এজেন্ট ব্যাংকিং ও রেমিট্যান্স আহরণে ইসলামী ব্যাংকের ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত এসেছে। তবে বিগত সরকারের আনুকূল্যপ্রাপ্তদের লুটপাটের কারণে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে হলে ইসলামী ব্যাংকিংকে নীতিগত সংস্কার, স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়ানোর পথে দ্রুত হাঁটতে হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে নভেম্বর ২০২৩ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৫ সময়কালে ইসলামী ও প্রচলিত (কনভেনশনাল) ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সূচকে প্রচলিত ব্যাংকগুলো এগিয়ে ছিল। আমানত, বিনিয়োগ, সম্পদ, রফতানি আয়, আমদানি পরিশোধ ও রেমিট্যান্স সব ক্ষেত্রেই ইসলামী ব্যাংকগুলোর অংশীদারত্ব কমেছে, যদিও কিছু ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুসারে এজেন্ট ব্যাংকিং ও রেমিট্যান্স আহরণে ইসলামী ব্যাংকের ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত এসেছে। তবে বিগত সরকারের আনুকূল্যপ্রাপ্তদের লুটপাটের কারণে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে হলে ইসলামী ব্যাংকিংকে নীতিগত সংস্কার, স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়ানোর পথে দ্রুত হাঁটতে হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
আমানতে আস্থা সঙ্কট : ইসলামী ব্যাংকের বাজার শেয়ার কমছে
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ব্যাংকিং আমানত বেড়ে ১১.০২%।
তবে বিভাজন স্পষ্ট :
ইসলামী ব্যাংক : ৪.৩৪ ট্রিলিয়ন? ৪.৬৭ ট্রিলিয়ন টাকা (৭.৫২% বৃদ্ধি)
প্রচলিত ব্যাংক : ১৪.২৪ ট্রিলিয়ন? ১৫.৯৬ ট্রিলিয়ন টাকা (১২.০৯% বৃদ্ধি)
এক বছরেই ইসলামী ব্যাংকের বাজার শেয়ার ২৩.৩৭% থেকে নেমে ২২.৬৪%-এ এসেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী অনিয়ম ও ব্যবস্থাপনা সঙ্কট ইসলামী ব্যাংকগুলোর ওপর আস্থাহীনতা সৃষ্টি করেছে। ফলে বড় অংশের আমানত সরে গেছে প্রচলিত ব্যাংকে।
বিনিয়োগে ৭৫% দখল প্রচলিত ব্যাংকের
মোট বিনিয়োগ বেড়েছে ১১.৭২%। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক : ১০.৮৬% বৃদ্ধি আর প্রচলিত ব্যাংক : ১২.০১% বৃদ্ধি
বর্তমানে মোট বিনিয়োগের প্রায় ৭৫% নিয়ন্ত্রণ করছে প্রচলিত ব্যাংকগুলো, যা বাস্তবে অর্থনীতির মূল ঋণপ্রবাহের বড় অংশ তাদের হাতে কেন্দ্রীভূত করছে।
সম্পদ বৃদ্ধিতেও পিছিয়ে ইসলামী ব্যাংক
সম্পদের প্রবৃদ্ধি
ব্যাংক ধরন ২০২৪ ( সেপ্টেম্বর) ২০২৫ ( সেপ্টেম্বর) প্রবৃদ্ধি
ইসলামী ব্যাংক ৮.৫০ ট্রিলিয়ন ৯.৫৪ ট্রিলিয়ন ১২.২৬%
প্রচলিত ব্যাংক ৩১.৪২ ট্রিলিয়ন ৩৬.৮৮ ট্রিলিয়ন ১৭.৩৯%
অর্থাৎ সম্পদ বৃদ্ধির গতিতেও প্রচলিত ব্যাংক পরিষ্কারভাবে এগিয়ে।
রফতানি আয় : ইসলামী ব্যাংকে বড় ধাক্কা
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইসলামী ব্যাংকের রফতানি আয় প্রায় ১৬% কমেছে।
অন্য দিকে প্রচলিত ব্যাংকে কমেছে তুলনামূলক কম, মাত্র ৩.৯৪%।
বর্তমানে দেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮০% নিয়ন্ত্রণ করছে প্রচলিত ব্যাংক।
ডলার সঙ্কটের ধাক্কা : আমদানি পরিশোধে অস্থিরতা
ইসলামী ব্যাংকের আমদানি পরিশোধ কমেছে ৫.২৩%। প্রচলিত ব্যাংকগুলোতেও ওঠানামা দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডলার সঙ্কট ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা এই অস্থিরতার অন্যতম কারণ।
রেমিট্যান্সে চমক : ইসলামী ব্যাংকের ঘুরে দাঁড়ানো
একটি আশাব্যঞ্জক দিক হচ্ছে রেমিট্যান্সে:
ইসলামী ব্যাংকের অংশীদারত্ব বেড়েছে ২২.৪৫% ? ৩০.৪৪%
ইসলামী ব্যাংকে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৫৪০ মিলিয়ন? ৮১৮ মিলিয়ন ডলার
প্রচলিত ব্যাংকে রেমিট্যান্স বেড়েছে তুলনামূলক কম। এর পেছনে কারণ হিসেবে প্রবাসীদের নতুন করে ইসলামিক ব্যাংকের প্রতি আস্থা ফিরে পাওয়া বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে উল্টো চিত্র : ইসলামী ব্যাংকের আধিপত্য
সবচেয়ে ইতিবাচক চিত্র এসেছে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে :
ইসলামী ব্যাংকের আমানত বেড়েছে ২৬.৩৫%
প্রচলিত ব্যাংকের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ১৪.০২%
মোট এজেন্ট ব্যাংকিং আমানতের ৫৫% এখন ইসলামী ব্যাংকের দখলে
গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মাঝে ইসলামী ব্যাংকের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে।
কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া টিকে থাকা কঠিন
অর্থনীতিবিদদের মতে, ইসলামী ব্যাংক খাতে গভর্ন্যান্স দুর্বলতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থাপনা জরুরি। এ ছাড়া ডিজিটাল সেবা, কর্পোরেট স্বচ্ছতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ না বাড়ালে বাজার হার আরো বাড়বে না।