লাগামহীন মূল্যস্ফীতির কারণে খাদ্যপণ্য ক্রয়ে খরচ বেড়ে গেছে। ঢাকায় চার সদস্যের একটি পরিবারে খাবারের পেছনে প্রতি মাসে খরচ হচ্ছে ২২ হাজার ৬৬৪ টাকা। তবে মাছ-মাংস না খেলে ব্যয় দাঁড়ায় ৭ হাজার ১৩১ টাকা। এই হিসাব গত ফেব্রুয়ারি মাসের।
সোমবার বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ‘জাতীয় বাজেট ২০২৩-২৪ সিপিডির সুপারিশমালা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
মাছ, মাংস, চাল, ডাল, তেল, মরিচ, হলুদ, আদা, রসুনসহ ১৭টি নিত্যপণ্যের প্রতিদিনের বাজারদর এবং একজন মানুষ গড়ে কী পরিমাণ খাদ্য গ্রহণ করে, এর ওপর ভিত্তি করে এ হিসাব করেছে সিপিডি। গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি বলছে, একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে মোট আয়ের ৬০ শতাংশ খাবারের পেছনে খরচ করতে হয়।
সংবাদ সম্মেলেন মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। এ সময় গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মো. তৌফিক ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন।
সিপিডির হিসেবে ফেব্রুয়ারি মাসে খাদ্যপণ্যের দাম বা মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ২৫ দশমিক ১১ শতাংশ। তবে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যে ফেব্রুয়ারিতে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ।
মূল প্রবন্ধে ঢাকায় বিগত পাঁচ বছরে চার সদস্যের একটি পরিবারে খাবারের পেছনে ফেব্রুয়ারি মাসে কত টাকা খরচ করতে হতো তার একটি হিসাব দেওয়া হয়েছে। এতে দেখা যায়, ২০১৯ সালে একটি পরিবারে নিয়মিত খাবারের পেছনে মাসে খরচ হতো ১৫ হাজার ৭০৫ টাকা। খাদ্য তালিকা থেকে মাছ-মাংস বাদ দিলে খরচ হতো ৪ হাজার ৭১২ টাকা। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিয়মিত খাবারের পেছনে খরচ হতো ১৬ হাজার ৮১৩ টাকা। মাছ-মাংস ছাড়া খরচ হতো ৫ হাজার ২৬৫ টাকা। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিয়মিত খাবারের পেছনে খরচ হতো ১৭ হাজার ৫২ টাকা। মাছ মাংস ছাড়া খরচ হতো ৫ হাজার ৩২৩ টাকা। ২০২২ সালে খাবারের পেছনে প্রতি মাসে খরচ ছিল ১৮ হাজার ১১৫ টাকা। আর খাদ্যতালিকা থেকে মাছ-মাংস বাদ দিয়ে ব্যয় ছিল ৫ হাজার ৬৮৮ টাকা। সেই ব্যয় বেড়ে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নিয়মিত খাবারের খরচ দাঁড়ায় ২২ হাজার ৬৬৪ টাকা এবং মাছ মাংস ছাড়া খরচ পড়ে ৭ হাজার ১৩১ টাকা। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে একটি পরিবারের নিয়মিত খাবারের পেছনে ব্যয় বেড়েছে ৬ হাজার ৯৬৯ টাকা এবং মাছ মাংস ছাড়া খাবারের পেছনে ব্যয় বেড়েছে ২ হাজার ৪১৯ টাকা।
সিপিডি জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে যে হারে পণ্যের দাম বাড়ছে, তারচেয়েও বেশি হারে বাড়ছে দেশের স্থানীয় বাজারে। বিশেষ করে চাল, আটা, চিনি, ভোজ্য তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে কমলেও স্থানীয় বাজারে সেই প্রভাব নেই। অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদিত পণ্যের দামও কারণ ছাড়া ঊর্ধ্বমুখী। এ ক্ষেত্রে বাজার ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি রয়েছে। লাগামহীন মূল্যস্ফীতির কারণে অনেকেই খাদ্য ব্যয় কমিয়ে আনতে খাবারের তালিকা থেকে বাদ দিচ্ছেন মাছ-মাংসসহ বিভিন্ন আমিষ।
দেশের অর্থনৈতিক দুঃসময়ের কারণ হিসেবে ইউক্রেন যুদ্ধকে আর অজুহাত করার সুযোগ নেই জানিয়ে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধকে সবসময় একটা কারণ হিসেবে বলে এসেছি। এ যুদ্ধের আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া, পণ্যের মূল্য বেড়ে যাওয়া কিংবা অর্থনীতির ওপর বিভিন্ন চাপ দাবি করেছি। সেটাকে আর অজুহাত বললে হবে না। অর্থনীতির ভেতরে যেসব দুর্বলতা ছিল সেগুলো মূল হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধের ফল কিছুটা থাকলেও বাকিটা দেশের অর্থনীতির শক্তিমত্তার ওপর নির্ভর করছে।
তিনি বলেন, নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য, রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রবণতা, উন্নয়ন প্রকল্পে ধীরগতি, ব্যাংকে তারল্য ও ডলারসংকট, আর্থিক খাতের ভারসাম্যহীনতা, রিজার্ভ হ্রাস-এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে আগামী বাজেট করতে হবে। মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতিতে সুশাসন ও শৃঙ্খলা আনতে হবে। এ জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, গরিব ও সীমিত আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছে। দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি সামাল দিতে বেসরকারি খাতে ৫ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি করা উচিত। পারলে এ ঈদেই বেতনভাতা বাড়ানো উচিত। এ ছাড়া জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলছে। তাই সব খাতের ন্যূনতম মজুরি বাড়ানো উচিত।
অন্যদিকে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাজার প্রক্রিয়া ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। বাজারে কোনো ধরনের ম্যাকানিজম কাজ করছে না। তারচেয়ে যেটা জটিলতর হচ্ছে তা হলো বড়রা ছোটদের খেয়ে ফেলছে। বাজারের ভেতর ছোটদের প্রভাব ও অংশগ্রহণ ক্রমেই সীমিত থেকে সীমিততর হচ্ছে।
গোলাম মোয়াজ্জেম আরও বলেন, ঝড় ও ঝুঁকি আগের তুলনায় বেড়েছে। ঝড়ের আকার ও গভীরতা বেড়েছে। যে ঝড়কে আমরা সামষ্টিক কিংবা ব্যষ্টিক পর্যায়ের ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করতাম, সেটি এখন ব্যক্তি পর্যন্ত বেড়ে গেছে।
তিনি বলেন, সরকার এ প্রক্রিয়া থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে আইএমএফের লোন কিংবা শর্তাদির ওপর নির্ভরশীল থাকতে চাইছে। শুধু আইএমএফের শর্ত ও সংশ্লিষ্ট পদক্ষেপ যথেষ্ট হবে না। আইএমএফের শর্তের বাইরেও বিবিধ রকমের কার্যক্রম নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।