Image description

আয়তনে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম দেশ চীন। বর্তমানে চীন ক্রমাগত একটা বিশ্বশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে এবং প্রতিনিয়ত নিজেকে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ ও সামরিকভাবে শক্তিশালী করে চলছে। বিশ্বমানচিত্রের বড় একটা অংশ জুড়ে থাকা চীন মাত্র কয়েক দশক আগেও সামরিক এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে এতটা শক্তিশালী ছিল না। বিপুল ভূ-সম্পদের এবং বিশাল সামুদ্রিক সীমানার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও চীন অর্থনৈতিক দিক থেকে অনেকটা পিছিয়ে ছিল। 

আজকের সমৃদ্ধ চীনের ইতিহাস গত ৭৩ বছরের ইতিহাস। ১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতান্ত্রিক চীন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ধীরে ধীরে আজকের চীনের উত্থান। তখন থেকে অর্থনৈতিক নীতিতে বিভিন্ন সংস্কার আনার ফলে চীন বর্তমানে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়েছে। চীন আজ বিশ্বের ২য় অর্থনৈতিক শক্তি। আর এখন চীন তার সামরিক রাজনীতিতে বিভিন্নভাবে পরিবর্তন আনছে। তার আশপাশের অঞ্চল তো বটেই- আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকাসহ বিশ্বজুড়ে সামরিক প্রভাব বাড়িয়ে চলছে। 

১৯৪৯ থেকে ২০২২-এর মধ্যে যত জন রাষ্ট্রপ্রধান চীন শাসন করেছেন তাদের মধ্যে ৩ জন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। চীনের এই ৭৩ বছরের ইতিহাসকে মোটামুটিভাবে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। মাও জে দং, দেং জিয়াও পিং এবং শি জিন পিংয়ের সময়কাল। মাও অর্থনীতিতে যে মডেল নিয়ে এসেছিলেন কৃষিতে তিনি কমিউন সিস্টেমের প্রচলন করেন। অর্থাৎ কৃষিজমিগুলোকে ব্যক্তিমালিকানা থেকে সরকারি মালিকানায় নিয়ে যান। কিন্তু এর ফলে যে চীনের খুব অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছিল সেটা বলা যাবে না। 

বরং বলা যায় মাওয়ের এই প্রকল্প ব্যর্থ হয়েছিল। এরপর মাওয়ের নেতৃত্বে সাংস্কৃতিক বিপ্লব সংঘটিত হয়, যেটাও সফল হয়নি। ১৫ মিলিয়ন লোকের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল এই সাংস্কৃতিক বিপ্লব। মাও জে দংয়ের পরে চীনের মসনদে আসেন দেং জিয়াও পিং। তিনি দেখলেন চীনে সমাজতন্ত্র এসেছে কিন্তু উন্নতি আসেনি। তিনি তখন সোভিয়েত ধারার কেন্দ্রীভূত অর্থনৈতিক মডেল থেকে বাজারমুখী অর্থনীতির দিকে সরে আসেন।

তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, সমাজতান্ত্রিক কিংবা পুঁজিবাদী এগুলো কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়, যে ধরনের অর্থনৈতিক মডেল চীনের জন্য উপযোগী সেটিই গ্রহণ করা হবে। তিনি কমিউন ব্যবস্থা বাতিল করে কৃষিজমির মালিকানা কৃষকদের ফিরিয়ে দেন, কৃষিপণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দেন, রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলো বিকেন্দ্রীকরণ করেন এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুযোগ করে দেন। এসব অর্থনৈতিক সংস্কারের ফলে চীনে বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়। ১৯৮০ সালে চীনের প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ১০ দশমিক ২ ভাগ এবং একুশ শতকের শুরুতে চীনা অর্থনীতি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হয়।

দেং জিয়াং পিং চীনকে অর্থনৈতিক অগ্রগতি এনে দিয়েছিলেন কিন্তু চীনে নতুন যুগের সূচনা করেন শি জিন পিং। তিনি চীনকে বিশ্ব শক্তিতে পরিণত করেন। তার লক্ষ্য হচ্ছে ২০৪৯ সালের মধ্যে চীনকে পূর্ণ উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করা। ইতিমধ্যে চীন বিশ্বের ২য় বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে ২০২৬ সালে অর্থনৈতিক শক্তির দিক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাবে চীন। আমরা সবাই জানি অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কানেক্টিভিটি জরুরি। 

এই ধারণা থেকেই প্রাচীন সিল্ক রুটের আদলে ২০১৩ সালে শি জিনপিং হাজির হন তার বেল্ট অ্যাান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ পরিকল্পনা নিয়ে। এর মাধ্যমে চীন সড়ক ও নৌপথে সংযুক্ত হবে আরও ৬৫টি দেশের সঙ্গে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে তার আওতায় আসবে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী এবং এক-তৃতীয়াংশ অর্থনীতি। বিশ্বের ৭৫ ভাগ জ্বালানি রিজার্ভ রয়েছে এই অঞ্চলে। তাই বলা যায় বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বাস্তবায়ন হলে এসব অঞ্চলে চীনের ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি পাবে, যেটা অবশ্যই চীনের প্রধান উদ্দেশ্য। চীনা পণ্যের বিশাল বাজার গড়ে উঠবে, যার ফলে চীনের একধরনের অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হবে। 

এর ফলে এ অঞ্চলজুড়ে চীনের রাজনৈতিক প্রভাবও বৃদ্ধি পাবে। ইতিমধ্যে আফ্রিকাজুড়ে চীনের একটা বিরাট প্রভাব বলয় তৈরি হয়েছে। ২০১২ সালে আইএমএফের দেওয়া তথ্য মতে, সারা আফ্রিকার মোট ঋণের ১৫ ভাগ ছিল চীনা ঋণ। আর এশিয়াতে চীনের একটা শক্ত অবস্থান তো আগে থেকেই ছিল। মধ্য আমেরিকা এবং লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতেও এখন বেড়েছে চীনের আনাগোনা। ২০১০ সালে মধ্য আমেরিকার দেশ কিউবার ২.৮ মিলিয়ন ডলারের ঋণ এবং ২০১৫ সালে লাতিন আমেরিকার দেশ জিম্বাবুয়ের ৪০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ মাফ করে দিয়েছিল চীন। এর ফলে দেশ দুটির সঙ্গে চীনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বৃদ্ধি পেয়েছে, সেখানে চীনের পায়ের তলার মাটি শক্ত হয়েছে। 

বিশ্বজুড়ে চীনের এই উত্থানে ভীতু গত তিন দশক ধরে একচ্ছত্রভাবে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র একক পরাশক্তি হিসেবে রাজত্ব করে আসছিল। চীন এখন যুক্তরাষ্ট্রের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছে। তাই চীনকে চাপে রাখতে প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগর এলাকায় যুক্তরাষ্ট্র চীনের আঞ্চলিক শত্রুদের নিয়ে নানা জোট গঠন করে চলছে। 

চীনও তার পররাষ্ট্র নীতিতে পরিবর্তন এনেছে। কোনো হুমকি কিংবা উসকানির তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেয়। যেটা তার সামরিক সক্ষমতার প্রমাণ দেয়। এখানে গ্রিক ঐতিহাসিক থুসিডাইডিসের ‘থুসিডাইডিসের ফাঁদ’ তত্ত্বটি স্মরণীয়। তিনি বলেছিলেন, ‘প্রতিষ্ঠিত শক্তির সঙ্গে উদীয়মান শক্তির সংঘাত অনিবার্য।’ পৃথিবীর ইতিহাসে গত ৫০০০ বছরে এ রকম ১৬টি উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যায়- যেখানে ১২টিই যুদ্ধ পর্যন্ত গড়িয়েছিল। এখন এমন একটি সংঘাত আসলেই ঘটবে কি না এবং যদি ঘটে তাহলে সেখানে কোন শক্তি কীভাবে প্রভাব বিস্তার করবে, সেটিই দেখার বিষয়। 

লেখক : শিক্ষার্থী, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।