্ঘটনা নাকি হত্যাকা- তাও নিশ্চিত হয়।
এদিকে হাতিরঝিল থানায় লেকের অংশে অপরাধের ঘটনার আলাদা পরিসংখ্যান নেই। তবে পুলিশ, হাসপাতাল, গণমাধ্যম ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালের ২ জানুয়ারি উদ্বোধনের পর হাতিরঝিলে সড়ক দুর্ঘটনায় শতাধিক ব্যক্তি নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে কয়েকশ।
আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে অন্তত ২০টি। হত্যার ঘটনা ঘটেছে ২২টি। কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত ও মারামারি হয় হরহামেশাই। তবে পুলিশ বলছে ভিন্ন কথা। জনবল সংকট এবং প্রযুক্তির অভাবে এসব ঘটনা ঠেকানো যাচ্ছে না এবং সঠিক তথ্যও সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না।
স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, হাতিরঝিলে অনেক ঘটনা ঘটে। কিন্তু রহস্য উদঘাটন হয় না। অন্ধকার অংশে মাদকের আড্ডা ও অসামাজিক কর্মকা- চলে। পুরো এলাকায় নেই সিসি ক্যামেরা। ফলে অপরাধীদের জন্য অভয়ারণ্য হয়ে উঠছে হাতিরঝিল।
মঙ্গলবার রাত ৮টায় মধুবাগ হয়ে হাতিরঝিলের প্রবেশমুখে যাওয়ার সময় যান চলাচল করলেও লেকের পাশে গাছের নিচে কয়েকজন নারী-পুরুষ ঘোরাঘুরি করছিলেন। তবে প্রায় দেড় কিলোমিটারজুড়ে কোনো পুলিশের গাড়ি দেখা যায়নি। মধুবাগ, মগবাজার লেকের জায়গাটিও ছিল সুনসান। কয়েকজন ভবঘুরেকেও দেখা গেছে।
মধুবাগ-মগবাজার পথের মাঝামাঝি দেখা গেছে, ফ্ল্যাক্সে করে চা বিক্রি করছিল কিশোর আলম মিয়া। সে জানায়, মঙ্গলবার সকালে লেক থেকে ভাসমান একটি লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। যার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে তাকে এ এলাকায় এর আগে কখনো দেখা যায়নি। এই কিশোর জানায়, এখানে অনেক মারামারি হয়। বাইরে থেকে অনেক পোলাপান আসে। তাদের সঙ্গে মেয়েরাও আসে। অন্য পোলাপানরা ইভটিজিং করলেই মারামারি বাধে। মাঝে মাঝে ছিনতাই হয়। তবে পুলিশের দেখা মেলে কম। আলম আরও জানায়, বাইরে থেকে আসা পোলা-মাইয়ারা আড্ডা দিলে হিজড়াদের উৎপাত বেড়ে যায়। টাকা না দিলে লাঞ্ছিত হতে হয়।
কয়টা পর্যন্ত হাতিরঝিলে চা বিক্রি করো, জানতে চাইলে আলম মিয়া বলে, রাত ১১টার পর থাকি না। এখানে থাকলে পোলাপান আইসা টাকা-পয়সা সব কাইড়া নিয়া যায়। পুলিশকে জানালে উল্টো বকাঝকা করে। পুলিশ বলে, এখানে চা বিক্রির অনুমতি দিছে কে।
নাম প্রকাশ না করে এক যুবক বলেন, সম্প্রতি তার মেয়েবন্ধু সিএনজিচালিত অটোরিকশায় হাতিরঝিল দিয়ে মগবাজারে যাওয়ার পথে চালক মাঝপথে তার অটোরিকশা থামিয়ে দেয়। তখন তার বন্ধু ভয়ে তাকে ফোন করে। ততক্ষণে চালক খারাপ মনোভাব নিয়ে যাত্রীকে অটোরিকশায় আটকে রেখেই নিজে নগ্ন হয়। এ সময় চিৎকার করলে চালক তাকে নামিয়ে দিয়ে অটোরিকশা নিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। পরে থানায় অভিযোগ দিলেও আজও ওই অটোরিকশাচালককে আটক করতে পারেনি পুলিশ।
বৃহস্পতিবার দুপুরে হাতিরঝিল এলাকায় কয়েকটি স্থান ঘুরে দেখা যায়, বেগুনবাড়ী সিদ্দিক মাস্টারের ঢালের একটু সামনেই লেকের পাশে প্রকাশ্যেই গাঁজা টানছে কয়েকজন যুবক। সেখানে পকেট থেকে মোবাইল বের করতেই নড়েচড়ে ওঠে তারা। পরে সেই দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করা সম্ভব হয়নি। এর ১০০ গজ পরেই কয়েকজন তরুণ-তরুণী বেঞ্চে বসে কথা বলছিলেন। পাশ দিয়ে কয়েকটি পথশিশু হেঁটে হেঁটে একে অপরকে অশ্লীল ভাষায় গালাগাল করতে থাকে। এতে কিছুটা বিব্রত হন ওই তরুণ-তরুণীরা। কথা হলে তারা জানান, তারা পলিটেকনিকের শিক্ষার্থী। ছুটি শেষে এখানে এসেছেন। এখানকার পরিবেশ সুন্দর হলেও নিরাপত্তার সংকট রয়েছে। পুলিশের উচিত আরও বেশি নিরাপত্তা বাড়ানো। তা না হলে অপরাধের সংখ্যা বাড়বে। বারবে লাশের সংখ্যাও।
সবশেষ গত মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে হাতিরঝিল লেকে অজ্ঞাতপরিচয় (৩৫) যুবকের লাশ ভাসতে দেখে পুলিশে খবর দেয় স্থানীয়রা। পুলিশ গিয়ে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। লাশ উদ্ধারের সময় তার পরনে ছিল প্যান্ট।
বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) হাফিজ আল ফারুক সময়ের আলোকে বলেন, আমরা লাশের পরিচয় এখনও শনাক্ত করতে পারিনি। সিআইডি ও পিবিআই ওই যুবকের ফিঙ্গার প্রিন্ট নিলেও এখনও তার পরিচয় পাওয়া যায়নি। তিনি জানান, তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে হত্যা মনে হলেও ময়নাতদন্তের রিপোর্ট ছাড়া কিছু বলা যাচ্ছে না।
গত বছরের ৭ জুন রাতে মহাখালীর ভাড়া বাসা থেকে বের হওয়ার পর ডিবিসির প্রযোজক আবদুল বারীর রক্তাক্ত লাশ পাওয়া যায় পুলিশ প্লাজার পেছনে লেকের পাড়ে। পরে ডিবির গুলশান বিভাগ জানায়, আবদুল বারী নিজের গলায় নিজেই ছুরি চালিয়ে আত্মহত্যা করেন। তবে সিসি ক্যামেরা ফুটেজে আত্মহত্যার কোনো দৃশ্য মেলেনি।
গত বছরের ১৯ জানুয়ারি গভীর রাতে হাতিরঝিলে রহস্যজনক মৃত্যু হয় দৈনিক সময়ের আলোর সিনিয়র রিপোর্টার হাবীব রহমানের। তার ব্যবহার করা মোটরসাইকেলটি অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার এক বছর পেরিয়ে গেলেও পুলিশ আদালতে কোনো রিপোর্ট দিতে পারেনি। তবে গত ১৭ জানুয়ারি হাতিরঝিল থানা পুলিশ জানায়, দুর্ঘটনার কারণেই হাবীব রহমানের মৃত্যু হয়েছে। শিগগিরই আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হচ্ছে।
গত বছরের ১৫ জানুয়ারি হাত-পা বাঁধা এক যুবকের লাশ ভেসে ওঠে হাতিরঝিলে। আর ২৫ ফেব্রুয়ারি আসমা বেগম নামে এক নারীর ভাসমান লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
২০২০ সালের ১২ অক্টোবর মেরুল-বাড্ডাসংলগ্ন হাতিরঝিলে উদ্ধার করা হয় চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি বিশ্বেবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আজিজুল ইসলাম মেহেদীর লাশ। একই বছর বিরোধের জেরে খুন হয় শিপন হাসান নামের আরেকজন। ২০১৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর হাতিরঝিলের কুনিপাড়ার লেক থেকে একটি এবং ২০১৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর অর্ধগলিত আরেকটি লাশ উদ্ধার করা হয়।
স্থানীয়রা বলছে, হাতিরঝিলের সঙ্গে বেগুনবাড়ী, কুনিপাড়া, তেজগাঁও, বাড্ডা, উলন, মহানগর ও মধুবাগ এলাকায় অন্তত ৩৮টি গলি আছে। সেতুগুলোর ওপর ও পাশে আছে কিছু অন্ধকার এলাকা। সেসব জায়গায় অঘটন ঘটলেও পুলিশের ভূমিকা রহস্যজনক।
এ ব্যাপারে হাতিরঝিল থানার ওসি আবদুর রশীদ সময়ের আলোকে বলেন, হাতিরঝিল এলাকাটি বিশাল। এখানে জনবল প্রয়োজন প্রায় ৫০০ জন। অথচ আমার থানায় মাত্র ১০০ জন জনবল নিয়ে প্রতিদিন সব কাজ করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, সিসি ক্যামেরাগুলো সচল রয়েছে। অপরাধীরা অপরাধ করে অন্ধকারে এবং সিসি ক্যামেরার আওতার বাইরে। জনবল ও প্রযুক্তির অভাবে বাড়ছে অপরাধ। তবে আমরা চেষ্টা করছি প্রতিটি গলির প্রবেশমুখে পুলিশ রাখার জন্য।
হাতিরঝিলে মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে যুবক নিহত : বুধবার গভীর রাতে রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকার রামপুরা ব্রিজের কাছে সড়ক দুর্ঘটনায় ইসরাক হোসেন যোশী (২৭) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। বুধবার রাত দেড়টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। তার বাসা রাজধানীর ওয়ারীতে।
হাতিরঝিল থানার ওসি আবদুর রশীদ জানান, মোটরসাইকেলে যাওয়ার পথে তিনি ছিটকে পড়ে আহত হন। পথচারীরা উদ্ধার করে রাত পৌনে ২টার দিকে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। ইসরাকের পরিবারের একজন সদস্য জানান, রাতে বন্ধুর বাসায় যাওয়ার কথা বলে তিনি বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। তার বাবার নাম ইমরান হোসেন।
ইসরাককে উদ্ধার করা পথচারী আবদুল জব্বার বলেন, রাত দেড়টার দিকে হাতিরঝিল মোড়ে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পেয়ে তাকে ঢামেক হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানকার চিকিৎসকরা রাত ২টায় ইসরাককে মৃত ঘোষণা করেন।